Why don't presidents fight the war?
Why do they always send the poor?
-B.Y.O.B, System of A Down
ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীর কলমে। বিজিত সে ইতিহাসে নেহাৎ-ই অচ্ছুৎ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সব যুদ্ধের যত বিবরণী আমরা পড়ি, তার বেশীরভাগটা ভীষণ একপেশেই বটে। আমরা ইতিহাসে পাই বিজয়ীর বীরত্বগাঁথা আর ত্যাগের গল্প; পাই তার কষ্টের বিবরণী। নিউটনের তৃতীয় সূত্র মানলে বিজয়ী যতটা মার দেন, বিজিতকে তো সেই পরিমাণ মারই খেতে হয়। তবুও আমরা পরাজিতদের গল্প শুনতে চাইনা বেশী একটা। হারু পার্টির প্রতি আমাদের অত সহানুভূতি নেই, বিশেষত সে পার্টিটি যদি হয় আধুনিক পৃথিবীর ঘৃণ্যতম মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষ শক্তি। জার্মানীর হিটলার, show more ইতালীর কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট নেতা মুসৌলিনি আর জাপানের সাম্রাজ্যবাদী সম্রাট হিরোহিতো ছিলেন এই অক্ষশক্তির প্রধান তিন কাপ্তান। এঁদের যাঁর যাঁর কুৎসিত জীবনদর্শন চরিতার্থ করতেই ভূগোলকের স্থানভেদে গড়ে উঠেছিলো জার্মান নাৎজি বাহিনী, ইতালীয় ফ্যাসিস্ট বাহিনী, জাপানী রাজকীয় সামরিক বাহিনী, ক্রোয়েশিয়ান উস্তাশি...ইত্যাদি। নাৎজিদের অত্যাচারের কাহিনী আজ সর্বজনবিদিত। মুসৌলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনীর কথাও খুব অজানা নয়। মুসৌলিনির প্রতি সাধারণ জনগনের ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে মুসৌলিনিকে হত্যার পর তার মৃতদেহটাকে ফ্যাসিস্ট কায়দাতেই উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো যাতে দর্শনার্থীরা এসে এসে পাথর নিক্ষেপ করে কিংবা থুথু ছিটিয়ে তাঁদের বহু বছরের ঘৃণার ভারটুকু সামান্য লাঘব করতে পারেন; আধুনিক বিশ্বের দ্বিতীয় কোন রাষ্ট্রনায়কের কপালে সম্ভবত এমন ‘শেষকৃত্য’ জোটেনি।
ছবিঃ সাঙ্গপাঙ্গ সহ 'ফাঁসিকাষ্ঠে' মুসৌলিনি (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী আগ্রাসী জাপানও নাৎজি কি ফ্যাসিস্ট কোনোটির চেয়েই কম কিছু ছিলোনা। শুধুমাত্র চীনের নানকিংয়েই জাপানী বাহিনী ১৯৩৭ এর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ’৩৮ এর জানুয়ারী পর্যন্ত ছ’সপ্তাহে গণহত্যা আর গণধর্ষণের যে নমুনা দেখিয়েছে তার তুলনা বোধহয় শুধু এক তারা নিজেরাই হতে পারে। এ ছ’সপ্তাহে তিন লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, শিশু-যুবতী-বৃদ্ধাভেদে ধর্ষিত হয়েছে কুড়ি হাজার নারী, যাদের বড় অংশই ভয়ঙ্কর বিকৃত যৌনতার শিকার। বহু ঐতিহাসিক নথিতেই এসেছে ধর্ষণের শিকার সেসব লাশের বর্ণনা, যাদের যৌনাঙ্গে তখনও আটকে ছিল জাপানী সৈনিকদের বেয়োনেট, চাকু, বাঁশের কঞ্চি...পুরুষাঙ্গের বিকল্প ইত্যাদি সব বস্তু; রাসায়নিক কাঠামোতে ধাতব বেয়োনেট কিংবা বাঁশের কঞ্চি রক্ত মাংসের শিশ্নের চেয়ে ঢের শক্ত হওয়াতেই বোধকরি এদের আশ্রয়ে নপুংসক জাপানী বাহিনী ঢাকতে চেয়েছে তাদের অক্ষমতা। তাইওয়ানিজ বংশদ্ভুত গবেষক আইরিস চ্যাং তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্যা রেইপ অফ নানকিং’-এ ধরে রেখেছেন ইতিহাসের কালো সে অধ্যায়। জীবনভর চীনেদের ওপর জাপানীদের অত্যাচারের খোঁজ করতে গিয়ে চ্যাং ভুগেছেন প্রবল বিষণ্ণতায়, যা থেকে তাঁর কখনো আর মুক্তি মেলেনি। ২০০৪ সালে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে মুখে গুলি চালিয়ে চ্যাং আত্নহত্যা করেন। বিষণ্ণতাকে নিজে গুডবাই জানান বটে, চাপিয়ে দিয়ে যান আমাদের সবার ওপরে।
‘ফায়ারস অন দ্যা প্লেইন’ জাপানী লেখক শোহেই ওকা’র ম্যাগনাম ওপাস বলে স্বীকৃত। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দখলকৃত ফিলিপাইন। সম্রাট হিরোহিতোর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী জাপান ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দখল করে রাখে ফিলিপাইন। তবে ফিলিপাইন দখলের কথা কিংবা ফিলিপাইনের জনগণের দুঃখগাঁথা এ উপন্যাসে আসেনি। মিত্রবাহিনী, বিশেষত, আমিরকার প্রবল আক্রমণের মুখে হারের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো খাদ্য-রসদহীন জাপানী বাহিনীর এক সৈনিকের নিজেকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের গল্প এ উপন্যাসের মূল উপজীব্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ব সংক্রান্ত বেশীরভাগ গল্প-উপন্যাস কিংবা ঐতিহাসিক দলিল যেখানে অনেকটাই ইওরোপ কিংবা রাশিয়া কেন্দ্রিক, জাপানী এই উপন্যাস বিশ্বযুদ্ধটির ব্যাপারে উৎসুক পাঠক-গবেষকদের জন্য নতুন একটি দরজা স্বরূপ। যুদ্ধের গল্প পড়াটা আসলে কখনোই খুব সুখকর কিছু নয়, এই বইটি তো নয়ই। তবে আমরা মানুষেরা ঠেকে শিখি। নীতিকথার গল্প কিংবা ধর্মের বুলির তত্ত্ব দিয়ে যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে আমাদের আটকে রাখা যায়না। প্রচুর রক্তপাত ঘটিয়ে তবেই ‘যুদ্ধ ভালো নয়’ এই জ্ঞানটি কিনতে হয় আমাদের। বিষাদগ্রস্ত ভীষণ morbid এক স্বরে বলে যাওয়া ওকা'র যুদ্ধবিরোধী ছোট্ট এ গল্প মনুষ্যত্বের গণ্ডদেশে একটি চড় বিশেষ। চীন-ফিলিপাইনে চালানো কুকীর্তি গুলোর ফিরিস্তি জানলে যে জাপানী বাহিনীর প্রতি ঘৃণায় মন কুঁকড়ে আসে, এই উপন্যাস সেই ঘৃণাবোধের কিছুটা হয়তো ফিরিয়েও নেয়। এক জীবনে অত ঘৃণা পুষে রাখা যায়না বলে প্রকৃতিই হয়তো সাম্যাবস্থা বজায় রাখবার একটা পন্থা বার করে নেয়।
'ফায়ারস অন দ্যা প্লেইন' উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটিই মর্মান্তিক, অকুস্থল ফিলিপাইনের লিয়েত দ্বীপ (Leyte)। সৈনিক প্রাইভেট তামুরা’র বয়ানে বর্ণিত এ উপন্যাস শুরু হয় তার গ্রুপ কমান্ডারের কাছে চড় খাবার মধ্য দিয়ে। কমান্ডারের রাগের কারণ তামুরা হাসপাতাল থেকে রণক্ষেত্রে চলে এসেছে তার কোম্পানীর কাছে (যদিও ক্ষয়ে ক্ষয়ে কোম্পানী এখন প্লাটুনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি কোম্পানী গঠিত হয় একশ থেকে দুইশ সৈনিক নিয়ে, প্লাটুনের সৈনিক সংখ্যা ওঠানামা করে ষোল থেকে পঞ্চাশের মাঝে)। যক্ষ্মায় আক্রান্ত তামুরা তার দলের কাছে এখন বোঝা বিশেষ, শুধু শুধু তাকে বসিয়ে খাইয়ে কমান্ডার তাঁর নিজের ভাঁড়ার খালি করতে চাননা, ওদিকে হাসপাতালও তামুরাকে রাখতে চায়না; কারণটা সেই একই, পেট! হাসপাতালের ভাঁড়ারও শূন্য, নিজের খাবার ব্যবস্থা করতে না পারলে কোন রোগীর দিকেই তাকাবারও অবসর নেই ডাক্তারদের, হাসপাতালে ভর্তি করা তো নেহাৎ দিবাস্বপ্ন। কমান্ডার তামুরাকে তাঁর কোম্পানী থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের ব্যবস্থা করে নিতে আদেশ করেন; যদি একান্তই খাদ্য-আশ্রয় এসবের কিছুই কপালে না জোটে, কোমরে গোঁজা গ্রেনেডটা ফাটিয়ে তামুরা যেন নিজের মুক্তির পথ বেছে নেয় সেই উপদেশও দিয়ে দেন। সহযোদ্ধারা তামুরার ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত, কোম্পানীতে থাকলে হয় না খেয়ে নয় প্রতিপক্ষের বোমায় মরতে হবে। তামুরা ঈর্ষান্বিত সহযোদ্ধাদের ভাগ্যে, কোম্পানীতে থাকতে পেলে র্যাশনের একটা করে আলু তো পাওয়া যেতো অন্তত! হাসপাতালের বাইরে সৈনিকেরা ডজনে ডজনে শুয়ে আছে, এদের সবাই ই ডায়রিয়া নয় ম্যালেরিয়া নয় যক্ষ্মায় ভুগছে, সবাই আশা করে আছে ডাক্তার অনুগ্রহ করে ডেকে নেবে একসময়, চিকিৎসা দেবে, দেবে একটু খেতেও! তামুরা জানে, যুদ্ধের এ ডামাডোলে কেউ কাউকে দেখবার নেই, নিজেকে বাঁচাবার আরেক যুদ্ধে সবাই ব্যস্ত। হাসপাতালে ফিরে যাবার অর্থ সামনের ময়দানে ঘাসের ওপর মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকা। তবু তামুরা যায়, তবে ডাক্তার রায় দেন তামুরা সম্পূর্ণ নীরোগ। নিরুপায় দূর্বল তামুরা বসে পড়ে হাসপাতালের সামনে কাতারে কাতারে শুয়ে থাকা মৃতপ্রায় সৈনিকদের মাঝে। মাঝরাতে মিত্র বাহিনীর শেল বর্ষণে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কোনমতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গিয়ে তামুরা দেখে হাসপাতাল দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বলছে মৃত, অর্ধমৃত, জীবন্মৃত কংকালসার সহযোদ্ধাদের দেহগুলোও। এরই মাঝে কেউ জ্বলন্ত হাসপাতাল ভবনে ঢুকে চুরি করে আনার চেষ্টা করছে র্যাশনের আলুগুলো। তামুরা যখন দূর থেকে তার সহযোদ্ধাদের পুড়ে যেতে দেখে, ওর আর তাদের উদ্ধার করতে রুচি হয়না, বরং বিকট শব্দে হাহা করে হেসে ওঠার প্রবল এক ইচ্ছেয় ওকে পেয়ে বসে।
শুরু হয় তামুরার ‘নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নেয়ার’ সংগ্রাম। ছিন্ন ভিন্ন পোশাকে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর তামুরা লিয়েতের জনমানবহীন গ্রামে ঘুরে বেড়ায় ভূতের মতো, আর একটু একটু করে হারাতে শুরু করে তার মানসিক সুস্থতা। পদে পদে নানারকম হোঁচট খেতে খেতে তামুরা শেষ পর্যন্ত দেখা পায় তার দুই কমরেডের, নাগামাৎসু আর ইয়াসুদা। আধপাগল তামুরার পরিচর্যা করে নাগামাৎসু, চাঙ্গা করে তোলে তাকে রীতিমত পুড়িয়ে রোস্ট করা বাঁদরের মাংস খাইয়ে। তবে সুখ বেশীদিন সয়না, বাঁদরের মাংস শেষ হয়ে আসছে, শিকারে বেরোতে হবে আবার। এরই মাঝে একদিন প্রাণপণ দৌড়ে পলায়নপর অর্ধনগ্ন এক জাপানী সৈনিকের দিকে নাগামাৎসুকে বন্দুক তাক করে গুলি ছুঁড়তে দেখে বাঁদরহীন লিয়েত দ্বীপে বাঁদরের মাংসের উৎসের রহস্যটি তামুরা অবশেষে ভেদ করতে পারে। ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে, টিকে থাকার সংগ্রামের হতাশায় নাগামাৎসুদের ন্যায়-অন্যায় বিচার করবার মানসিকতা আর নেই, লোপ পেয়েছে মানবিক অনুভূতিগুলোও। নিছক গল্প বানাবার জন্যই শোহেই ওকা এমন ঘোরালো প্লট ফাঁদেননি; উপন্যাসটির ইংরেজী অনুবাদক ইভান মরিস তাঁর ভূমিকাতে দাবী করেছেন ফিলিপাইনে জাপানী সৈনিকদের নরখাদক বনে যাবার ব্যাপারটি সত্যি, এর ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী বাহিনীর নরখাদকতার কথা এসেছে আরো বহু বিবৃতিতে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এই প্রতিবেদনে এসেছে জাপানী বাহিনীর যুদ্ধবন্দী ভারতীয় সৈনিকদের দিয়ে পেটপূজা করবার কথা, এসেছে দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর ২৫ বছর আগের এই প্রতিবেদনেও। যুদ্ধবাজ নেতারা যখন নিজ নিজ দেশের জনগণকে দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের গরম গরম কথায় উত্তেজিত করেন, মনুষ্যত্ব তখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিষ্ঠা, রক্ত আর কাদায় মাখামাখি হয়ে গুমরে কাঁদে। মানবতা ব্যাপারটি হয়ে যায় স্রেফ অভিধানে পাওয়া বাগাড়ম্বর বিশেষ।
বিশ্বসাহিত্যের অন্য মহান সব নিদর্শনের কাতারে ‘ফায়ারস অন দ্যা প্লেইন’-এর ঠাঁই কোথায় হবে সেটি তর্কের বিষয় হতে পারে, বিশেষত এর ইংরেজীতে অনুদিত সংস্করণটির জন্য। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে অনুবাদক ইভান মরিস মূল উপন্যাসের বেশ কিছু অংশ এড়িয়ে গেছেন। এছাড়াও ছোট খাট কিছু খুঁত তেমন করে দেখলে চোখে খানিকটা পড়ে বটে। ওকা নিজে ফরাসী সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন, ফরাসী বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম জাপানী ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এ উপন্যাসের নায়ক তামুরা’র মাঝে ওকা’র কিছুটা ছাপ রয়েছে, বিশেষত তামুরা’র ফরাসী সাহিত্যের ব্যাপারে জানাশোনার দিক দিয়ে; জীবন সংগ্রামে রত তামুরা অনেকটা স্বগতোক্তির মতই নিজেকে বারবার স্টেন্ডহালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ অংশগুলো পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগালে অবাক হবার কিছু থাকবেনা। সেনাবাহিনীর সর্বনিম্ন পদমর্যাদার সৈনিক ‘প্রাইভেট’ তামুরার সাথে ফরাসী সাহিত্যে অনুরাগী তামুরার একটা দূরত্ব থেকেই যায়; তামুরার চরিত্রটি হয়তো আরেকটু গভীরতার দাবী রাখে। ফিলিপাইনের এই মিশনে চোখের সামনে মানবজীবনের মূল্য শূণ্যের কোঠায় নেমে যেতে দেখে ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হওয়া তামুরার মনের ঈশ্বরচিন্তার উদ্রেক ঘটে; তামুরার ঈশ্বরভাবনার এই monologue গুলো উপন্যাসটিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দেয়, ফিলিপাইনের গির্জায়, বনে বাদাড়ে তামুরা খুঁজে ফেরে ঈশ্বরকে। এসব বাদে উপন্যাসটির শেষ তিনটি অধ্যায় এটির জন্য একধরণের বোঝা, এই অধ্যায়গুলো উপন্যাসের শিল্প-মান বাড়াতে কোন ভূমিকাতো রাখেইনি, বরং এদের উপস্থিতি পাঠককে হয়তো কিছুটা দ্বিধান্বিত করবে, একই আশঙ্কা ইভান মরিসও ব্যক্ত করেছেন তাঁর ভূমিকাতে। তবে তাই বলে উপন্যাসটির অবদান মোটেই কম নয়। সাহিত্য আমার কাছে এক ধরনের উন্নত মানের সাংবাদিকতা; মানব মনের জটিল খবরগুলো সাহিত্যিক অনায়াসে এনে দেবেন পাঠকের কাছে, আঁকবেন সমাজের ছবিটা, বায়োলজী খাতার মতো করে ছবির পাশে দাগ কেটে কেটে লেবেলিং করে দেখিয়ে দেবেন সমাজটা কেমন, কোথায় এর অসুখ...একজন সাহিত্যিকের কাছে এইই তো চাওয়া! কাফকা, কামু, মোঁপাসা, তলস্তয়, তারাশংকর, রবি ঠাকুরদের কাজগুলো পড়ে পড়ে মনে এক অন্ধ বিশ্বাস জন্মে গেছে, প্রচণ্ড সংবেদনশীল শ্রেষ্ঠতম মানুষটি না হলে সাহিত্যিক হওয়া চলেনা, কোনরকম শিল্পীই আসলে হওয়া চলেনা। পেটের ক্ষুধা স্বত্বেও সাহিত্যপ্রেমী তামুরার নরখাদক হতে না চাইবার জন্য নিজের সাথে যে যুদ্ধ, তার জন্ম তো ঐ সংবেদনশীলতা থেকেই, যা সাহিত্য আমাদের শেখায়। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিজের পিঠের এক টুকরো মাংস খুবলে নিলে তামুরা তা-ই তড়িঘড়ি করে মুখে পুরে নিয়ে স্বান্তনা খোঁজে, নিজের মাংস খেলে তো আর নরখাদক হবার পাপে পাপী হতে হয়না! মনের মাঝে ভীষণ এক কামড় কাজ করলেই এমন নির্মম ভাবে গল্প বলা যায়। 'ফায়ারস অন দ্যা প্লেইনে'র পাতায় পাতায় লুকিয়ে আছে মানুষের পশুবৃত্তির কাছে মানবিকতার পরাজয়ে লজ্জিত এক সাহিত্যিকের গ্লানি, কান পাতলে শোনা যায় শোহেই ওকা’র ব্যাথাতুর কণ্ঠ।
নাৎজি কি হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী কি জাপানী রাজকীয় বাহিনী, কুখ্যাত এইসব দলগুলো যে মানুষেরই তৈরী, এর সদস্যরা যে আদপেই মানুষ তা বোধহয় এক এরা ফাঁদে আটকা পড়লেই মনে পড়ে। 'ফায়ারস অন দ্যা প্লেইন' উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৫৯ সালে জাপানে একই নামের চলচ্চিত্র হয়েছিলো যা যুদ্ধবিরোধী অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু চলচ্চিত্রের মাঝে আজো স্মরণীয়। এরপর ১৯৮১ সালে জার্মান চিত্রপরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিনে আটকে পড়া এক নাৎজি দলের সত্য কাহিনী অবলম্বনে ‘ডাস বুট’ (Das Boot) চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। বাংলা সাহিত্যেও হুমায়ূন আহমেদের গল্পে ('পাপ') এসেছে বাংলাদেশের গ্রামে আটকে পড়া পাকিস্তানী এক সৈনিকের কথা। এঁদেরও বহু আগে এরিখ মারিয়া রেমার্ক লিখে গেছেন পায়ে পা লাগিয়ে ফালতু ফালতু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে দেয়া জার্মান বাহিনীর দুর্ভাগা সৈনিক পল বমারের গল্প ‘অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। এই গল্পগুলোতে উঠে আসা প্রত্যেকটি সামরিক বাহিনীই অগণিত মানুষের জন্য দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে এসেছে, মেতেছে যথেচ্ছ খুন-ধর্ষণ-লুটপাটে। তবুও কেন বমার, তামুরাদের জন্য আমাদের মন কাঁদে? স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে আটকে পড়া মাইনাস ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জুতোবিহীন তরুণ নাৎজি সৈনিকটির কথা ভেবে কেন দুঃখবোধ হয়? 'ডাস বুট' দেখতে গিয়ে কি স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের বিবরণী পড়তে গিয়ে অনেকবার নাৎজিদের কষ্টে খুশী হয়ে উঠতে গিয়েছি, পরক্ষণেই মনে পড়ে গেছে রেমার্কের কথা। এদের দুঃখে এত খুশী হলে রেমার্কের বইয়ে অত কষ্ট পাই কেন এই প্রশ্নে জর্জরিত হয়েছে মন। এ কি শুধুই রেমার্কের জাদুকরী লেখনীর জন্য? মানি, রেমার্কের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পল বমাররা ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু নাৎজি সৈনিককেই ইচ্ছের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হয়েছে ওপর মহলের নির্দেশে, হয়তো বয়েস তাদের অনেকেরই তখনও আঠেরো পুরোপুরি ছোঁয়নি, কিন্তু দলবদ্ধ মানুষের রুপ যে ভিন্ন! নিজের দিকে যখন হাওয়া বইছিলো তখন তো এরা কাউকে ছেড়ে কথা কয়নি, সে বেলা? এসব নিয়ে যত ভাবি, মাথাটা তত বিগড়ে যায়, মানবজীবনটা বড্ড ফালতু, অর্থহীন আর হাস্যকর ঠেকে, ঠিক-বেঠিক আর বুঝে উঠতে পারিনা। তবে তামুরা কেন তার সহযোদ্ধাদের জ্যান্ত পুড়ে মরা থেকে বাঁচাতে না গিয়ে হাহা করে হেসে উঠতে চেয়েছিলো সেটা আমি ঠিকই বুঝে নিতে পারি। show less
‘ডাইভিং বেল’ হলো ডুবুরীদের সমুদ্রের গভীরে পাঠাবার বিশেষ এক ব্যবস্থা। বাতাসকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত সরল এই যন্ত্রটির ব্যবহার শুরু সম্ভবত অ্যারিস্টটল এর সময়কাল থেকে। ছোটবেলায় গোসল করতে গেলে প্রায়ই একটা খেলা খেলতাম। মগের ভেতর শুকনো গামছা দলা পাকিয়ে ভরে মগটিকে উপুড় করে বালতির পানিতে চাপ দিয়ে দিয়ে ভেতরে ঠেলতাম। মগের পুরোটাই পানির তলায় চলে গেলেও ভেতরের গামছায় পানির স্পর্শও লাগতোনা, কারণ মগের ভেতরের বাতাস পানিকে ভেতরে ঢুকতে দেয়না। এই একই কার্যপ্রনালী ব্যবহার করেই ডাইভিং বেল তৈরী করা। ঘন্টা আকৃতির নিচের দিকে খোলা এই যন্ত্রতে করে ডুবুরীদের নামিয়ে দেয়া হতো গভীর show more পানিতে। গন্তব্যে পৌঁছাবার আগ পর্যন্ত ডুবুরীকে ডাইভিং বেল এর ভেতরে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো (চিত্র দ্রষ্টব্য):
ছোট্ট একটু সময়ের জন্য এক-দুজন মাত্র ডুবুরী বয়ে নিতে হতো বলে আগেকার যুগের ডাইভিং বেলগুলোর আয়তন খুব বেশী হতোনা, তাই ভেতরের সঞ্চিত বাতাসের পরিমাণও খুব সামান্যই হতো। জানালাবিহীন, অন্ধকার, বদ্ধ খুব ছোট একটি খোলস, যেখানে প্রতি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে অক্সিজেন কমে আসছে, সেখানে অল্প কিছুক্ষণ সময় কাটানোটাই কত কষ্টকর হতে পারে মনে মনে তার মোটামুটি একটি ধারণা আমরা বোধহয় করতে পারি। নিতান্ত পেশা বলেই ডুবুরীদের এই যন্ত্রের ভেতর বসে থাকতে হতো, তা-না হলে কে আর যেতে চাইবে দম বন্ধ করা অন্ধকার এই কুঠুরির ভেতর?
‘দি ডাইভিং বেল অ্যান্ড দি বাটারফ্লাই’ হলো এমনই এক অন্ধ কুঠুরির ভেতর আটকে পড়া একজন মানুষের স্মৃতিকথা। তবে, এ ক্ষেত্রে, ডাইভিং বেল শুধুই একটি রূপক। স্মৃতিকথার লেখক জাঁ দমিনিক বোবি আটকা পড়েছিলেন তাঁর নিজের শরীরের ভেতর, দারুণ দুরারোগ্য এক রোগে আক্রান্ত হয়ে। ১৯৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ফরাসী ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘এলে’র সম্পাদক বোবি হঠাৎ এক ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। বেখ সুখ মেখ (Berck-Sur-Mer) হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর বোবি আবিষ্কার করেন কি ভয়ানক এক অভিশাপ নেমে এসেছে তাঁর ওপর। হার্ট অ্যাটাকের পর বিরল যে রোগটিতে তিনি আক্রান্ত হন তার ডাক্তারী নাম ‘লকড ইন সিনড্রোম’ (Locked In Syndrome)। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্কের বোধবুদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী অংশটুকু শতভাগ সক্রিয় থাকে, অসাড় হয়ে যায় গোটা শরীর। হার্ট অ্যাটাকের বিশ দিন পর হাসপাতালে জেগে উঠে বোবি আবিষ্কার করেন তাঁর শরীরে কোন সাড় নেই, হাত পা নাড়াবার ক্ষমতা নেই, নেই বাকশক্তিও। শুধু দুটি চোখ আর ঘাড়ের সামান্য একটু অংশ সচল। কারো প্রশ্নের কোন জবাব দেবার উপায় তাঁর নেই, নাকের ওপর বসা সামান্য মাছিটাকে তাড়াবার শক্তিও নেই, শুয়ে শুয়ে কেবল চোখ দুটো দিয়ে যতদূর দেখা যায় ততটুকু দেখা। এই সুখও খুব বেশীদিন সইলোনা। ইনফেকশন হবার ভয়ে ডাক্তার তাঁর ডান চোখ সেলাই করে দেন। বহির্বিশ্বের সাথে বোবির যোগাযোগের একমাত্র উপায় এখন তাঁর বাম চোখ। এই বাম চোখ দিয়েই বোবি তাঁর ১৩০ পৃষ্ঠার স্মৃতিকথা লিখেন হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে!
রোমান অক্ষর ব্যবহার করা ভাষাগুলোর (যেমন ইংরেজী, ফরাসী, জার্মান, ইতালিয়ান ইত্যাদি) একটি মজার ব্যাপার আছে। ভাষাগুলোর যার যার ব্যবহারের প্রেক্ষিতে অক্ষরগুলোকে ব্যবহারের ক্রম অনুযায়ী সাজানো যায়, অর্থাৎ, সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত অক্ষরটি থেকে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত অক্ষর পর্যন্ত একটি তালিকা তৈরী করা যায়। ইংরেজীতে এটিকে ‘লেটার ফ্রিকোয়েন্সি’ বলে (যাঁরা এডগার অ্যালান পো’র ‘দি গোল্ড বাগ’ পড়েছেন তাঁদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার, এবং এটুকু পড়ে তাঁরা হয়তো মনে মনে হাসছেন! হেমেন্দ্রকুমার রায় এই গোল্ড বাগের ছায়া অবলম্বনেই ‘যখের ধন’ লেখেন)। ফরাসী ভাষায় ব্যবহারের ক্রম অনুযায়ী অক্ষরগুলোর তালিকাটা এরকমঃ
বাকশক্তি রহিত বোবিকে বেশীর ভাগ সময় হ্যাঁ অথবা না বাচক প্রশ্ন করতে হতো, যার জবাব তিনি চোখ টিপে দিতেন। একবার চোখ টিপলে ‘হ্যাঁ’, দুবার টিপলে ‘না’। বোবির সামনে তাঁর স্মৃতিকথার লেখিকা ক্লদ মেঁদিবিল লেটার ফ্রিকোয়েন্সির ওপরের তালিকাটা নিয়ে বসতেন এবং এক এক করে অক্ষরগুলো পড়ে যেতেন। যখনই বোবির চাহিদামাফিক শব্দটি আসত, বোবি চোখ টিপে বোঝাতেন। এভাবে এক একটি করে অক্ষর দিয়ে দিয়ে একটি শব্দ তৈরী হতো। এ কায়দায় একটি শব্দ লিখতে গড়ে দু মিনিট সময় লাগতো! বোবি প্রতিদিন গড়ে চার ঘন্টা ‘ডিকটেশন’ দিতেন। ধীরে ধীরে দশ মাসের অসামান্য পরিশ্রমের পর অবশেষে বইটি লেখা শেষ করেন বোবি। গোটা বইটি লেখার ডিকটেশন দিতে বোবিকে মোটামুটি দু লক্ষ বার চোখ টিপতে হয়েছে।
লকড-ইন সিনড্রোম নিয়ে জানবার পর প্রথম যে কথাটি আমার মনে হয়েছিলো, আমি যদি এই রোগে আক্রান্ত হই, আমি কি আর বই পড়তে পারবোনা? কক্ষনো কিছু লিখতে পারবোনা? ছবি দেখতে পারবোনা? প্রিয় মানুষগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে পারবোনা? জাগতিক বিষয়ে তাঁদের সাথে নানা কুতর্কে জড়াতে পারবোনা? শিক্ষার একধরণের কুফল আছে, মানুষকে এটি অতিরিক্ত কৌতূহলী করে তোলে, জানতে চাইবার জন্য মনকে ছটফট করায়। আমি জানিনা অক্ষরজ্ঞানহীন কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন হবে; আমার কেবলি মনে হয়, তাঁর জন্য কষ্টটা হয়তো তুলনামূলক কম হবে, হতে পারে এটি আমার হঠকারী একটি চিন্তা-শিক্ষিত/অশিক্ষিত ভেদে যেই হোন, কষ্টটা তো মানুষই ভোগ করবে-তবুও মনের কোনায় অন্ধ এক বিশ্বাস বাস করে, জগতের বেশীরভাগটাই দেখা হলোনা, জানা হলোনা এই ভীষণ সত্যটি যিনি জেনে গেছেন, তাঁর আফসোস আর অসহায়ত্বটাই বেশী।
শিল্প সাহিত্যের সমঝদার জাতি হিসেবে ফরাসীদের খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ফরাসী বোবি তাঁর বইয়ে সে প্রমাণ রেখেছেন। আকাশজোড়া অবসর সময় কাটাতে বোবি স্মরণ করেছেন তাঁর অসংখ্য প্রিয় চলচ্চিত্র আর বইকে। সমুদ্রের বালুকাবেলার দিকে তাকিয়ে জাঁ লুক গদা আর অরসন ওয়েলস এর চলচ্চিত্রগুলোর শুটিং চালিয়েছেন মনে মনে। আফসোস করেছেন সামনেই পড়ে থাকা এমিল জোলার বইটি পড়তে না পেরে। নিজের অবস্থা বর্ণনায় ব্যবহার করেছেন অভিজাত কাব্যিকতা। যে চমৎকার সেন্স অফ হিউমার এর পরিচয় এই বইয়ে দিয়েছেন বোবি, তাতে করে সংবেদনশীল পাঠকের জন্য এতো বুদ্ধিদীপ্ত একজন মানুষের এই পরিণতি মেনে নেয়াটা কিছুটা কষ্টকর-ই হবে। অনেকেই হয়তো মৃত্যুই কামনা করবেন এ অবস্থায়, বোবি তা চাননি। শারীরিক ভাবে বোবি আটকা পড়েছিলেন তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরের ডাইভিং বেলে, কিন্তু মন ছিলো তাঁর প্রজাপতির মতোই অস্থির, তা ছুটে বেড়িয়েছে বোবির ৪৩ বছরের সঞ্চিত অগণিত স্মৃতির পাতাগুলোয়। জাঁ দমিনিক বোবির স্মৃতিকথা প্রকাশের পরপর প্রচন্ড সাড়া ফেলে দেয়, তবে বোবি এ সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বইটি প্রকাশের দু’দিন পরই, ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ বোবির ইহজগতের কষ্টের শেষ হয় আকস্মিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে।
আমাদের অনেকেরই স্লিপ প্যারালাইসিস এর ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আছে, বাংলায় যাকে বলে ‘বোবায় ধরা’। ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে আবিষ্কার করা শরীর অচল হয়ে আছে, জিভ নাড়াবার উপায় নেই, শুধু গলার ভেতরের এক ধরণের অসহায় গোঁ গোঁ আওয়াজ জানিয়ে দেয় ‘বেঁচে আছি’। কি নিঃসীম শূণ্যতা আর শীতল আতঙ্ক, সেই বেঁচে থাকার অনুভূতিতে! স্লিপ প্যারালাইসিস এর গড় সময়কাল মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড। যাঁদের এ অভিজ্ঞতা আছে কেবল তাঁরাই হয়তো কিছুটা বুঝবেন বিশ দিন পর জেগে উঠে প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে বোবির কেমন লেগেছে, কেমন লেগেছে অথর্ব ভাবে এই দেড়টা বছর বেঁচে থাকাটা।
পুনশ্চঃ লকড-ইন সিনড্রোম নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে অন্য আরেকটি ঘটনার কথা জানলাম। কিছুটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, তবে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক সম্ভবত নয়। ১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে ভারতীয় নার্স অরুণা সেনবাগ তাঁর হাসপাতালের আর্দালি দ্বারা আক্রান্ত হন। আর্দালি তাঁকে কুকুর বাঁধার শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে পায়ুপথে ধর্ষণ করে। অরুণা 'ভেজিটেটিভ স্টেট' এ চলে গিয়েছিলেন, বেয়াল্লিশ বছরেও যে ঘুম ভাঙ্গেনি (ভেজিটেটিভ স্টেট এর সাথে কোমা'র পার্থক্য হলো, কোমায় রোগীর কিছু বোধশক্তি থাকে, ভেজিটেটিভ স্টেট এ রোগীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ আরো অনেক কমে যায়)। ২০১১ সালে অরুণা ৬৬ বছর বয়েসে মারা যান। অরুণার পক্ষে আবেদন করা হয়েছিলো তাঁকে ‘শান্তিপূর্ন মৃত্যু’র অনুমতি দেয়া হোক। আদালত তা খারিজ করে দেয়। অরুণার ধর্ষণকারীর ৭ বছরের জেল হয়েছিলো ডাকাতির অভিযোগে, ধর্ষণের বিষয়টি আদৌ আদালতে আসেনি, কারণ ১৯৭৩ সালের ভারতীয় আইনে পায়ুপথে ধর্ষণ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিলোনা! আমি নিশ্চিত হতে পারছিনা কোন বিষয়টি অধিকতর নিষ্ঠুর, অরুণা’র ধর্ষণ, নাকি তাঁকে ৪২ বছর ‘ভেজিটেবল’ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা, নাকি সাধারণের অগম্য আইনের জটিল মারপ্যাঁচ? show less
ছোট্ট একটু সময়ের জন্য এক-দুজন মাত্র ডুবুরী বয়ে নিতে হতো বলে আগেকার যুগের ডাইভিং বেলগুলোর আয়তন খুব বেশী হতোনা, তাই ভেতরের সঞ্চিত বাতাসের পরিমাণও খুব সামান্যই হতো। জানালাবিহীন, অন্ধকার, বদ্ধ খুব ছোট একটি খোলস, যেখানে প্রতি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে অক্সিজেন কমে আসছে, সেখানে অল্প কিছুক্ষণ সময় কাটানোটাই কত কষ্টকর হতে পারে মনে মনে তার মোটামুটি একটি ধারণা আমরা বোধহয় করতে পারি। নিতান্ত পেশা বলেই ডুবুরীদের এই যন্ত্রের ভেতর বসে থাকতে হতো, তা-না হলে কে আর যেতে চাইবে দম বন্ধ করা অন্ধকার এই কুঠুরির ভেতর?
‘দি ডাইভিং বেল অ্যান্ড দি বাটারফ্লাই’ হলো এমনই এক অন্ধ কুঠুরির ভেতর আটকে পড়া একজন মানুষের স্মৃতিকথা। তবে, এ ক্ষেত্রে, ডাইভিং বেল শুধুই একটি রূপক। স্মৃতিকথার লেখক জাঁ দমিনিক বোবি আটকা পড়েছিলেন তাঁর নিজের শরীরের ভেতর, দারুণ দুরারোগ্য এক রোগে আক্রান্ত হয়ে। ১৯৯৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ফরাসী ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘এলে’র সম্পাদক বোবি হঠাৎ এক ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। বেখ সুখ মেখ (Berck-Sur-Mer) হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর বোবি আবিষ্কার করেন কি ভয়ানক এক অভিশাপ নেমে এসেছে তাঁর ওপর। হার্ট অ্যাটাকের পর বিরল যে রোগটিতে তিনি আক্রান্ত হন তার ডাক্তারী নাম ‘লকড ইন সিনড্রোম’ (Locked In Syndrome)। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্কের বোধবুদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী অংশটুকু শতভাগ সক্রিয় থাকে, অসাড় হয়ে যায় গোটা শরীর। হার্ট অ্যাটাকের বিশ দিন পর হাসপাতালে জেগে উঠে বোবি আবিষ্কার করেন তাঁর শরীরে কোন সাড় নেই, হাত পা নাড়াবার ক্ষমতা নেই, নেই বাকশক্তিও। শুধু দুটি চোখ আর ঘাড়ের সামান্য একটু অংশ সচল। কারো প্রশ্নের কোন জবাব দেবার উপায় তাঁর নেই, নাকের ওপর বসা সামান্য মাছিটাকে তাড়াবার শক্তিও নেই, শুয়ে শুয়ে কেবল চোখ দুটো দিয়ে যতদূর দেখা যায় ততটুকু দেখা। এই সুখও খুব বেশীদিন সইলোনা। ইনফেকশন হবার ভয়ে ডাক্তার তাঁর ডান চোখ সেলাই করে দেন। বহির্বিশ্বের সাথে বোবির যোগাযোগের একমাত্র উপায় এখন তাঁর বাম চোখ। এই বাম চোখ দিয়েই বোবি তাঁর ১৩০ পৃষ্ঠার স্মৃতিকথা লিখেন হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে!
রোমান অক্ষর ব্যবহার করা ভাষাগুলোর (যেমন ইংরেজী, ফরাসী, জার্মান, ইতালিয়ান ইত্যাদি) একটি মজার ব্যাপার আছে। ভাষাগুলোর যার যার ব্যবহারের প্রেক্ষিতে অক্ষরগুলোকে ব্যবহারের ক্রম অনুযায়ী সাজানো যায়, অর্থাৎ, সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত অক্ষরটি থেকে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত অক্ষর পর্যন্ত একটি তালিকা তৈরী করা যায়। ইংরেজীতে এটিকে ‘লেটার ফ্রিকোয়েন্সি’ বলে (যাঁরা এডগার অ্যালান পো’র ‘দি গোল্ড বাগ’ পড়েছেন তাঁদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার, এবং এটুকু পড়ে তাঁরা হয়তো মনে মনে হাসছেন! হেমেন্দ্রকুমার রায় এই গোল্ড বাগের ছায়া অবলম্বনেই ‘যখের ধন’ লেখেন)। ফরাসী ভাষায় ব্যবহারের ক্রম অনুযায়ী অক্ষরগুলোর তালিকাটা এরকমঃ
ESARINTULOMDPCFBVHGJQZYXKW
বাকশক্তি রহিত বোবিকে বেশীর ভাগ সময় হ্যাঁ অথবা না বাচক প্রশ্ন করতে হতো, যার জবাব তিনি চোখ টিপে দিতেন। একবার চোখ টিপলে ‘হ্যাঁ’, দুবার টিপলে ‘না’। বোবির সামনে তাঁর স্মৃতিকথার লেখিকা ক্লদ মেঁদিবিল লেটার ফ্রিকোয়েন্সির ওপরের তালিকাটা নিয়ে বসতেন এবং এক এক করে অক্ষরগুলো পড়ে যেতেন। যখনই বোবির চাহিদামাফিক শব্দটি আসত, বোবি চোখ টিপে বোঝাতেন। এভাবে এক একটি করে অক্ষর দিয়ে দিয়ে একটি শব্দ তৈরী হতো। এ কায়দায় একটি শব্দ লিখতে গড়ে দু মিনিট সময় লাগতো! বোবি প্রতিদিন গড়ে চার ঘন্টা ‘ডিকটেশন’ দিতেন। ধীরে ধীরে দশ মাসের অসামান্য পরিশ্রমের পর অবশেষে বইটি লেখা শেষ করেন বোবি। গোটা বইটি লেখার ডিকটেশন দিতে বোবিকে মোটামুটি দু লক্ষ বার চোখ টিপতে হয়েছে।
লকড-ইন সিনড্রোম নিয়ে জানবার পর প্রথম যে কথাটি আমার মনে হয়েছিলো, আমি যদি এই রোগে আক্রান্ত হই, আমি কি আর বই পড়তে পারবোনা? কক্ষনো কিছু লিখতে পারবোনা? ছবি দেখতে পারবোনা? প্রিয় মানুষগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে পারবোনা? জাগতিক বিষয়ে তাঁদের সাথে নানা কুতর্কে জড়াতে পারবোনা? শিক্ষার একধরণের কুফল আছে, মানুষকে এটি অতিরিক্ত কৌতূহলী করে তোলে, জানতে চাইবার জন্য মনকে ছটফট করায়। আমি জানিনা অক্ষরজ্ঞানহীন কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন হবে; আমার কেবলি মনে হয়, তাঁর জন্য কষ্টটা হয়তো তুলনামূলক কম হবে, হতে পারে এটি আমার হঠকারী একটি চিন্তা-শিক্ষিত/অশিক্ষিত ভেদে যেই হোন, কষ্টটা তো মানুষই ভোগ করবে-তবুও মনের কোনায় অন্ধ এক বিশ্বাস বাস করে, জগতের বেশীরভাগটাই দেখা হলোনা, জানা হলোনা এই ভীষণ সত্যটি যিনি জেনে গেছেন, তাঁর আফসোস আর অসহায়ত্বটাই বেশী।
শিল্প সাহিত্যের সমঝদার জাতি হিসেবে ফরাসীদের খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ফরাসী বোবি তাঁর বইয়ে সে প্রমাণ রেখেছেন। আকাশজোড়া অবসর সময় কাটাতে বোবি স্মরণ করেছেন তাঁর অসংখ্য প্রিয় চলচ্চিত্র আর বইকে। সমুদ্রের বালুকাবেলার দিকে তাকিয়ে জাঁ লুক গদা আর অরসন ওয়েলস এর চলচ্চিত্রগুলোর শুটিং চালিয়েছেন মনে মনে। আফসোস করেছেন সামনেই পড়ে থাকা এমিল জোলার বইটি পড়তে না পেরে। নিজের অবস্থা বর্ণনায় ব্যবহার করেছেন অভিজাত কাব্যিকতা। যে চমৎকার সেন্স অফ হিউমার এর পরিচয় এই বইয়ে দিয়েছেন বোবি, তাতে করে সংবেদনশীল পাঠকের জন্য এতো বুদ্ধিদীপ্ত একজন মানুষের এই পরিণতি মেনে নেয়াটা কিছুটা কষ্টকর-ই হবে। অনেকেই হয়তো মৃত্যুই কামনা করবেন এ অবস্থায়, বোবি তা চাননি। শারীরিক ভাবে বোবি আটকা পড়েছিলেন তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরের ডাইভিং বেলে, কিন্তু মন ছিলো তাঁর প্রজাপতির মতোই অস্থির, তা ছুটে বেড়িয়েছে বোবির ৪৩ বছরের সঞ্চিত অগণিত স্মৃতির পাতাগুলোয়। জাঁ দমিনিক বোবির স্মৃতিকথা প্রকাশের পরপর প্রচন্ড সাড়া ফেলে দেয়, তবে বোবি এ সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বইটি প্রকাশের দু’দিন পরই, ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ বোবির ইহজগতের কষ্টের শেষ হয় আকস্মিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে।
আমাদের অনেকেরই স্লিপ প্যারালাইসিস এর ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আছে, বাংলায় যাকে বলে ‘বোবায় ধরা’। ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে আবিষ্কার করা শরীর অচল হয়ে আছে, জিভ নাড়াবার উপায় নেই, শুধু গলার ভেতরের এক ধরণের অসহায় গোঁ গোঁ আওয়াজ জানিয়ে দেয় ‘বেঁচে আছি’। কি নিঃসীম শূণ্যতা আর শীতল আতঙ্ক, সেই বেঁচে থাকার অনুভূতিতে! স্লিপ প্যারালাইসিস এর গড় সময়কাল মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড। যাঁদের এ অভিজ্ঞতা আছে কেবল তাঁরাই হয়তো কিছুটা বুঝবেন বিশ দিন পর জেগে উঠে প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে বোবির কেমন লেগেছে, কেমন লেগেছে অথর্ব ভাবে এই দেড়টা বছর বেঁচে থাকাটা।
পুনশ্চঃ লকড-ইন সিনড্রোম নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে অন্য আরেকটি ঘটনার কথা জানলাম। কিছুটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, তবে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক সম্ভবত নয়। ১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে ভারতীয় নার্স অরুণা সেনবাগ তাঁর হাসপাতালের আর্দালি দ্বারা আক্রান্ত হন। আর্দালি তাঁকে কুকুর বাঁধার শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে পায়ুপথে ধর্ষণ করে। অরুণা 'ভেজিটেটিভ স্টেট' এ চলে গিয়েছিলেন, বেয়াল্লিশ বছরেও যে ঘুম ভাঙ্গেনি (ভেজিটেটিভ স্টেট এর সাথে কোমা'র পার্থক্য হলো, কোমায় রোগীর কিছু বোধশক্তি থাকে, ভেজিটেটিভ স্টেট এ রোগীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ আরো অনেক কমে যায়)। ২০১১ সালে অরুণা ৬৬ বছর বয়েসে মারা যান। অরুণার পক্ষে আবেদন করা হয়েছিলো তাঁকে ‘শান্তিপূর্ন মৃত্যু’র অনুমতি দেয়া হোক। আদালত তা খারিজ করে দেয়। অরুণার ধর্ষণকারীর ৭ বছরের জেল হয়েছিলো ডাকাতির অভিযোগে, ধর্ষণের বিষয়টি আদৌ আদালতে আসেনি, কারণ ১৯৭৩ সালের ভারতীয় আইনে পায়ুপথে ধর্ষণ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিলোনা! আমি নিশ্চিত হতে পারছিনা কোন বিষয়টি অধিকতর নিষ্ঠুর, অরুণা’র ধর্ষণ, নাকি তাঁকে ৪২ বছর ‘ভেজিটেবল’ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা, নাকি সাধারণের অগম্য আইনের জটিল মারপ্যাঁচ? show less
নৃতত্ত্ববিদ্যা মতে মানব সভ্যতার জন্ম ২০,০০০-৪৪,০০০ বছর আগে। এই সময়টার ভেতর মানুষ খুব ধীরে ধীরে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে। মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে, হাড় দিয়ে হাতিয়ার তৈরী করেছে, পশুর সাথে হুটোপাটি না করেও স্রেফ বিষ দিয়েই যে অনেক কম ক্লেশে শিকার করে ফেলা যায় তা জেনেছে, পাথুরে গুহার গায়ে আঁচড় দিয়ে ছবি এঁকেছে...। এভাবে এক সময় মানুষ জায়গার পরিমাপের নিখুঁত হিসেব করতেও শিখে গেলো। ভূখণ্ডের কতখানি নিয়ে একটি সাম্রাজ্য বা দেশ হয় তার আন্দাজ পেলো। এত এত সব বিদ্যা একটু একটু করে অর্জন করে এই বড়জোর হাজার পাঁচেক বছর আগে মাত্র মানুষ জানতে পেলো পৃথিবী সসীম এবং এর আকার গোল show more (কারণ সমুদ্রে দাঁড়িয়ে অনেক দূরে বিপরীত দিক থেকে আগুয়ান জাহাজ এর দিকে তাকালে জাহাজের সবচেয়ে উঁচু অংশ মাস্তুলটিই প্রথমে দেখা যায়, তারপরে একটু একটু করে পুরো জাহাজটা চোখে পড়ে। পৃথিবী যদি সমান হতো তাহলে প্রথমবারেই জাহাজের পুরোটা দেখে ফেলা যেতো!)। পৃথিবীর আকার সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাবার অনেক বছর পর মানুষ জানতে পারলো পৃথিবীই শেষ নয়, সৌরজগৎ আছে, যেখানে কিনা পৃথিবীর মতো এমন আরো খান দশেক গ্রহ ঘুরপাক খাচ্ছে। এরপর আবিষ্কৃত হল সৌরজগৎ আসলে নিতান্তই শিশু। তারা বাস করে গ্যালাক্সির ভেতর। আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) তার পেটের ভেতর প্রায় ১০০,০০০,০০০,০০০ নক্ষত্র নিয়ে বসে আছে (প্রায় সব নক্ষত্রেরই নিজের নিজের সৌরজগৎ আছে। অতএব, হিসেব মতে, মিল্কিওয়েতে মোটামুটি ১০০,০০০,০০০,০০০ বা এর কাছাকাছি সংখ্যক সৌরজগৎ আছে)। এমন গ্যালাক্সিও আছে প্রায় এই একই সংখ্যক-ই। এই নিয়েই ইউনিভার্স বা সৃষ্টিজগৎ। এ যেন অনেকটা রাশান মাত্রিওশকা পুতুল, কিংবা ৫ বাটির লাঞ্চ বক্স সেট, প্রত্যেকটির ভেতরই এক সাইজ ছোটটি গুঁজে দেয়া।
কিন্তু সবচেয়ে বড় শেষ বাটিটা কোথায়? ইউনিভার্স কি নিজেই এক সাইজ ছোট কোন বাটির ভেতর আছে? ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত স্বর্গ-নরক, দোজখ-বেহেশত কিংবা রূপকথার গল্পের ভালহাল্লা-অজল্যান্ড যদি থেকে থাকে, সেগুলো কি এই ইউনিভার্স এর ভেতরেই? নাকি অন্য কোন সৃষ্টিজগৎ সেটি? আধুনিক বিজ্ঞানের অসাধারণ প্রসারের কারণে আজ আমরা সৌরজগৎ, গ্যালাক্সি ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত ইউনিভার্সের পুরো চিত্রটির অনেকখানি ‘দেখে’ ফেলতে পারি, অন্য কোন ইউনিভার্স এর সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারি। তবে প্যারালাল ইউনিভার্স বা অল্টারনেট রিয়ালিটি নিয়ে মানুষ হাজার হাজার বছর আগেই চিন্তা করে গেছে। প্লেটোর দর্শনে এই সম্ভাবনার কথা এসেছে বারবার। এসেছে আধুনিক সাইন্স ফিকশনের অন্যতম জনক এইচ জি ওয়েলস এর লেখায়ও। আমার সবচেয়ে প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে অন্যতম প্রধান দুটি হলো ‘দ্যা উইজার্ড অফ অজ’ (১৯৩৯) ও ‘ইট’স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ (১৯৪৬)। দুটি ছবিরই থিম অল্টারনেট রিয়ালিটি। মার্ভেল-ডিসি কমিক্স এর সুপারহিরোরা অহরহ এক বাস্তবতা থেকে অন্য বাস্তবতায় ভ্রমণ করছে দুষ্টের দমনে। এই ইউনিভার্স এর ভালো ব্যাটম্যান অন্য এক ইউনিভার্স এর মন্দ ব্যাটম্যান এর ভয়ঙ্কর কোন প্ল্যান নস্যাৎ করে দিচ্ছে। অল্টারনেট রিয়ালিটির অভিজ্ঞতা হয়েছে ১৩ বছরের হ্যারি পটারেরও। ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে দর্শনের বই, সাইন্স ফিকশন থেকে কমিক্স জগত – সবখানেই প্যারালাল ইউনিভার্স এর রাজত্ব। তবে কমিক্স বা ফিকশন মানুষের কল্পনা প্রসূত। আসলেই কি ভিন্ন এমন কোন বাস্তবতা আছে যেখানে আরেকজন আমি ঠিক এই লেখাটিই কি-বোর্ডের একই অক্ষর গুলো একই সময়ে চেপে চেপে লিখছে আর “ওইদিকের আমি’র” কথা ভাবছে? গণিত ও থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বলছে এমন টা আসলেই হতে পারে! প্যারালাল ইউনিভার্সের অস্তিত্ব ও তাদের সম্ভাবনা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অসংখ্য পদার্থবিদ ও স্ট্রিং থিওরিস্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রায়ান গ্রিন এঁদেরই একজন। যে সম্ভাবনাময় বাস্তবতাগুলো আমাদের জগতের সাথে সমান্তরাল ভাবে বয়ে যাচ্ছে এবং (অবশ্যই) যাদের আমরা চোখে দেখতে পারিনা, গ্রিন তাঁর বই ‘দ্যা হিডেন রিয়ালিটিঃ প্যারালাল ইউনিভার্সেস অ্যান্ড দ্যা ডিপ ল’জ অফ দ্যা কসমস’ এ সেই লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাগুলোর খোঁজ করেছেন। ফিজিক্সে হাতেখড়ি যাঁদের নেই, ধরিয়ে দিতে দেয়েছেন তাঁদের হাতে চিন্তার কিছু সুতো।
প্যারালাল ইউনিভার্সের অস্তিত্ব নিয়ে ব্রায়ান গ্রিন এর যুক্তি প্রদর্শনের আগে সম্ভাবনার অন্য একটা গল্প উপক্রমণিকা হিসেবে বলি। তারপর মূল পর্ব! ১০ বন্ধু ম্যাট্রিক পাশ দেবার পর উদযাপন করতে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলো। কিন্তু রেস্টুরেন্টের টেবিলে কে কার পাশে বসে খাবে তা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া শুরু হয়ে গেলো। একজন প্রস্তাব করছে জন্মমাস ক্রম অনুযায়ী বসা যাক, আরেকজন প্রস্তাব করছে উচ্চতার ক্রম হিসেবে বসলে ভালো হয়। কেউই মনস্থির করতে পারছেনা, রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারও টেবিলে খাওয়া সার্ভ করতে পারছেননা। শেষে ম্যানেজার তাদের কাছে গিয়ে প্রস্তাব করলেন, আজকে যে যেভাবে বসেছেন সেভাবেই বসে যান, আর একটা কাগজে বসার ক্রমটা টুকে নিয়ে যান। কাল এসে আবার অন্য ভাবে বসবেন। এভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন অর্ডারে বসে ১০ জনে যত রকম ভাবে বসা সম্ভব তা শেষ করতে হবে। যেদিন শেষ হয়ে যাবে, ম্যানেজার সেদিন বিনা খরচায় তাদের ইচ্ছেমতো খাওয়াবেন। প্রবাবিলিটি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স কিংবা পার্মুটেশন-কম্বিনেশন এর সাথে যাঁরা পরিচিত তাঁরা ভেতরের ‘ক্যাচ’টা জানেন। গণিতে ফ্যাক্টোরিয়াল (একে ‘!’ দ্বারা প্রকাশ করা হয়) বলে একটি বিষয় আছে যা নির্দেশ করে একটি ঘটনাকে কতভাবে ঘটানো সম্ভব। ৩ টি সংখ্যাকে (ধরুন ৭, ৮, ৯) ৩! অর্থ্যাৎ ৩x২x১ = ৬ টি অর্ডারে সাজানো সম্ভব (৭.৮.৯, ৭.৯.৮, ৮.৭.৯, ৮.৯.৭, ৯.৭.৮, ৯.৮.৭) । এর পর আবার সাজাতে গেলে এই ৬টির কোন একটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অতএব সেই ১০ জন ছাত্রের প্রতিদিন নতুন অর্ডারে বসে খেতে গেলে ১০! = ১০x৯x৮x৭x৬x৫x৪x৩x২x১ = ৩,৬২৮,৮০০ দিন = ৯,৯৪১ বছরের কিছু বেশী সময় লাগবে! তাদের প্রতিশ্রুত সেই ফ্রি খাওয়া আর পাওয়া হবেনা কখনো। প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে ব্রায়ান গ্রিনের যুক্তিও ঠিক এটিই। আমাদের ইউনিভার্স হয় অসীম নয়তো সসীম। যদি সসীম হয়, অর্থাৎ বালুকণা, নক্ষত্র, নক্ষত্রের রং, তাদের রাসায়নিক গঠন ইত্যাদির প্রত্যেকটির সংখ্যা যদি কোথাও গিয়ে শেষ হয়, যা পরিমাপ করা যায়, তাহলে পার্মুটেশন কম্বিনেশনের যুক্তিমতে তাদের নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন অর্ডারে সাজানো সম্ভব! একজন মানুষ অসংখ্য ইলেক্ট্রন-প্রোটন-কোয়ার্ক এর সমন্বয়ে গঠিত। তার চেহারা, বর্ন, চিন্তার প্রকৃতি, কন্ঠস্বর ইত্যাদি কেমন হবে তার সবই নির্ভর করে কিভাবে তার শরীরের সাব-অ্যাটমিক পার্টিকেলগুলো একে অন্যের সাথে ক্রিয়া করছে। পৃথিবীতে ৭০০ কোটি মানুষ আছে, আমাদের সবার প্রকৃতি হয়তো এক কিন্তু তবুও আমরা প্রত্যেকেই আলাদা। কতভাবে সাব অ্যাটমিক পার্টিকেল গুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে সাজালে ৭০০ কোটি মানুষ পাওয়া যেতে পারে? যে মানুষটি দেখতে প্রায় হুবহু আমার মতো, কন্ঠস্বর আমার মতো, চিন্তা একই রকম কিন্তু তবু এক নয়, তার সাথে হয়তো আমার মাত্র কয়েক কোটি কণার বেশকম। পার্থক্য নির্ধারণকারী এই অল্প কয়েক কোটি কণা যদি আমার শরীরে ঠিক যে কম্বিনেশনে ‘বন্টিত’ হয়েছে, সেভাবে তার শরীরেও বন্টিত হত,অর্থাৎ তার আর আমার মাঝে ১টি কণারও কোন পার্থক্য না থাকতো, তাহলে আমার পুনরাবৃত্তি ঘটতো! সে মানুষটি আরেকজন আমি-ই হতাম। আমাদের ইউনিভার্স যদি সসীম সংখ্যক কণার সমন্বয়ে গঠিত হয়, তাহলে সম্ভাব্য সব ভাবে তাদের সাজানোর পর কোন এক সময় আবার তাদের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর অর্থ হয়তো ঠিক এমনই আরেকটি ইউনিভার্স খুব কাছেই কোথাও অথবা ভয়ানক দূরে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে, যেখানে এখানের ঘটনাগুলোই ঘটে চলেছে, আয়নার প্রতিফলনের মতো। টিভির শোরুমে যেমন বিভিন্ন মডেলের অনেকগুলো টিভিতে একই চ্যানেল চালিয়ে রাখে, একই ঘটনা বেশ কয়েকটা টিভিতে একই সাথে ঘটতে দেখা যায় শোরুমের কাঁচের দরজার বাইরে থেকে, অনেকগুলো প্যারালাল ইউনিভার্স যদি আমরা ‘বাইরে’ থেকে কোনভাবে দেখি, এমনটাই কি দেখবো? পুনরাবৃত্তি ব্যতিরেকে অন্য যে সম্ভাবনাময় ইউনিভার্স গুলো আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটাতেই ঐ কয়েক কোটি কণার এদিক ওদিক হয়ে যাবার কারণে আমি একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও হয়তো আমি ছ্যাঁচড়া চোর, কোথাও হয়তো রাজনীতিবিদ (‘সম্ভাবনাময়’ আমার এ দুটো সত্ত্বাই বোধ করি কণাগুলোর একই কম্বিনেশন দিয়ে পাওয়া সম্ভব!)।
মাল্টিভার্স বা অন্যান্য ইউনিভার্স গঠিত হবার ৯টি সম্ভাব্য উপায় বা মডেল আছে, অন্তত আজকের পদার্থবিজ্ঞান মতে। ব্রায়ান গ্রিন একেক অধ্যায়ে খুব গুছিয়ে ব্যখ্যা করেছেন সবগুলোই। কোথাও স্পেসটাইম একটি কম্বল বা বিছানার চাদরের মতো যেখানে একটু পর পর ফুলের নকশা প্রিন্ট করা আছে। স্পেস্টাইম বিছানার চাদরের মতো হলে (এবং অসীমভাবে বিস্তৃত হলে) ইউনিভার্স হবে নকশার সেই শোভাবর্ধনকারী ফুলগুলো। কোন মডেল বলে ইউনিভার্স হল পাঁউরুটির একটি স্লাইস। এমন অনেক গুলো স্লাইস (অর্থাৎ ইউনিভার্স) নিয়ে বড় একটি 'মেমব্রেন' বা সংক্ষেপে ‘ব্রেইন’। এই মডেল থেকেই ‘এম থিওরী’ উদ্ভাবিত হয়েছে। কোন মডেল বলে দুটি পাঁউরুটি’র স্লাইস বা দুটি ইউনিভার্স এর সংঘর্ষের ফলে নতুন ইউনিভার্স তৈরী হয়। কোন থিওরী বলে আমরা সবাই আসলে হলোগ্রাম, বাস্তব নই! আলোর সামনে আপনি হাত নাচালে দেয়ালে যে ছায়া পড়ে তা হলাম আমরা। অন্য কোথাও কেউ সুতো নাড়াচ্ছে তাই আমরা নড়ছি, আমাদের কাজগুলো আমাদের ইচ্ছেপ্রসূত নয়! প্লেটো এমনকি এই সম্ভাবনার কথাও ভেবে গেছেন। কোন মডেল বলে আমরা হলাম কম্পিউটার সিমুলেশন। খুব শক্তিশালী কোন কম্পিউটার কোথাও খুব শক্তিশালী কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে আমাদের তৈরী করেছে। আমরা সেই প্রোগ্রামার কে কোন দিন দেখতে পারবো কিনা তা নির্ভর করছে সেই প্রোগ্রামার আমাদের সেই ক্ষমতা দিয়ে প্রোগ্রাম করেছেন কিনা! এ ধরণের চিন্তা আপনাকে সৃষ্টিকর্তার দিকে নাকি প্রকৃতির দিকে ধাবিত করাবে সেটি আপনার ব্যাপার তবে উভয় ক্ষেত্রেই চিন্তাগুলো আপনাকে বিনয়ী করবে নিশ্চিত। এত বড় সৃষ্টিজগতে আমাদের সম্ভবত সরাসরি কোন ভূমিকা নেই। পিঁপড়াদের দলের কোন বিশেষ একটি দলপতির ভূমিকা আমরা কখনো আমাদের ইতিহাসের বইতে লিখে রাখিনা, কিন্তু পিঁপড়ারা কি আমাদের জীবনে কোনভাবে ভূমিকা রাখছেনা? ব্যাক্টেরিয়াদের আমরা চোখেই দেখতে পাইনা অথচ ভালো-মন্দ দুদিকেই তাদের কত অবদান আমাদের জীবনে! মহাবিশ্বেরও শেষ আছে। একদিন সব নক্ষত্রের আলো ফুরিয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে এর প্রতিটি কণাও। আমাদের এত এত কার্যকলাপ, এত গবেষণা, আবেগ, শিল্প, সাহিত্য, ভালোবাসার ইতিহাস এগুলো সবই ফুস করে একদিন হারিয়ে যাবে? কোথাও কোন রেকর্ড থাকবেনা? পিঁপড়াদের সেই দলপতির মত অবস্থা হবে আমাদের যার অস্তিত্বকে আমরা পাত্তাও দেইনি? কেন যেন মনে হয় যত ক্ষুদ্রই হই না কেন আমরা, যে বিশাল মহাবিশ্ব আমাদের তার বুকে স্থান দিয়েছে, পালন করছে, আমরা তার চোখ এড়িয়ে যাবোনা। কোথাও আমাদের ছবি ঠিকই তোলা হয়ে রইলো। ইউনিভার্স তার ব্যাক্টেরিয়াদের ঠিকঠিক গুণে গুণে রাখে! show less
কিন্তু সবচেয়ে বড় শেষ বাটিটা কোথায়? ইউনিভার্স কি নিজেই এক সাইজ ছোট কোন বাটির ভেতর আছে? ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত স্বর্গ-নরক, দোজখ-বেহেশত কিংবা রূপকথার গল্পের ভালহাল্লা-অজল্যান্ড যদি থেকে থাকে, সেগুলো কি এই ইউনিভার্স এর ভেতরেই? নাকি অন্য কোন সৃষ্টিজগৎ সেটি? আধুনিক বিজ্ঞানের অসাধারণ প্রসারের কারণে আজ আমরা সৌরজগৎ, গ্যালাক্সি ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত ইউনিভার্সের পুরো চিত্রটির অনেকখানি ‘দেখে’ ফেলতে পারি, অন্য কোন ইউনিভার্স এর সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারি। তবে প্যারালাল ইউনিভার্স বা অল্টারনেট রিয়ালিটি নিয়ে মানুষ হাজার হাজার বছর আগেই চিন্তা করে গেছে। প্লেটোর দর্শনে এই সম্ভাবনার কথা এসেছে বারবার। এসেছে আধুনিক সাইন্স ফিকশনের অন্যতম জনক এইচ জি ওয়েলস এর লেখায়ও। আমার সবচেয়ে প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে অন্যতম প্রধান দুটি হলো ‘দ্যা উইজার্ড অফ অজ’ (১৯৩৯) ও ‘ইট’স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ (১৯৪৬)। দুটি ছবিরই থিম অল্টারনেট রিয়ালিটি। মার্ভেল-ডিসি কমিক্স এর সুপারহিরোরা অহরহ এক বাস্তবতা থেকে অন্য বাস্তবতায় ভ্রমণ করছে দুষ্টের দমনে। এই ইউনিভার্স এর ভালো ব্যাটম্যান অন্য এক ইউনিভার্স এর মন্দ ব্যাটম্যান এর ভয়ঙ্কর কোন প্ল্যান নস্যাৎ করে দিচ্ছে। অল্টারনেট রিয়ালিটির অভিজ্ঞতা হয়েছে ১৩ বছরের হ্যারি পটারেরও। ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে দর্শনের বই, সাইন্স ফিকশন থেকে কমিক্স জগত – সবখানেই প্যারালাল ইউনিভার্স এর রাজত্ব। তবে কমিক্স বা ফিকশন মানুষের কল্পনা প্রসূত। আসলেই কি ভিন্ন এমন কোন বাস্তবতা আছে যেখানে আরেকজন আমি ঠিক এই লেখাটিই কি-বোর্ডের একই অক্ষর গুলো একই সময়ে চেপে চেপে লিখছে আর “ওইদিকের আমি’র” কথা ভাবছে? গণিত ও থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বলছে এমন টা আসলেই হতে পারে! প্যারালাল ইউনিভার্সের অস্তিত্ব ও তাদের সম্ভাবনা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অসংখ্য পদার্থবিদ ও স্ট্রিং থিওরিস্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রায়ান গ্রিন এঁদেরই একজন। যে সম্ভাবনাময় বাস্তবতাগুলো আমাদের জগতের সাথে সমান্তরাল ভাবে বয়ে যাচ্ছে এবং (অবশ্যই) যাদের আমরা চোখে দেখতে পারিনা, গ্রিন তাঁর বই ‘দ্যা হিডেন রিয়ালিটিঃ প্যারালাল ইউনিভার্সেস অ্যান্ড দ্যা ডিপ ল’জ অফ দ্যা কসমস’ এ সেই লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাগুলোর খোঁজ করেছেন। ফিজিক্সে হাতেখড়ি যাঁদের নেই, ধরিয়ে দিতে দেয়েছেন তাঁদের হাতে চিন্তার কিছু সুতো।
প্যারালাল ইউনিভার্সের অস্তিত্ব নিয়ে ব্রায়ান গ্রিন এর যুক্তি প্রদর্শনের আগে সম্ভাবনার অন্য একটা গল্প উপক্রমণিকা হিসেবে বলি। তারপর মূল পর্ব! ১০ বন্ধু ম্যাট্রিক পাশ দেবার পর উদযাপন করতে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলো। কিন্তু রেস্টুরেন্টের টেবিলে কে কার পাশে বসে খাবে তা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া শুরু হয়ে গেলো। একজন প্রস্তাব করছে জন্মমাস ক্রম অনুযায়ী বসা যাক, আরেকজন প্রস্তাব করছে উচ্চতার ক্রম হিসেবে বসলে ভালো হয়। কেউই মনস্থির করতে পারছেনা, রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারও টেবিলে খাওয়া সার্ভ করতে পারছেননা। শেষে ম্যানেজার তাদের কাছে গিয়ে প্রস্তাব করলেন, আজকে যে যেভাবে বসেছেন সেভাবেই বসে যান, আর একটা কাগজে বসার ক্রমটা টুকে নিয়ে যান। কাল এসে আবার অন্য ভাবে বসবেন। এভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন অর্ডারে বসে ১০ জনে যত রকম ভাবে বসা সম্ভব তা শেষ করতে হবে। যেদিন শেষ হয়ে যাবে, ম্যানেজার সেদিন বিনা খরচায় তাদের ইচ্ছেমতো খাওয়াবেন। প্রবাবিলিটি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স কিংবা পার্মুটেশন-কম্বিনেশন এর সাথে যাঁরা পরিচিত তাঁরা ভেতরের ‘ক্যাচ’টা জানেন। গণিতে ফ্যাক্টোরিয়াল (একে ‘!’ দ্বারা প্রকাশ করা হয়) বলে একটি বিষয় আছে যা নির্দেশ করে একটি ঘটনাকে কতভাবে ঘটানো সম্ভব। ৩ টি সংখ্যাকে (ধরুন ৭, ৮, ৯) ৩! অর্থ্যাৎ ৩x২x১ = ৬ টি অর্ডারে সাজানো সম্ভব (৭.৮.৯, ৭.৯.৮, ৮.৭.৯, ৮.৯.৭, ৯.৭.৮, ৯.৮.৭) । এর পর আবার সাজাতে গেলে এই ৬টির কোন একটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অতএব সেই ১০ জন ছাত্রের প্রতিদিন নতুন অর্ডারে বসে খেতে গেলে ১০! = ১০x৯x৮x৭x৬x৫x৪x৩x২x১ = ৩,৬২৮,৮০০ দিন = ৯,৯৪১ বছরের কিছু বেশী সময় লাগবে! তাদের প্রতিশ্রুত সেই ফ্রি খাওয়া আর পাওয়া হবেনা কখনো। প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে ব্রায়ান গ্রিনের যুক্তিও ঠিক এটিই। আমাদের ইউনিভার্স হয় অসীম নয়তো সসীম। যদি সসীম হয়, অর্থাৎ বালুকণা, নক্ষত্র, নক্ষত্রের রং, তাদের রাসায়নিক গঠন ইত্যাদির প্রত্যেকটির সংখ্যা যদি কোথাও গিয়ে শেষ হয়, যা পরিমাপ করা যায়, তাহলে পার্মুটেশন কম্বিনেশনের যুক্তিমতে তাদের নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন অর্ডারে সাজানো সম্ভব! একজন মানুষ অসংখ্য ইলেক্ট্রন-প্রোটন-কোয়ার্ক এর সমন্বয়ে গঠিত। তার চেহারা, বর্ন, চিন্তার প্রকৃতি, কন্ঠস্বর ইত্যাদি কেমন হবে তার সবই নির্ভর করে কিভাবে তার শরীরের সাব-অ্যাটমিক পার্টিকেলগুলো একে অন্যের সাথে ক্রিয়া করছে। পৃথিবীতে ৭০০ কোটি মানুষ আছে, আমাদের সবার প্রকৃতি হয়তো এক কিন্তু তবুও আমরা প্রত্যেকেই আলাদা। কতভাবে সাব অ্যাটমিক পার্টিকেল গুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে সাজালে ৭০০ কোটি মানুষ পাওয়া যেতে পারে? যে মানুষটি দেখতে প্রায় হুবহু আমার মতো, কন্ঠস্বর আমার মতো, চিন্তা একই রকম কিন্তু তবু এক নয়, তার সাথে হয়তো আমার মাত্র কয়েক কোটি কণার বেশকম। পার্থক্য নির্ধারণকারী এই অল্প কয়েক কোটি কণা যদি আমার শরীরে ঠিক যে কম্বিনেশনে ‘বন্টিত’ হয়েছে, সেভাবে তার শরীরেও বন্টিত হত,অর্থাৎ তার আর আমার মাঝে ১টি কণারও কোন পার্থক্য না থাকতো, তাহলে আমার পুনরাবৃত্তি ঘটতো! সে মানুষটি আরেকজন আমি-ই হতাম। আমাদের ইউনিভার্স যদি সসীম সংখ্যক কণার সমন্বয়ে গঠিত হয়, তাহলে সম্ভাব্য সব ভাবে তাদের সাজানোর পর কোন এক সময় আবার তাদের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর অর্থ হয়তো ঠিক এমনই আরেকটি ইউনিভার্স খুব কাছেই কোথাও অথবা ভয়ানক দূরে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে, যেখানে এখানের ঘটনাগুলোই ঘটে চলেছে, আয়নার প্রতিফলনের মতো। টিভির শোরুমে যেমন বিভিন্ন মডেলের অনেকগুলো টিভিতে একই চ্যানেল চালিয়ে রাখে, একই ঘটনা বেশ কয়েকটা টিভিতে একই সাথে ঘটতে দেখা যায় শোরুমের কাঁচের দরজার বাইরে থেকে, অনেকগুলো প্যারালাল ইউনিভার্স যদি আমরা ‘বাইরে’ থেকে কোনভাবে দেখি, এমনটাই কি দেখবো? পুনরাবৃত্তি ব্যতিরেকে অন্য যে সম্ভাবনাময় ইউনিভার্স গুলো আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটাতেই ঐ কয়েক কোটি কণার এদিক ওদিক হয়ে যাবার কারণে আমি একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও হয়তো আমি ছ্যাঁচড়া চোর, কোথাও হয়তো রাজনীতিবিদ (‘সম্ভাবনাময়’ আমার এ দুটো সত্ত্বাই বোধ করি কণাগুলোর একই কম্বিনেশন দিয়ে পাওয়া সম্ভব!)।
মাল্টিভার্স বা অন্যান্য ইউনিভার্স গঠিত হবার ৯টি সম্ভাব্য উপায় বা মডেল আছে, অন্তত আজকের পদার্থবিজ্ঞান মতে। ব্রায়ান গ্রিন একেক অধ্যায়ে খুব গুছিয়ে ব্যখ্যা করেছেন সবগুলোই। কোথাও স্পেসটাইম একটি কম্বল বা বিছানার চাদরের মতো যেখানে একটু পর পর ফুলের নকশা প্রিন্ট করা আছে। স্পেস্টাইম বিছানার চাদরের মতো হলে (এবং অসীমভাবে বিস্তৃত হলে) ইউনিভার্স হবে নকশার সেই শোভাবর্ধনকারী ফুলগুলো। কোন মডেল বলে ইউনিভার্স হল পাঁউরুটির একটি স্লাইস। এমন অনেক গুলো স্লাইস (অর্থাৎ ইউনিভার্স) নিয়ে বড় একটি 'মেমব্রেন' বা সংক্ষেপে ‘ব্রেইন’। এই মডেল থেকেই ‘এম থিওরী’ উদ্ভাবিত হয়েছে। কোন মডেল বলে দুটি পাঁউরুটি’র স্লাইস বা দুটি ইউনিভার্স এর সংঘর্ষের ফলে নতুন ইউনিভার্স তৈরী হয়। কোন থিওরী বলে আমরা সবাই আসলে হলোগ্রাম, বাস্তব নই! আলোর সামনে আপনি হাত নাচালে দেয়ালে যে ছায়া পড়ে তা হলাম আমরা। অন্য কোথাও কেউ সুতো নাড়াচ্ছে তাই আমরা নড়ছি, আমাদের কাজগুলো আমাদের ইচ্ছেপ্রসূত নয়! প্লেটো এমনকি এই সম্ভাবনার কথাও ভেবে গেছেন। কোন মডেল বলে আমরা হলাম কম্পিউটার সিমুলেশন। খুব শক্তিশালী কোন কম্পিউটার কোথাও খুব শক্তিশালী কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে আমাদের তৈরী করেছে। আমরা সেই প্রোগ্রামার কে কোন দিন দেখতে পারবো কিনা তা নির্ভর করছে সেই প্রোগ্রামার আমাদের সেই ক্ষমতা দিয়ে প্রোগ্রাম করেছেন কিনা! এ ধরণের চিন্তা আপনাকে সৃষ্টিকর্তার দিকে নাকি প্রকৃতির দিকে ধাবিত করাবে সেটি আপনার ব্যাপার তবে উভয় ক্ষেত্রেই চিন্তাগুলো আপনাকে বিনয়ী করবে নিশ্চিত। এত বড় সৃষ্টিজগতে আমাদের সম্ভবত সরাসরি কোন ভূমিকা নেই। পিঁপড়াদের দলের কোন বিশেষ একটি দলপতির ভূমিকা আমরা কখনো আমাদের ইতিহাসের বইতে লিখে রাখিনা, কিন্তু পিঁপড়ারা কি আমাদের জীবনে কোনভাবে ভূমিকা রাখছেনা? ব্যাক্টেরিয়াদের আমরা চোখেই দেখতে পাইনা অথচ ভালো-মন্দ দুদিকেই তাদের কত অবদান আমাদের জীবনে! মহাবিশ্বেরও শেষ আছে। একদিন সব নক্ষত্রের আলো ফুরিয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে এর প্রতিটি কণাও। আমাদের এত এত কার্যকলাপ, এত গবেষণা, আবেগ, শিল্প, সাহিত্য, ভালোবাসার ইতিহাস এগুলো সবই ফুস করে একদিন হারিয়ে যাবে? কোথাও কোন রেকর্ড থাকবেনা? পিঁপড়াদের সেই দলপতির মত অবস্থা হবে আমাদের যার অস্তিত্বকে আমরা পাত্তাও দেইনি? কেন যেন মনে হয় যত ক্ষুদ্রই হই না কেন আমরা, যে বিশাল মহাবিশ্ব আমাদের তার বুকে স্থান দিয়েছে, পালন করছে, আমরা তার চোখ এড়িয়ে যাবোনা। কোথাও আমাদের ছবি ঠিকই তোলা হয়ে রইলো। ইউনিভার্স তার ব্যাক্টেরিয়াদের ঠিকঠিক গুণে গুণে রাখে! show less
ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি
হো বেবি ডল ম্যাঁয় সোনে দি
আধুনিক দর্শনের অন্যতম প্রধান একটি ঘরানা হলো Existentialism বা অস্তিত্ববাদ। সোয়েরেন কিয়ের্কেগ, ফ্রিডরিখ নীটশে, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, ফ্রাঞ্জ কাফকা, জাঁ পল সার্ত্রে, আলব্যার কামু, প্রমুখ বাঘা বাঘা সব লেখক-দার্শনিকেরা এই ঘরানার দর্শনের প্রচার করেছেন, তর্কে মেতেছেন একে অপরের সাথে অস্তিত্ববাদের প্রকৃত সংজ্ঞা নিরূপণ করতে, রচনা করেছেন দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয়া সব সাহিত্যকর্ম। বর্তমান বিশ্বের সেরা ১০০টি বইয়ের তালিকা করতে বসলে অবধারিতভাবে শীর্ষ দশের মাঝেই চলে আসবে অস্তিত্ববাদকে কেন্দ্র করে লেখা ক’টি উপন্যাস কিংবা দর্শনতত্ত্বের বই; show more নীটশে, কামু, সার্ত্রে, কাফকা, দস্তয়েভস্কি-এঁদের বইগুলোই দখল করে নেবে সেই তালিকার ওপরের সারির জায়গাগুলো। এঁদের একেকজনের অস্তিত্ববাদের ব্যাখ্যা একেক রকম, প্রকাশভঙ্গি স্বতন্ত্র, কখনো কখনো কারো সাথে কারো হয়তো মেলেওনা, তবুও, প্রত্যেকের অস্তিত্ববাদের সুরে রয়েছে ভীষণ হতাশা, নিজেকে প্রকাশ করবার আকুল এক কামনা, আছে নিজের সাথে নিজের ভীষণ এক দ্বন্দ্বের ঠোকাঠুকি। মানব মনের অলি গলি কানাপথে যাঁরা ঢুঁ মেরে বেড়াতে চান, জীবনের অর্থ যাঁরা খুঁজে ফেরেন, মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের নগণ্য অস্তিত্বের অসারতা নিয়ে যাঁরা ভাবিত হন, তাঁদের মনের দার্শনিক স্বত্ত্বাটিকে উসকে দিতে নীটশে, কামুরা অবশ্যপাঠ্যই বটে (দুঃখিত পাওলো কোলো, আপনার pseudo-দার্শনিক বুলি সংবলিত কোন লেখাই এ বিবেচনায় আসবেনা। বস্তুত, ‘তুমি অন্তর থেকে কিছু চাইলে গোটা মহাজগৎ-ই তোমার সেই চাহিদা পুরণ করতে উঠে পড়ে লেগে যায়’-কোলো’র ছেলে ভোলানো শাহরুখীয় এই দর্শনের কথা শুনলে নীটশে হয়তো একে নেহাৎ ‘দুর্বলের সান্ত্বনা’ বলে হেসেই উড়িয়ে দিতেন!)।
অস্তিত্ববাদের সঠিক সংজ্ঞা কি হওয়া উচিৎ, তা নিয়ে দার্শনিকদের মাঝে কম মতভেদ নেই, তবে প্রত্যেকেরই নিজের নিজের ভঙ্গিতে একটি বিষয়ই উঠে এসেছে, তা হলো, ব্যক্তির একান্ত নিজের ইচ্ছেগুলোকে প্রাধান্য দেয়া, চারপাশের সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মের বাইরেও যে জীবন থাকতে পারে, তার স্বীকৃতি দাবী করা। অস্তিত্ববাদ এই পৃথিবীর মায় এই গোটা মহাবিশ্বের চলতি নিয়মকে মানতে চায় না; সবকিছুর ওপরে নিজের অস্তিত্বের দাবীকে প্রতিষ্ঠা করা অস্তিত্ববাদীর মূল কথা, কারণ, অস্তিত্ববাদী বিশ্বাস করেন, সৃষ্টির গোটাটাই অর্থহীন। অর্থহীন এক জগতে অর্থহীন সমাজের অর্থহীন নিয়ম মেনে মেনে অর্থহীন এক জীবন কাটিয়ে দেয়াটা অস্তিত্ববাদীর পক্ষে সহনীয় কিছু নয়! অস্তিত্ববাদীর কাছে যেহেতু জীবনের কোন অর্থ নেই, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, তাই তাঁর কিছুতেই কিছু এসে যায়না; জীবনকে অর্থ দান করতে তাঁর সমাধান হলো নিজের নিয়মে চলো, নিজের মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত কর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি তাঁর ছাত্রদের বলতেন ‘দাগ রেখে যেতে’, অর্থাৎ কিনা মানুষের মনে জায়গা করে নিতে, নিজের স্বকীয়তার ছাপ রেখে যেতে। এটি অস্তিত্ববাদীরও মূল তত্ত্ব বটে। তবে রবি ঠাকুর কিন্তু অস্তিত্ববাদী ছিলেননা, বস্তুত, আমরা সবাই-ই কোন না কোন ক্ষেত্রে অস্তিত্ববাদী! আমরা যখন মাও-লেনিন-স্টালিন-মুজিব-হাসিনা-জিয়া-খালেদা-মুহম্মদ কি যীশুর সমালোচনা করতে বসি, আমরা আমাদের ঐ অস্তিত্ববাদী স্বত্ত্বাটিকেই বার করে আনি। আমাদের মাঝে যাঁরা তীব্র অনুভূতিশীল,সমাজবাদের নামে, ধর্মের নামে, পুঁজিবাদের নামে, গণতন্ত্রের নামে (ইত্যাদি আরো যতোসব গালভরা ‘বাদ’ আছে) মানুষ শোষণের যান্ত্রিকতায় যাঁরা ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ ও ক্রোধান্বিত হয়ে প্রায়শয়ই হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন, প্রতিবাদের মুষ্ঠি তোলেন-যা শত-হাজার বছরের সংস্কৃতিতে সমাজের কি রাজনীতির কি ধর্মের বেঁধে দেওয়া নিয়মের সংজ্ঞামতে ‘ট্যাবু’-ঐ বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে তাঁরা অস্তিত্ববাদী তো বটেনই। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের ভীষণ গোঁড়া শুধুমাত্র শ্বেত-চর্মের অভিজাত মানুষদের অধিকারে থাকা এক গ্রামে গিয়ে চোখে পড়েছিলো এক বাড়ীর সামনে টাঙ্গানো বাড়ীর মালিকের বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ছিলো ‘Obama can kiss my ass’। প্রচলিত সমাজের ভদ্রতার আনুষ্ঠানিকতাকে পাশ কাটিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটিকে নিজের পশ্চাৎদ্দেশে চুমু খাওয়ানোর এই বাসনা প্রকাশ করাটিও বাড়ীর মালিকের অস্তিত্ববাদ স্বত্ত্বাটির পরিচায়ক। এমনিতে অস্তিত্ববাদীর নিজের ইচ্ছেমতো সংজ্ঞায়িত নিয়মে চলাটাকে হয়তো আমরা সমাজবদ্ধ বেশীরভাগ সভ্য মানুষেরাই মন্দ চোখে দেখতে চাইবো। তবে, ভীষণ কুরুচিপূর্ণ এক নাচের তালে তালে ঠোঁট মিলিয়ে সানি লিওন যখন দাবী করেন পিতলের তৈরী এই দুনিয়াতে তিনি একাই স্বর্ণের তৈরী বেবি ডল, তাঁর সৌন্দর্য্যের কথা ভেবে, তাঁর পূর্বতন জীবনের মধু স্মৃতি স্মরণ করে তাঁর অস্তিত্ববাদী এই দাবীটিকে আমরা স্বীকৃতি দেইও বটে!
রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা ইতিহাসের পাতায় ঘৃণিত এক নাম। রাজ-রাজড়া মাত্রেই উৎপীড়ক, তবে ক্যালিগুলা’র কুশাসনের কীর্তিগাঁথা আজ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক কালে আর সবকিছু ছাপিয়ে ক্যালিগুলার যৌন বিকৃতির কথা বারবার উঠে আসে, খুব সম্ভব ১৯৭৯ সালের ‘ইরোটিক’ ঘরানার চলচ্চিত্রটির জন্যই। বিকৃত যৌনতার ১৭০ মিনিটের ভয়ানক এক প্রদর্শনী এই ‘ক্যালিগুলা’ চলচ্চিত্রটি। ‘ক্যালিগুলা’’র চিত্রনাট্য লিখবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো আমেরিকার বর্তমান কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক গোর ভিদাল কে। ভিদাল তাঁর মূল চিত্রনাট্যে ক্যালিগুলার বিবর্তন দেখান। দয়ালু শাসক ও নেহাৎ-ই ভালোমানুষ ক্যালিগুলা হঠাৎ ক্ষমতার প্রতি তীব্র লোভ থেকে কীভাবে পাশবিক এক চরিত্রে পরিণত হন, স্বভাবসিদ্ধ ব্যাঙ্গের মারপ্যাঁচে সে গল্প বলাই ভিদালের আসল লক্ষ্য ছিলো। তবে পরিচালক তিন্তো ব্রাস চিত্রনাট্যটিকে আমূল বদলে তাতে কমিক্যাল যৌন দৃশ্যের আমদানী করেন (‘সেক্স-কমেডী’ ঘরানায় তিন্তো ব্রাস বেশ প্রসিদ্ধ একটি নাম, নব্বইয়ের দশকে তাঁর পরিচালনায় এ ঘরানার বেশ কিছু চলচ্চিত্র বেরিয়েছিলো)। পরিচালক-চিত্রনাট্যকারের মতের অমিলের ফলে ভিদাল ‘ক্যালিগুলা’ চলচ্চিত্রটির সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন এবং এর দায়ভার নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর মাঝে ক্যালিগুলার প্রযোজক বব গুচ্চিওন আলাদা ভাবে রীতিমতো পর্ণগ্রাফিক পর্যায়ের যৌন দৃশ্য শ্যুট করে তা তিন্তোর অংশের সাথে জুড়ে দেন; গুচ্চিওনের পরিকল্পনা ছিলো পরবর্তীতে ক্যালিগুলাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি পর্ণগ্রাফিক চলচ্চিত্র বানাবেন। এবার তিন্তোও ‘ক্যালিগুলা’র সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার যান! এমন গোলমেলে নাটুকেপনা বোধহয় ক্যালিগুলার সাথেই যায়।
ক্যালিগুলা ৩ বছর ১০ মাস রাজ্যশাসনে ছিলেন, রোমের জনগণের কাছে এই পৌনে ৪টা বছর ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। বিলাস ব্যাসনে আর রাজকীয় সুরম্য সব দালান নির্মাণে ক্যালিগুলা এত মগ্ন ছিলেন, জনগণের দিকে তাকাবার অবসর তাঁর কখনো হয়নি। বলা হয়, এইসব আরাম প্রমোদের পেছনে ক্যালিগুলার ওড়ানো অর্থের পরিমাণ ছিলো ২৭০কোটি সেসটারস (Sesterce) (সে আমলের রোমান মুদ্রা); রাজ্য তখন দুর্ভিক্ষের ক্ষুধায় জর্জরিত। এসব ছাড়াও ইতিহাসের বই সাক্ষ্য দেয় ক্যালিগুলার যথেচ্ছাচার নিষ্ঠুরতার, ধর্ষকামের, আর তাঁর উন্মাদীয় পর্যায়ের ক্ষমতার লোভের। যদিও ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তবুও বাস্তবের ক্যালিগুলার ওপর ভিত্তি করে বানানো চলচ্চিত্রটি দেখলে শিউরে উঠতে হয় এমন পশুবৎ মানসিকতার পরিচয় পেয়ে। এ যেন হিটলার, স্টালিন আর কিম জং উনের এক অদ্ভুত শঙ্কর!
আলব্যার কামু তাঁর ‘ক্যালিগুলা’ নাটকে নির্মাণ করেছেন ভয়ঙ্কর অস্তিত্ববাদী এক ক্যালিগুলাকে। আপন বোন ও প্রেমিকা ড্রুসিলার মৃত্যুর পর আপাতঃ ভালো মানুষ ক্যালিগুলার হঠাৎ এক উপলব্ধি ঘটে, ‘Men die, and they are not happy’। সুখী হবার বাসনায়, অসম্ভবকে পাবার তাড়নায় ক্যালিগুলা এরপর ধীরে ধীরে এক নিরেট হৃদয়ের (নিরেট মস্তিষ্কেরও বোধ করি!) পাষাণে পরিণত হয়। ক্যালিগুলার দর্শনমতে চূড়ান্ত ক্ষমতাই হলো চূড়ান্ত সুখ। অধরা সেই সুখকে হাতের মুঠোয় বন্দী করতে মনে যা ইচ্ছে জাগে তাই করে নিষ্ঠুর ক্যালিগুলা; হোক তা প্রতিপক্ষের শিরোচ্ছেদ করে, প্রজাদের সম্পত্তি নিজের নামে বাজেয়াপ্ত করে, জোর করে বিষ খাইয়ে কিংবা রাজ্যের খাদ্যশালায় তালা লাগিয়ে দুর্ভিক্ষ তৈরী করে। নিজেকে ঈশ্বরের সিংহাসনে দেখতে চায় ক্যালিগুলা, মুখ থেকে হুকুম বেরোবার সাথে সাথেই যেন তা পালিত হয়। অদ্ভুত এক উন্মাদনায় পেয়ে বসে রোমান সম্রাটকে। জাগতিক সব রকম সুখ পাবার জন্য, মনের ইচ্ছে মেটাবার জন্য ক্যালিগুলা প্রেম-ভালোবাসা-বন্ধুত্ব্বকে অস্বীকার করে, স্ত্রী ক্যাসোনিয়াকে জানিয়ে দেয় ‘living’ টা ‘loving’ এর ঠিক বিপরীত। ইতিহাসের ক্যালিগুলা সম্রাটের আসনে বসবার কিছু পরেই তাঁর রাজ্যের পতিতালয়গুলোর ওপর কর আরোপ করেছিলেন। এ ব্যাপারটিকে কামু ব্যাঙ্গ করেছেন তাঁর রচনায়। নাটকের ক্যালিগুলা তার রাজ্যে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করবার পর পতিতালয়ের প্রবেশমূল্য বাড়িয়ে দেয়। আবার এও সমন জারী করে, যে নাগরিকেরা পতিতালয়ে সবচেয়ে বেশী টাকা ঢালবে, তাদের বিশেষ সম্মানের ব্যাজ পরিয়ে দেয়া হবে। সম্মাননার এই ব্যাজ প্রতি মাসে তালিকা ধরে ধরে বিতরণ করা হবে। এক বছরের মাঝে যদি কোন নাগরিকের একটিও ব্যাজ প্রাপ্তি না হয়, তাহলে তাকে ‘হয় নির্বাসিত নয় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে’। এ এক অদ্ভুত কমেডি; হাস্যকর, কিন্তু কি নিদারুণ! মানব চরিত্রের ওপর ঘেন্না চলে এলেই বুঝি এমন কমেডি লেখা সম্ভব হয়? মাত্র ৪৩ বছর বয়েসে নোবেল জেতা কামু’র ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত মগজের সামান্য নমুনা এটি।
তবে ‘ক্যালিগুলা’ নাটকের মর্মার্থ অন্য জায়গায়। ক্যালিগুলা এক পর্যায়ে বুঝতে পারে সুখী হবার তার এ পন্থা স্রেফ আত্নহত্যা স্বরূপ; জনগণের রোষের মুখে টেকার উপায় তার নেই, তবুও সে গোঁয়ারের মতো জেদ ধরে এগিয়ে যায় তার একান্ত নিজস্ব যুক্তির পথ ধরে। কামু’র নিজের ব্যাখ্যায় ক্যালিগুলা নাটকটি বেশিরভাগ মানুষের জীবনেরই ট্র্যাজেডী। দূর্ভাগ্যক্রমে প্রেমিকা ড্রুসিলাকে হারাবার পর ক্যালিগুলা চেয়েছিলো ভাগ্যের বিপরীতে বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়াতে, কিন্তু তা করতে গিয়ে সে অস্বীকার করে গিয়েছে গোটা মনুষ্যসমাজকেই। একদিকে ক্যালিগুলা নিজের কাছে নিজেকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলেছে বটে, কিন্তু বিপরীতে গোটা সমাজের অবিশ্বাস কুড়িয়ে নিজের ধ্বংসই ডেকে এনেছে। নাটকের শেষ দৃশ্যে ক্যালিগুলা তাই তার মৃত্যুকে মেনে নেয়, শেষ এই মুহূর্তে এসেই কেবল সে বোঝে জীবনটা আসলে একার নয়, সবাইকে গোল্লায় পাঠিয়ে একা একা বেঁচে থাকা যায়না। মানবতার কি সূক্ষ্ণ বাণী অথচ কি ভীষণ মোটা দাগে লেখা!
ক্যালিগুলা নাটকটি পড়া শেষ করলাম ঠিক যেদিন যে মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কর্তা হবার শপথ নিলেন। নাটকের ক্যালিগুলা নিজের বুক চাপড়িয়ে প্রজাদের বলে গোটা রোমান সাম্রাজ্যে এই প্রথম তারা এমন একজন সম্রাট পেলো যে কিনা তাদের মুক্তির পথে নিয়ে যেতে পারে। মানুষে মানুষে মিল থাকবেই, আমাদের রক্তে, আমাদের জিনে সেই একই তথ্য সৃষ্টির শুরু থেকে বয়ে আসছে; হাজার হাজার বছরের দূরত্বের দুটি মানুষের চিন্তাধারাটা মেরেকেটে একই রকম থাকবে, এটি খুব বিচিত্র কিছু নয়, তবুও মনের ভেতরে গভীর অন্ধকারে ‘ক্যালিগুলা’ আর ‘Make America Great Again’ এই পাঁচটি শব্দ ঘুরপাক খেতে খেতে মিশে এক হয়ে যায়। এরপর আমি আর আলাদা করতে পারিনা কে স্টালিন, কে হিটলার, কে ক্যালিগুলা আর কে ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন আমার আর কিস্যুতে কিস্যু এসে যায়না। show less
"প্রতিটি ঐশ্বর্য্যের পেছনেই রয়েছে একটি বড় অপরাধ"
-অনার দি বালজাক
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিন (আইবিএম) কর্পোরেশনের নাম শোনেননি এমন মানুষ আজকের দিনে পাওয়া দুষ্কর। আইবিএম পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান। আইবিএম এর মতো অন্য কেউই সম্ভবত পৃথিবীকে প্রযুক্তিগতভাবে এতটা সমৃদ্ধশালী করতে পারেনি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর সবচেয়ে বেশী উদ্ভাবনের প্যাটেন্টের রেকর্ড আইবিএমের দখলে ছিলো। আজকের বহুল প্রচলিত এটিএম মেশিন, হার্ড্ড্রাইভ, সিডি-ডিভিডির পূর্বসুরী ফ্লপি ডিস্ক, ইত্যাদি সবই আইবিএমের অবদান। প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ কর্মী নিয়ে বর্তমানে ১৭০টি দেশে show more কাজ করছে আইবিএম। বলা বাহুল্য, আইবিএম পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান। মানবসমাজের প্রভূত উন্নতিসাধনকারী আইবিএমের আগের ইতিহাস কিন্তু অমন মহান কিছু নয়। বরং, আধুনিক সভ্যতার বীভৎসতম হত্যাযজ্ঞটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আইবিএমের নাম। নাৎজিদের ৬ মিলিয়ন ইহুদী নিধনের প্রধানতম হাতিয়ার নির্মাতা ছিলো আইবিএম। না, কোন বিশেষ বন্দুক, পিস্তল কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র বানিয়ে দিয়ে আইবিএম নাৎজিদের সহায়তা করেনি। আইবিএম নাৎজিদের দিয়েছিলো আদমশুমারির যন্ত্র-সর্টিং মেশিন।
‘আইবিএম অ্যান্ড দি হলোকাস্ট’ বইয়ের লেখক এডুইন ব্ল্যাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফেরা দুর্লভ এক দম্পতির সন্তান। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে পালাবার সময় ব্ল্যাকের মা গুলিবিদ্ধ হন। স্বাভাবিক কারণেই নাৎজি জার্মানী’র প্রতি ব্ল্যাকের প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিলো। ‘আইবিএম অ্যান্ড দি হলোকাস্ট’ বইটি পড়তে গেলে আন্দাজ করা যায় ব্ল্যাকের ক্ষোভের পাল্লাটা কত ভারী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লাইব্রেরি ঘেঁটে প্রচুর তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে ভয়াবহ নিষ্ঠার সাথে ঘটনাগুলোকে একের পর এক সাজিয়ে ব্ল্যাক লিখেছেন সাড়ে ন’শ পৃষ্ঠার প্রায় পৌনে দু’ কেজি ওজনের বিশাল এক বই। হলোকাস্টে আইবিএম সংক্রান্ত তথ্য যেখানে যা পেয়েছেন, জুড়ে দিয়েছেন। দু’শ পাতা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নির্ঘন্টের তালিকাটা দেখলে বোঝা যায় ব্ল্যাকের নাৎজি বিরোধী ‘প্যাশন’টা কত তীব্র।
জার্মান প্রযুক্তিবিদ হারম্যান হলারিথ ১৮৭৯ সালে আমেরিকার পরিসংখ্যান ব্যুরোতে নিয়োগ পান অ্যাসিস্টেন্ট পদে। সে যুগের আদমশুমারির পরিচালনাটা ছিলো অসম্ভব সময় সাপেক্ষ ও কষ্টকর এক কাজ। সংবিধান অনুযায়ী প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর আদমশুমারি করবার নিয়ম। গৃহযুদ্ধ পরবর্তীকালীন আমেরিকার জনসংখ্যায় বিশাল পরিবর্তন আসে, আসে মানচিত্রেও। এক আদমশুমারির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হতে না হতেই দশ বছর পরের আরেক আদমশুমারির সময় চলে আসত। হারম্যান হলারিথ ১৮৯০ সালের আদমশুমারির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করবার জন্য তৈরী করেন তাঁর সর্টিং মেশিন-হলারিথ মেশিন (চিত্র)। তখনকার রেলের কনডাক্টররা টিকিটে বিশেষ ছাঁচে ফুটো করে যাত্রীর উচ্চতা, চুলের রং, নাকের আকার, বেশভূষা ইথ্যাদি তথ্যের রেকর্ড রাখতো। ঐ বিশেষ ছাঁচে ফুটো করা টিকেট দেখেই কনডাক্টররা বুঝতো যাত্রী একই টিকিট বারবার ব্যবহার করছে কি না। টিকিটের হিসেব রাখবার এ পদ্ধতি দেখেই হলারিথ উদ্ভাবন করেন তাঁর সর্টিং মেশিন। নির্দিষ্ট তথ্য সংবলিত কার্ড মেশিনে দেয়া হতো, মেশিন তার হিসেব নিকেশ করে ফুটোর ছাঁচ অনুযায়ী চাহিদা মাফিক কার্ডগুলোকে আলাদা করে রাখতো। হলারিথের এ উদ্ভাবন ১৮৯০ সালের আদমশুমারিতে মার্কিন সরকারে ৫ মিলিয়ন ডলার বাঁচিয়ে দেয়। এ মেশিন দিয়েই নাৎজিরা আদমশুমারি করে ইহুদীদের তথ্য আলাদা করে ধারণ করতো। আইবিএম নাৎজিদের কাছে এমন দু’হাজারেরও বেশী মেশিন সরবরাহ করে। নাৎজি দখলকৃত ইওরোপে করে আরো কয়েক হাজার।
আইবিএম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১১ সালে, তবে জার্মানীতে আইবিএম একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাতো, যার নাম ডয়েশ হলারিথ মেশিন্যান গেজেলশাফট বা সংক্ষেপে ডেহোম্যাগ (Deutsch Hollerith Mascinen Gesselschaft) । প্রচুর নথিপত্রের ভিত্তিতে এডুইন ব্ল্যাক দেখিয়েছেন হিটলার যুগের সূচনালগ্ন থেকেই আইবিএম ওরফে ডেহোম্যাগ ভালো করেই জানতো তারা নাৎজি সংস্থার ওপরদিকের চাঁইদের সাথে কাজ করছে, এমনকি, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও ডেহোম্যাগ অনেকটাই ওয়াকিবহাল ছিলো।
হলারিথ মেশিনের মূল ছিলো পাঞ্চিং কার্ড। ৮০টি কলামের এ কার্ডের ফুটোয় ফুটোয় রেকর্ড হয়ে যেতো ৪ কোটি জনসংখ্যার জার্মানীর প্রতিটি নাগরিকের হুলিয়া। নাৎজিদের চোখে ইহুদীরা অপরাধী-ই ছিলো বটে। হলারিথ পাঞ্চিং কার্ডে ১৬ প্রকারের অপরাধী চিহ্নিত করবার ব্যবস্থা ছিল, তৃতীয় ও চতুর্থ কলামের ফুটোর অবস্থান অনুযায়ী (৩য় ফুটোঃ “সমকামী”, ৯ম ফুটোঃ “অসামাজিক”, ১২শ ফুটোঃ “জিপসি”। ইহুদীদের জন্য বরাদ্দ ছিলো ৮ম ফুটো। ৮ নম্বর ফুটো পাঞ্চ করা কার্ড গুলো আলাদা করে নেয়া হতো ইহুদীদের সনাক্ত করবার জন্য।)
আইবিএম এর প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন ধনকুবের চার্লস ফ্লিন্ট। কোম্পানিটি তখন পরিচিত ছিলো “Computing-Recording-Tabulating Company (CTRC)” নামে। ইংরেজীতে যাকে বলে Ruthless Businessman, ফ্লিন্ট ছিলেন তাই। CTRC-এর ম্যানেজার পদে ফ্লিন্টের প্রয়োজন ছিলো তার মতোই ধূর্ত, কৌশলী, নীতিহীন আরেকজন ব্যবসাদারকে। ফ্লিন্ট নিয়োগ দেন থমাস জে ওয়াটসনকে। আইবিএম নামটি ওয়াটসনেরই দেয়া। পরবর্তী সময়ে এই ওয়াটসনই আইবিএমের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। ইহুদী সনাক্তকরণে নাৎজিদের সর্বোতভাবে সহায়তা করার সিদ্ধান্তটি ওয়াটসনের নিজের। কারণটি সম্পূর্ণই অর্থনৈতিক। নাৎজি জার্মানী ছিলো আইবিএমের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। ব্ল্যাক ওয়াটসনকে এ বইয়ে Business Scoundrel অভিহিত করেছেন। মার্কিন সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও ওয়াটসন নাৎজিদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রেখেছেন, জার্মানী গিয়েছেন বারবার। নাৎজিদের সহযোগীতার স্বীকৃতি স্বরূপ ওয়াটসন স্বয়ং হিটলারের কাছ থেকে Merit Cross of the German Eagle with Star মেডেল পান, মর্যাদার দিক থেকে যার অবস্থান সর্বোচ্চ পুরস্কার Hitler’s German Cross এর পরেই।
থমাস জে ওয়াটসন অত্যন্ত সুচতুরভাবে গোটা আইবিএমের ব্যবসা চালিয়েছেন। CTRC’র কর্মীদের ওপরও অসাধারণ প্রভাব ছিলো তাঁর। দৈনন্দিন পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেবার আগেও কর্মীরা ওয়াটসন এর অফিসঘরে ধর্ণা দিতেন। ওয়াটসনকে নিয়ে আইবিএম কর্মীদের গানও ছিলো, যাকে দেবপ্রশস্তি বলাই শ্রেয়ঃ
Mister Watson is the man we’re working for
He’s the leader of the C-T-R
He’s the fairest, squarest man we know
Sincere and true
He has shown us how to play the game
And how to make the dough
এহেন ফেয়ারেস্ট, স্কয়ারেস্ট ওয়াটসনের লিভিংরুমে বহু বছর ধরে হিটলারের একান্ত দোসর ফ্যাসিস্ট নেতা মুসৌলিনী’র অটোগ্রাফ সংবলিত ছবিও শোভা পেয়েছে।
“জার্মানীর উন্নতি সাধনে ইহুদী নিধন ছাড়া আর গতি নেই”-এই মন্ত্র হিটলার ও তার নাৎজি বাহিনী এত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো, তার নমুনা দেখে বিস্মিত হতে হয়। ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের মতোই লালন করতো। “ইহুদীরা নিকৃষ্ট”, “ইহুদীরা দূষিত রক্তের বাহক”-ইত্যাদি সব ভীষণ অবৈজ্ঞানিক অন্ধ বিশ্বাস মারাত্মকভাবে পেয়ে বসেছিলো এমনকি নাৎজি বৈজ্ঞানিক, গণিতবিদ, চিকিৎসকদেরও। ফ্রিডরিখ জান (Friedrich Zahn)-ব্যাভারিয়ান স্ট্যাটিস্টিকস অফিসের প্রেসিডেন্ট-ছিলেন নাৎজিদের ইহুদী সনাক্তকরণের আদমশুমারির অন্যতম পরিচালক। জান তাঁর “Development of German Population Statistics Through Genetic-Biological Stock-Taking” শীর্ষক প্রবন্ধে (শিরোনামটি লক্ষ্য করুন!) লিখেছেন, “জনসংখ্যীয় রাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতিগত শুদ্ধতার আদর্শে। দুর্বল, হীন একটি জাতির উত্থানের সম্ভাবনা নাকচে এ নীতির বিকল্প নেই। এই নীতির প্রয়োগ নিকৃষ্ট বংশীয় অনার্য্যদের (ইহুদী) বিস্তার রোধ করবে ও উচ্চমান সম্পন্ন আর্য্যবংশসমূহকে সুসংগঠিত করবে। অন্যার্থে, এই নীতির মূলমন্ত্র ‘সুবংশীয় রক্তধারার পালন ও অচ্ছুৎ, অযাচিত জনসংখ্যার বিনাশ’”।
আইবিএমের হলারিথ মেশিন ঘন্টায় ২৫,০০০ কার্ড বাছাই করতে পারতো। মুহূর্তমধ্যে ইহুদীদের ঠিকুজি নাৎজিদের খাতার পাতায় লেখা হয়ে যেতো। আর তারপরেই শুরু হতো তাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো। বইতে এক চেক মাতা ক্যারেল ল্যাঙ্গারের উল্লেখ আছে। নাৎজি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অত্যাচার এড়াতে সপরিবারে আত্মহত্যা করেন ক্যারেল। প্রথমে তাঁর ৪ ও ৬ বছর বয়েসী দুই সন্তানকে ১৩ তলা থেকে ছুঁড়ে ফেলেন, তারপর নিজে লাফ দিয়ে পড়েন। ক্যারেল একা নন, এমন কয়েকশ ক্যারেল আত্মাহুতি দিয়েছেন নাৎজি আতঙ্কে।
ইহুদী নিধনে নাৎজিদের অসাধারণ শৃঙ্খলার পরিচয় পেলে অবাক বনতে হয়। জার্মান মস্তিষ্কের উদ্ভাবনী ক্ষমতার-বাখ থেকে আইনস্টাইন-সুখ্যাতি দুনিয়াব্যাপী। নাৎজিরাও খুব পিছিয়ে ছিলোনা। অঙ্ক কষে, হিসেব নিকেশ করে তবেই ইহুদী নিধন শুরু হয়। ফ্রিটজ আর্ল্ট, দখলকৃত পোল্যান্ডের আদমশুমারি কার্যালয়ের প্রধান, আঁক কষে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ১.৫ মিলিয়ন ইহুদী মারলে পোল্যান্ডের ইহুদী জনসংখ্যা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১০-এ এসে দাঁড়ায়। যেকোন সমস্যার একটি সাধারণ সমাধানই ছিলো নাৎজিদের, হত্যা। ১৯৪১ সালের অক্টোবরে দখলকৃত ইয়োগোস্লাভিয়ার ৮০০০ বন্দী ইহুদীদের নিয়ে সেখানকার নাৎজি কর্তৃপক্ষ একবার বিপাকে পড়ে। তারা চেয়েছিলো এই ৮০০০ বন্দীকে ট্রেনে করে সার্বিয়া ফেলে আসতে,কিন্তু বার্লিন হেডকোয়ার্টার থেকে কোন অনুমতি আসছিলোনা। শেষ পর্যন্ত লিউটেন্যান্ট কর্নেল অ্যাডলফ আইকমানকে টেলিগ্রাম করা হয় বন্দীদের নিয়ে কি করা হবে তার ‘উপদেশ’ চেয়ে; উত্তর আসে, “Eichmann proposes shooting”-কি অনায়াস, নির্বিকার সে সমাধান! ৮০০০ বন্দীকে সার বেঁধে হাঁটু মুড়িয়ে বসিয়ে একসাথে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নাৎজি শাসনামলে ইহুদীদের ওপর চলা এমন অনেক অত্যাচারের টুকরো টুকরো বিবরণী বইয়ের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে আছে। উল্লেখ আছে ক্রোয়েশিয়ান ফ্যাসিস্ট দল 'উস্তাশি'রও। নাৎজি বাহিনীর সহায়তায় উস্তাশি দমন নিপীড়নের মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখে। এডুইন ব্ল্যাক মন্তব্য করেছেন ইহুদীদের অত্যাচার করবার জন্য উস্তাশি'র মতো 'sadistic' পন্থা আর কেউ বার করতে পারেনি। করাত, কুঠার, চাপাতি, পাথর দিয়েই হাজার হাজার ইহুদী নিধন করেছে উস্তাশি। উস্তাশির নেতারা নাকি প্রকাশ্যে গলায় ইহুদী নারী ও শিশুদের কেটে নেয়া জিভ আর উপড়ে নেয়া অক্ষিগোলক এর নেকলেস পরে ঘুরে বেড়াতো। উস্তাশি নেতা আন্তে পাভেলিচ তার বিদেশী রাষ্ট্রীয় অতিথিদের ঝুড়ি ভর্তি ইহুদী অক্ষিগোলক উপহার দিয়ে বরন করতো। ছবিতে আন্তে পাভেলিচ, হিটলারের সাথে করমর্দনরতঃ
নাৎজি কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ধাপের সাথেই হলারিথ মেশিন অবিচ্ছিন্নভাবে মিশে গিয়েছিলো। বিমান বাহিনীর প্রতিটি মিশনের রেকর্ড, প্রতিটি বৈমানিকের ব্যক্তিগত তথ্য, প্রতিটি নাৎজি বুলেটের হিসেব, কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ট্রেনের শিডিউল বন্দী সংখ্যা, মৃত্যু সংখ্যা, সব……সব হিসেব নিকেশের হাতিয়ার ছিলো ঐ হলারিথ সর্টিং মেশিন।
যে পাঞ্চিং কার্ড দিয়ে হলারিথ মেশিন তার বাছাই এর কাজ সারতো, তার আইনত একমাত্র প্রস্তুতকারক ছিলো আইবিএম। অন্য কোন কোম্পানী সে কার্ড প্রস্তুত করতে গেলেই ওয়াটসন মামলা ঠুকে বসতেন। পাঞ্চিং কার্ডের ব্যবসা আইবিএম তথা ওয়াটসনের সোনার ডিম পাড়া হাঁস। ১৯৩৯ সালে আইবিএম ডেনমার্কে বিক্রি করেছে ১৯ লক্ষ কার্ড, ফিনল্যান্ডে ১৩ লক্ষ, নরওয়েতে ৭ লক্ষ, ইয়োগোস্লাভিয়াতে ১০ লক্ষ, স্পেনে ৭ লক্ষ, হাঙ্গেরীতে আড়াই লক্ষ। এ কার্ডের সবই ব্যবহৃত হয়েছে নাৎজিদের কাজে। শুধু ১৯৪৩ সালেই হিটলারের থার্ড রাইখের কাছে আইবিএম বিক্রি করেছে ১৫ কোটি পাঞ্চিং কার্ড।
কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে মৃত্যুসংখ্যার হিসেব রাখার জন্য কিছু হলারিথ কোড ছিলো, যেমনঃ D-4: মৃত্যুদণ্ড, E-5: আত্মহত্যা, F-6: বিশেষ বিচারে মৃত্যুদণ্ড। C-3: কোড ছিলো স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য। গ্যাস চেম্বারে নিহত লাখ লাখ বন্দী, গার্ডদের স্রেফ আমোদের জন্য পিটিয়ে মেরে ফেলা বৃদ্ধটি, কাজ করতে করতে মুখে ফেনা তুলে মারা যাওয়া রুগ্ন-শীর্ণ যুবকটি….. এরা সবাই C-3: “প্রাকৃতিক কারণজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু”।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়টায় শুধু একা আইবিএম অনৈতিক ও অবৈধভাবে নাৎজিদের সাথে ব্যবসা চালিয়ে টাকা বানায়নি। এমন আরো বহু কোম্পানীই ছিলো। আজ যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প সদম্ভে ঘোষণা করেন তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে এলে সব আমেরিকান মুসলিমদের ডেটাবেজ বানাবেন, তাদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপেরও হিসেব রাখবেন, আমাকে তা হিটলারের কথা মনে করিয়ে দেয়। একই কথা বলে তো হিটলারও ক্ষমতায় এসেছিলো? আজকের আইবিএম ৮০ বছর আগের আইবিএমের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ উন্নত। আজকের পৃথিবীতে এমন প্রতিষ্ঠানও আইবিএম একা নয়। ট্রাম্পের সেই ডেটাবেজ বানাবার জন্য প্রচুর প্রতিষ্ঠান সানন্দে এগিয়ে আসবে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বানিয়ে নেবে, আর বাগিয়ে নেবে সেই মহান শিরোপা, সমস্ত সম্পদ দিয়েও যা কখনো পাওয়া যায়নাঃ Goodwill।
পুনশ্চঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরপরই হলোকাস্টের সাথে জড়িত নাৎজিদের ধরপাকড় ও বিচার শুরু হয় যা ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল নামে পরিচিত। শুনানী শেষে নাৎজিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। সে বিচারের ফুটেজ আজ পুরো বিশ্বের হাতের নাগালে। ইউটিউব ঘাঁটলেই পাওয়া যায় অ্যাডলফ আইকমানের শুনানি, বিশ্বযুদ্ধের ১৬ বছর পর যাকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে নিয়ে এসে বিচারকের সামনে দাঁড় করানো হয়। আর আমার দেশে? রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সরাসরি সম্প্রচার? বিচারের ফুটেজ? কোথায়? হা হতোম্মি! show less
জেমস হাওলেট ওরফে লোগান ওরফে উলভেরিন; তর্কসাপেক্ষে এক্স-মেন সুপারহিরো দলটির সবচেয়ে পছন্দনীয় ও আরাধ্য চরিত্র। দু হাতের মুষ্টি থেকে বেরিয়ে আসা অ্যাডামেন্টিয়াম এর চকচকে ভীষণ ধারালো নখর উলভেরিন এর প্রধান হাতিয়ার। কমিক্স প্রীতি আছে এমন কোন মানুষটি স্বপ্ন দেখেননি এমন নখরের? কল্পনায় নিজেকে দেখেননি সেই ধাতব ঝ্যাচাং শব্দে দু’হাত থেকে তিনটে তিনটে করে ছ’টা নখর বার করে পাশবিক হিংস্রতায় শত্রুকে কেটে ফালাফালা করতে? এছাড়াও উলভেরিনের অন্যতম শারীরিক বৈশিষ্ট্য ‘হিলিং ফ্যাক্টর’ তো আছেই যা যে কোন আঘাতকে মুহুর্তমধ্যে সারিয়ে ফেলতে পারে। এই হিলিং ফ্যাক্টরের জন্যই কার্যত show more উলভেরিন অমর। শতবর্শী উলভেরিন লড়াই করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। দুষ্টের দমনে আজও উলভেরিন লড়ে যাচ্ছে, এক্স-মেন দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে।
উলভেরিন জন্মগত ভাবেই ‘মিউট্যান্ট’ বা বিশেষ শক্তির অধিকারী। তবে মানুষের তৈরী গবেষণাগারেই লোগান পরিণত হয়েছে মানুষ মারার এক হিংস্র যন্ত্রে, সজ্জিত হয়েছে অ্যাডামেন্টিয়াম এর ধাতব হাঁড় কাঠামোতে, যা চরিত্রটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। কমিক্সপ্রেমীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে শুধু উলভেরিন চরিত্রটিকে কেন্দ্র করেই নিত্য নতুন চলচ্চিত্র তৈরী হচ্ছে, গ্রাফিক নভেল লেখা হচ্ছে। ২০০০ সালে ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালী পর্দায় প্রথম অভিষেকের পর গত ১৬ বছরে ৮টি চলচ্চিত্রে উলভেরিন চরিত্রটি এসেছে, হিউ জ্যাকম্যানের রুপদানের বদৌলতে এ মুহুর্তে উলভেরিন সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ৩টি সুপারহিরোর মধ্যে থাকবে। উলভেরিনের জনপ্রিয়তার এই ধারাবাহিকতায়ই ২০১৩ সালে জেসন অ্যারন ৪ ভলিউমে লিখেছেন ‘উলভেরিন দ্যা কমপ্লিট কালেকশন’। আলোচ্য ইস্যুটি এই চার ভলিউমের দ্বিতীয়টি।
‘উলভেরিন দ্যা কমপ্লিট কালেকশন ভলিউম টুতে’ স্থান পেয়েছে ৪টি সিরিজের গল্প যা বিভিন্ন অধ্যায়ে সমান্তরাল ভাবে চলেছে। এই ভলিউমে ঠাঁই পাওয়া সিরিজগুলো হলো ‘ডার্ক এক্স-মেনঃ দ্যা বিগিনিং’# ৩, ‘ডার্ক রেইন দ্যা উলভেরিন’# ১, ‘ওয়েপন এক্স’# ৬-১৬ আর ‘অল নিউ উলভেরিন সাগা’। তবে এই ভলিউমের মূল গল্প আসলে ‘ওয়েপন এক্স’ ৬-১৬, এই ১১টি পর্ব। ‘অল নিউ উলভেরিন সাগা’তে ছাড়া ছাড়া ভাবে অল্প কিছু গল্প এসেছে, বর্ণনায় কোন ছবি তেমন নেই। ‘ওয়েপন এক্স’ সিরিজের ১-৫ পর্যন্ত সংকলিত হয়েছে ভলিউম ১ এ। ভলিউম ২ এর মাঝে মাঝে ক্লিফহ্যাঙ্গার রেখে রেখে নতুন গল্প শুরু হয়েছে প্রায়ই। এই ক্লিফহ্যাঙ্গারগুলোর জাল খুলবে ৩য় ও ৪র্থ ভলিউমে গিয়ে। না কিনে পাঠক যাবে কোথায়?
মূলত লোগানের উলভেরিন হয়ে ওঠার যাত্রাই জেসন অ্যারন ধরেছেন উলভেরিনের এই ৪ ভলিউমে। এই ভলিউমে লোগানকে পাড়ি দিতে হয়েছে ভীষণ বন্ধুর পথ, লড়তে হয়েছে প্রবল প্রতিপক্ষের সাথে। ‘ওয়েপন এক্স’ গল্পের একটি বড় অংশেই উলভেরিনকে ডানউইচ স্যানাটরিয়াম নামের ভয়ানক এক মানসিক হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে, ডঃ রটওয়েলের তত্ত্বাবধানে। রটওয়েল নিজেই আসলে এই মানসিক হাসপাতালের সাবেক রোগী, বিদ্রোহ করে যে অন্য রোগীদের ক্ষেপিয়ে ডাক্তারদের মেরে হাসপাতালের দখল নিয়ে নেয়। রটওয়েলের পাগলামি চিকিৎসার অযোগ্য; মানুষের মগজ দিয়ে বুদ্ধিমান এক মেশিন বানাবার নেশায় সে বুঁদ। হাসপাতালের রোগীরাই তার এ মেশিনের মগজের উৎস। মানুষ হত্যার কাজে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন বারবার লোগানের মগজধোলাই করে তার মস্তিষ্ক থেকে স্মৃতি মুছে দিয়েছে। বারবার লোগান ব্যবহৃত হয়েছে আজ্ঞাবহ এক রোবট হিসেবে। স্মৃতিভ্রষ্ট লোগান জানেনা কে সে, কি তার পরিচয়, কোথায় সে আছে, কেন তার চারপাশের মানুষেরা এমন। লোগান শুধু জানে ডঃ রটওয়েলকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে। মাঝে মাঝে লোগানের স্বপ্নে তার আগের হিংস্র জীবনের টুকরো টুকরো রক্তাক্ত স্মৃতি ভেসে ওঠে, সেই স্বপ্ন দেখে লোগান ভয়ে কুঁকড়ে মরে, নিজের পরিচয় হারিয়ে ভীষণ দিশেহারা বোধ হয় লোগানের।
মাঝে মাঝে রক্ত দিয়ে লোগান দেয়ালে তার নাম লিখে রাখে, কে যেন এসে সে লেখাগুলো মুছেও ফেলে, লোগান মনে করতে পারেনা। হাসপাতালের ওয়ার্ডেনরা যখন মারধোর করে, লোগানের মাথার ভেতর কেউ চিৎকার করে তাকে হিংস্র হতে বলে, খুন করবার লোভ দেখায়। এমন মার খেতে খেতেই একদিন লোগানের মনে পড়ে যায় তার হাতে কি ভীষণ অস্ত্র আছে, জেগে ওঠে তার আদিম স্বত্তা। লোগান পালিয়ে আসে সাংবাদিক মেলিটা গার্নার এর কাছে, যে লোগানকে কাছছাড়া করবেনা বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মানুষের লোভের কাছে লোগান এর আগে অসংখ্যবার পরাজিত হয়েছে, যার সাথেই গাঁটছড়া বাঁধতে চেয়েছে তাকেই সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতালোভীরা তাকে ব্যবহার করেছে হত্যাযজ্ঞের কাজে। নতুন এই সম্পর্কে জড়াতে তাই যথেষ্টই দ্বিধান্বিত লোগান। কি করবে ও এখন?
লোগানের রোমান্স জীবন ক্লিফহ্যাঙ্গারে রেখে এরপর গল্প চলে গেছে ডেথলকদের কাছে। ডেথলকেরা হলো নারকীয় এক ভবিষ্যতের সময় থেকে প্রেরিত ভয়ানক সব অপরাধীদের নিয়ে বানানো সাইবর্গ বাহিনী। ভবিষ্যতের সেই সময়ের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে রক্সন নামের একটি প্রতিষ্ঠান; বর্তমানের যে সমস্ত মানুষেরা ভবিষ্যতের রক্সনের বিরোধিতা করবে তাদের এখনই নিকেশ করবার জন্য ডেথলকদের পাঠানো। নির্দেশ অনুযায়ী এক এক করে সব পথের কাঁটাকেই সরিয়ে ফেলে ডেথলক বাহিনী। এবার শেষ লক্ষ্য স্টিভ রজার্স (ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা)। এদিকে লোগানের কাছে এক রহস্যময় নারী এসে জানায় তার ‘স্বপ্নে পাওয়া অন্তর্দৃষ্টি’র কথা; অজানা কোন এক কারণে ডেথলকদের আবির্ভাব এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেকটাই জানে এই নারী, যেন কেউ এসে তাকে বলে দিয়ে যায়। একাধারসে আয়রন ম্যানের বর্ম, উলভেরিনের নখর আর স্পাইডারম্যানের জালে সজ্জিত খুন করার জন্যই প্রোগ্রামকৃত নির্মম এই সাইবর্গ বাহিনীকে কিভাবে ঠেকাবে লোগান? ডেথলকদের নির্মূলের ওপর নির্ভর করছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ; ওরা জিতে গেলে জিতে যাবে রক্সন, মানবজাতি নিমজ্জিত হবে এক গভীর অন্ধকারে, এক্স-মেন বাহিনী নির্মূল হয়ে যাবে, ডেথলক বাহিনীর হাতে মারা পড়বে স্পাইডারম্যান রুপী পিটার পার্কার, দু’হাত কাটা পড়া উলভেরিন গলে যাবে অ্যাসিডে। বর্তমান সময়ের লড়াইয়ের দৃশ্যগুলোর সাথে সাথে সমান্তরাল ভাবে ভিন্ন ফ্রেমে ভবিষ্যতের লড়াই এর দৃশ্যগুলো এসেছে; অনেকটা যে কায়দায় এক অধ্যায়ে অতীত আর পরের অধ্যায়ে বর্তমানের গল্প বলে বলে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘দূরবীন’ লিখেছেন, সেভাবেই উলভেরিন আর স্পাইডারম্যানের বাহিনীর প্রতিরোধের গল্পগুলো বর্ণিত হয়েছে। ডানউইচ স্যানাটরিয়ামের বিষণ্ণ রক্তাক্ত পরিবেশ পেরিয়ে ডেথলকদের মুখোমুখি, পাঠকের জন্য রীতিমত এক রোলার কোস্টার রাইড হয়ে থাকবে উলভেরিনের এই ভলিউম টু। সম্ভাবনাময় বিকল্প সেই ভবিষ্যতে শশ্রুমণ্ডিত হস্তবিহীন উলভেরিন আর মুখভর্তি কাঁচা পাকা দাঁড়ির আধবুড়ো স্পাইডারম্যানের মৃত্যু ভক্তদের কিছুটা মন খারাপ করাবেই!
তবে এখানেই শেষ নয়! গল্পের শেষ অধ্যায়ে আছে লোগানের প্রবল আবেগময় এক যাত্রা। সবচেয়ে আপন বন্ধু কার্ট ভাগনার (নাইটক্রলার) এর মৃত্যুতে লোগান ভেঙ্গে পড়ে ভীষণ। আজীবন স্রষ্টার ওপর অটল বিশ্বাস রাখা কার্ট যখন ঈশ্বরের ক্ষমাসুলভ দিকটি নিয়ে লোগানকে জ্ঞান দিতে বসতো, লোগান সবসময় তার বিরোধিতা করে আসতো। কার্ট লোগানকে মনে করিয়ে দিতো এমনকি হিলিং ফ্যাক্টরও লোগানকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবেনা, একসময় তারও মৃত্যু হবে, স্রষ্টার মুখোমুখি হবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখবার জন্য কার্ট বারবার উপদেশ দিয়ে গেছে লোগানকে। কার্ট তার রেখে যাওয়া উইলে লোগানকে একটি বিশেষ কাজ করবার অনুরোধ করে যায়, লোগানকে যেতে হবে ভেনিজুয়েলার ভীষণ উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এক গীর্জায়, পৌঁছে দিতে হবে ২০,০০০ ডলার দামের একটি কনসার্ট পিয়ানো। দুর্গম এই যাত্রায় লোগানকে যেতে হবে সম্পূর্ণ একা, এটাই কার্টের শেষ ইচ্ছে। লোগান কি কার্টের ঈশ্বরকে পাবে সেখানে? উলভেরিন প্রেমীদের জন্য এই রহস্যটা থাকুক এখানে!
সুপারহিরোদের কীর্তিগাঁথার গ্রাফিক নভেলগুলো অনেকসময়ই বিভিন্ন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বা ধ্রুপদী সাহিত্যের ছাঁচে লেখা হয়। জেফ লোয়েব ‘ব্যাটম্যানঃ দি লং হ্যালোউইন’ লিখেছেন কিছুটা মারিও পুজোর গডফাদারের ছাঁচে। পপ কালচারের অনুরক্ত পাঠক উলভেরিনের গল্পের বিবরণী পড়ে ইতোমধ্যেই আন্দাজ করে নিতে পারেন এই গল্পে ‘টার্মিনেটর’ চলচ্চিত্রটির ছাপ আছে। এর আগে এড ব্রুবেকার ২০০৮ সালে তাঁর ব্যাটম্যানের গ্রাফিক নভেলের নাম দিয়েছিলেন ভিক্টর হুগো’র অমর উপন্যাস ‘দ্যা ম্যান হু লাফস’-এর নামানুসারে। গ্রাফিক নভেল যেহেতু ছবি নির্ভর, এবং ইদানিংকার গ্রাফিক নভেলের ছবিগুলো রীতিমতো ‘হাই-ডেফিনিশন’, তাই গল্পের ডিটেইলিং এ গল্পকাররা অতোটা মনোযোগী হয়তো হননা; ছবির প্রাচুর্য গল্পের ফাঁক ফোঁকরগুলোকে পুষিয়েও হয়তো দেয়, তবুও, চরিত্রগত ভাবে মানুষ মাত্রেই ‘খেতে পেলে শুতে চায়’। নির্বাণ লাভ করা কোন সাধুপুরুষ যেহেতু নই, অতএব, খেদ জানাতে দোষ কি? রটওয়েলের মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে বুদ্ধিমান মেশিন বানাবার কায়দার বৈজ্ঞানিক কিছু ব্যাখ্যা দেয়া গেলে দারুণ হতো, এখনের মতো এতটা জোলো লাগতোনা। হোক না সে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যতই উদ্ভট আর অবৈজ্ঞানিক। পৃথিবী কাঁপিয়ে দেয়া ক’টা হলিউডী সাইন্স ফিকশন চলচ্চিত্র সঠিক বিজ্ঞান ব্যবহার করেছে?
গ্রাফিক নভেলের ধারণাটি আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য খুব পুরনো কিছু নয়। এখনও স্রেফ সাদা কাগজের বুকে কালো হরফে ছাপানো চিরাচরিত গল্পের প্রতিই আমাদের ঝোঁকটা বেশী, গ্রাফিকস বা ঝাঁ চকচকে ছবির মাধ্যমেও যে গল্প বলা যায় সেটি আমাদের অনেকের কাছেই একেবারেই নতুন এমনকী অজানা একটি ধারণাও বটে। পাশ্চাত্য বিশ্বে গ্রাফিক নভেলের এত ছড়াছড়ি থাকা স্বত্তেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে থাকবার অন্যতম একটি কারণ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো। গ্রাফিক নভেলের কাজ বেশ ব্যয়বহুল। প্রচুর মানুষের শ্রমে একটি গ্রাফিক নভেল তৈরী হয়। যিনি গল্প লেখেন, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি আঁকিয়ে হননা, আবার পেন্সিলে আঁকা সাদা-কালো ছবিগুলো রং করেন আরেক জন। সব মিলিয়ে এ এক দক্ষযজ্ঞ বলা চলে। একজন বাংলাদেশী ৩০০-৫০০ টাকা হলে যেখানে বিশ্বের বড় বড় লেখকদের কাজের দু চারটে নমুনা বগলদাবা করতে পারেন, এমনকি সমগ্র পর্যন্ত কিনে নিতে পারেন, উন্নত মানের একটি গ্রাফিক নভেলের খান কতক পৃষ্ঠা কেনারও চিন্তা করতে পারেননা তিনি ঐ একই দামে। মার্কিন অর্থমানে যে মূল্য লেখা রয়েছে এই বইটির পেছনে, ঢাকার কর্মজীবী শ্রেণীর বহু মানুষের এক মাসের বেতনই হয় তাতে। নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ওটা স্রেফ বড়োলোকোমি। তবে তাই বলে এই জনরাটিকে আমরা একেবারে ফ্যালনাও যেন না ভাবি। মানুষের কল্পনাশক্তির ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর গ্রাফিক নভেলগুলোও বহন করে। সুদিন একদিন আমাদেরও আসবে, আমরা কেন চোখ রাখবোনা? show less
উলভেরিন জন্মগত ভাবেই ‘মিউট্যান্ট’ বা বিশেষ শক্তির অধিকারী। তবে মানুষের তৈরী গবেষণাগারেই লোগান পরিণত হয়েছে মানুষ মারার এক হিংস্র যন্ত্রে, সজ্জিত হয়েছে অ্যাডামেন্টিয়াম এর ধাতব হাঁড় কাঠামোতে, যা চরিত্রটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। কমিক্সপ্রেমীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে শুধু উলভেরিন চরিত্রটিকে কেন্দ্র করেই নিত্য নতুন চলচ্চিত্র তৈরী হচ্ছে, গ্রাফিক নভেল লেখা হচ্ছে। ২০০০ সালে ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালী পর্দায় প্রথম অভিষেকের পর গত ১৬ বছরে ৮টি চলচ্চিত্রে উলভেরিন চরিত্রটি এসেছে, হিউ জ্যাকম্যানের রুপদানের বদৌলতে এ মুহুর্তে উলভেরিন সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ৩টি সুপারহিরোর মধ্যে থাকবে। উলভেরিনের জনপ্রিয়তার এই ধারাবাহিকতায়ই ২০১৩ সালে জেসন অ্যারন ৪ ভলিউমে লিখেছেন ‘উলভেরিন দ্যা কমপ্লিট কালেকশন’। আলোচ্য ইস্যুটি এই চার ভলিউমের দ্বিতীয়টি।
‘উলভেরিন দ্যা কমপ্লিট কালেকশন ভলিউম টুতে’ স্থান পেয়েছে ৪টি সিরিজের গল্প যা বিভিন্ন অধ্যায়ে সমান্তরাল ভাবে চলেছে। এই ভলিউমে ঠাঁই পাওয়া সিরিজগুলো হলো ‘ডার্ক এক্স-মেনঃ দ্যা বিগিনিং’# ৩, ‘ডার্ক রেইন দ্যা উলভেরিন’# ১, ‘ওয়েপন এক্স’# ৬-১৬ আর ‘অল নিউ উলভেরিন সাগা’। তবে এই ভলিউমের মূল গল্প আসলে ‘ওয়েপন এক্স’ ৬-১৬, এই ১১টি পর্ব। ‘অল নিউ উলভেরিন সাগা’তে ছাড়া ছাড়া ভাবে অল্প কিছু গল্প এসেছে, বর্ণনায় কোন ছবি তেমন নেই। ‘ওয়েপন এক্স’ সিরিজের ১-৫ পর্যন্ত সংকলিত হয়েছে ভলিউম ১ এ। ভলিউম ২ এর মাঝে মাঝে ক্লিফহ্যাঙ্গার রেখে রেখে নতুন গল্প শুরু হয়েছে প্রায়ই। এই ক্লিফহ্যাঙ্গারগুলোর জাল খুলবে ৩য় ও ৪র্থ ভলিউমে গিয়ে। না কিনে পাঠক যাবে কোথায়?
মূলত লোগানের উলভেরিন হয়ে ওঠার যাত্রাই জেসন অ্যারন ধরেছেন উলভেরিনের এই ৪ ভলিউমে। এই ভলিউমে লোগানকে পাড়ি দিতে হয়েছে ভীষণ বন্ধুর পথ, লড়তে হয়েছে প্রবল প্রতিপক্ষের সাথে। ‘ওয়েপন এক্স’ গল্পের একটি বড় অংশেই উলভেরিনকে ডানউইচ স্যানাটরিয়াম নামের ভয়ানক এক মানসিক হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে, ডঃ রটওয়েলের তত্ত্বাবধানে। রটওয়েল নিজেই আসলে এই মানসিক হাসপাতালের সাবেক রোগী, বিদ্রোহ করে যে অন্য রোগীদের ক্ষেপিয়ে ডাক্তারদের মেরে হাসপাতালের দখল নিয়ে নেয়। রটওয়েলের পাগলামি চিকিৎসার অযোগ্য; মানুষের মগজ দিয়ে বুদ্ধিমান এক মেশিন বানাবার নেশায় সে বুঁদ। হাসপাতালের রোগীরাই তার এ মেশিনের মগজের উৎস। মানুষ হত্যার কাজে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন বারবার লোগানের মগজধোলাই করে তার মস্তিষ্ক থেকে স্মৃতি মুছে দিয়েছে। বারবার লোগান ব্যবহৃত হয়েছে আজ্ঞাবহ এক রোবট হিসেবে। স্মৃতিভ্রষ্ট লোগান জানেনা কে সে, কি তার পরিচয়, কোথায় সে আছে, কেন তার চারপাশের মানুষেরা এমন। লোগান শুধু জানে ডঃ রটওয়েলকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে। মাঝে মাঝে লোগানের স্বপ্নে তার আগের হিংস্র জীবনের টুকরো টুকরো রক্তাক্ত স্মৃতি ভেসে ওঠে, সেই স্বপ্ন দেখে লোগান ভয়ে কুঁকড়ে মরে, নিজের পরিচয় হারিয়ে ভীষণ দিশেহারা বোধ হয় লোগানের।
মাঝে মাঝে রক্ত দিয়ে লোগান দেয়ালে তার নাম লিখে রাখে, কে যেন এসে সে লেখাগুলো মুছেও ফেলে, লোগান মনে করতে পারেনা। হাসপাতালের ওয়ার্ডেনরা যখন মারধোর করে, লোগানের মাথার ভেতর কেউ চিৎকার করে তাকে হিংস্র হতে বলে, খুন করবার লোভ দেখায়। এমন মার খেতে খেতেই একদিন লোগানের মনে পড়ে যায় তার হাতে কি ভীষণ অস্ত্র আছে, জেগে ওঠে তার আদিম স্বত্তা। লোগান পালিয়ে আসে সাংবাদিক মেলিটা গার্নার এর কাছে, যে লোগানকে কাছছাড়া করবেনা বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মানুষের লোভের কাছে লোগান এর আগে অসংখ্যবার পরাজিত হয়েছে, যার সাথেই গাঁটছড়া বাঁধতে চেয়েছে তাকেই সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতালোভীরা তাকে ব্যবহার করেছে হত্যাযজ্ঞের কাজে। নতুন এই সম্পর্কে জড়াতে তাই যথেষ্টই দ্বিধান্বিত লোগান। কি করবে ও এখন?
লোগানের রোমান্স জীবন ক্লিফহ্যাঙ্গারে রেখে এরপর গল্প চলে গেছে ডেথলকদের কাছে। ডেথলকেরা হলো নারকীয় এক ভবিষ্যতের সময় থেকে প্রেরিত ভয়ানক সব অপরাধীদের নিয়ে বানানো সাইবর্গ বাহিনী। ভবিষ্যতের সেই সময়ের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে রক্সন নামের একটি প্রতিষ্ঠান; বর্তমানের যে সমস্ত মানুষেরা ভবিষ্যতের রক্সনের বিরোধিতা করবে তাদের এখনই নিকেশ করবার জন্য ডেথলকদের পাঠানো। নির্দেশ অনুযায়ী এক এক করে সব পথের কাঁটাকেই সরিয়ে ফেলে ডেথলক বাহিনী। এবার শেষ লক্ষ্য স্টিভ রজার্স (ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা)। এদিকে লোগানের কাছে এক রহস্যময় নারী এসে জানায় তার ‘স্বপ্নে পাওয়া অন্তর্দৃষ্টি’র কথা; অজানা কোন এক কারণে ডেথলকদের আবির্ভাব এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেকটাই জানে এই নারী, যেন কেউ এসে তাকে বলে দিয়ে যায়। একাধারসে আয়রন ম্যানের বর্ম, উলভেরিনের নখর আর স্পাইডারম্যানের জালে সজ্জিত খুন করার জন্যই প্রোগ্রামকৃত নির্মম এই সাইবর্গ বাহিনীকে কিভাবে ঠেকাবে লোগান? ডেথলকদের নির্মূলের ওপর নির্ভর করছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ; ওরা জিতে গেলে জিতে যাবে রক্সন, মানবজাতি নিমজ্জিত হবে এক গভীর অন্ধকারে, এক্স-মেন বাহিনী নির্মূল হয়ে যাবে, ডেথলক বাহিনীর হাতে মারা পড়বে স্পাইডারম্যান রুপী পিটার পার্কার, দু’হাত কাটা পড়া উলভেরিন গলে যাবে অ্যাসিডে। বর্তমান সময়ের লড়াইয়ের দৃশ্যগুলোর সাথে সাথে সমান্তরাল ভাবে ভিন্ন ফ্রেমে ভবিষ্যতের লড়াই এর দৃশ্যগুলো এসেছে; অনেকটা যে কায়দায় এক অধ্যায়ে অতীত আর পরের অধ্যায়ে বর্তমানের গল্প বলে বলে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘দূরবীন’ লিখেছেন, সেভাবেই উলভেরিন আর স্পাইডারম্যানের বাহিনীর প্রতিরোধের গল্পগুলো বর্ণিত হয়েছে। ডানউইচ স্যানাটরিয়ামের বিষণ্ণ রক্তাক্ত পরিবেশ পেরিয়ে ডেথলকদের মুখোমুখি, পাঠকের জন্য রীতিমত এক রোলার কোস্টার রাইড হয়ে থাকবে উলভেরিনের এই ভলিউম টু। সম্ভাবনাময় বিকল্প সেই ভবিষ্যতে শশ্রুমণ্ডিত হস্তবিহীন উলভেরিন আর মুখভর্তি কাঁচা পাকা দাঁড়ির আধবুড়ো স্পাইডারম্যানের মৃত্যু ভক্তদের কিছুটা মন খারাপ করাবেই!
তবে এখানেই শেষ নয়! গল্পের শেষ অধ্যায়ে আছে লোগানের প্রবল আবেগময় এক যাত্রা। সবচেয়ে আপন বন্ধু কার্ট ভাগনার (নাইটক্রলার) এর মৃত্যুতে লোগান ভেঙ্গে পড়ে ভীষণ। আজীবন স্রষ্টার ওপর অটল বিশ্বাস রাখা কার্ট যখন ঈশ্বরের ক্ষমাসুলভ দিকটি নিয়ে লোগানকে জ্ঞান দিতে বসতো, লোগান সবসময় তার বিরোধিতা করে আসতো। কার্ট লোগানকে মনে করিয়ে দিতো এমনকি হিলিং ফ্যাক্টরও লোগানকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবেনা, একসময় তারও মৃত্যু হবে, স্রষ্টার মুখোমুখি হবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখবার জন্য কার্ট বারবার উপদেশ দিয়ে গেছে লোগানকে। কার্ট তার রেখে যাওয়া উইলে লোগানকে একটি বিশেষ কাজ করবার অনুরোধ করে যায়, লোগানকে যেতে হবে ভেনিজুয়েলার ভীষণ উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এক গীর্জায়, পৌঁছে দিতে হবে ২০,০০০ ডলার দামের একটি কনসার্ট পিয়ানো। দুর্গম এই যাত্রায় লোগানকে যেতে হবে সম্পূর্ণ একা, এটাই কার্টের শেষ ইচ্ছে। লোগান কি কার্টের ঈশ্বরকে পাবে সেখানে? উলভেরিন প্রেমীদের জন্য এই রহস্যটা থাকুক এখানে!
সুপারহিরোদের কীর্তিগাঁথার গ্রাফিক নভেলগুলো অনেকসময়ই বিভিন্ন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বা ধ্রুপদী সাহিত্যের ছাঁচে লেখা হয়। জেফ লোয়েব ‘ব্যাটম্যানঃ দি লং হ্যালোউইন’ লিখেছেন কিছুটা মারিও পুজোর গডফাদারের ছাঁচে। পপ কালচারের অনুরক্ত পাঠক উলভেরিনের গল্পের বিবরণী পড়ে ইতোমধ্যেই আন্দাজ করে নিতে পারেন এই গল্পে ‘টার্মিনেটর’ চলচ্চিত্রটির ছাপ আছে। এর আগে এড ব্রুবেকার ২০০৮ সালে তাঁর ব্যাটম্যানের গ্রাফিক নভেলের নাম দিয়েছিলেন ভিক্টর হুগো’র অমর উপন্যাস ‘দ্যা ম্যান হু লাফস’-এর নামানুসারে। গ্রাফিক নভেল যেহেতু ছবি নির্ভর, এবং ইদানিংকার গ্রাফিক নভেলের ছবিগুলো রীতিমতো ‘হাই-ডেফিনিশন’, তাই গল্পের ডিটেইলিং এ গল্পকাররা অতোটা মনোযোগী হয়তো হননা; ছবির প্রাচুর্য গল্পের ফাঁক ফোঁকরগুলোকে পুষিয়েও হয়তো দেয়, তবুও, চরিত্রগত ভাবে মানুষ মাত্রেই ‘খেতে পেলে শুতে চায়’। নির্বাণ লাভ করা কোন সাধুপুরুষ যেহেতু নই, অতএব, খেদ জানাতে দোষ কি? রটওয়েলের মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে বুদ্ধিমান মেশিন বানাবার কায়দার বৈজ্ঞানিক কিছু ব্যাখ্যা দেয়া গেলে দারুণ হতো, এখনের মতো এতটা জোলো লাগতোনা। হোক না সে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যতই উদ্ভট আর অবৈজ্ঞানিক। পৃথিবী কাঁপিয়ে দেয়া ক’টা হলিউডী সাইন্স ফিকশন চলচ্চিত্র সঠিক বিজ্ঞান ব্যবহার করেছে?
গ্রাফিক নভেলের ধারণাটি আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য খুব পুরনো কিছু নয়। এখনও স্রেফ সাদা কাগজের বুকে কালো হরফে ছাপানো চিরাচরিত গল্পের প্রতিই আমাদের ঝোঁকটা বেশী, গ্রাফিকস বা ঝাঁ চকচকে ছবির মাধ্যমেও যে গল্প বলা যায় সেটি আমাদের অনেকের কাছেই একেবারেই নতুন এমনকী অজানা একটি ধারণাও বটে। পাশ্চাত্য বিশ্বে গ্রাফিক নভেলের এত ছড়াছড়ি থাকা স্বত্তেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে থাকবার অন্যতম একটি কারণ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো। গ্রাফিক নভেলের কাজ বেশ ব্যয়বহুল। প্রচুর মানুষের শ্রমে একটি গ্রাফিক নভেল তৈরী হয়। যিনি গল্প লেখেন, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি আঁকিয়ে হননা, আবার পেন্সিলে আঁকা সাদা-কালো ছবিগুলো রং করেন আরেক জন। সব মিলিয়ে এ এক দক্ষযজ্ঞ বলা চলে। একজন বাংলাদেশী ৩০০-৫০০ টাকা হলে যেখানে বিশ্বের বড় বড় লেখকদের কাজের দু চারটে নমুনা বগলদাবা করতে পারেন, এমনকি সমগ্র পর্যন্ত কিনে নিতে পারেন, উন্নত মানের একটি গ্রাফিক নভেলের খান কতক পৃষ্ঠা কেনারও চিন্তা করতে পারেননা তিনি ঐ একই দামে। মার্কিন অর্থমানে যে মূল্য লেখা রয়েছে এই বইটির পেছনে, ঢাকার কর্মজীবী শ্রেণীর বহু মানুষের এক মাসের বেতনই হয় তাতে। নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ওটা স্রেফ বড়োলোকোমি। তবে তাই বলে এই জনরাটিকে আমরা একেবারে ফ্যালনাও যেন না ভাবি। মানুষের কল্পনাশক্তির ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর গ্রাফিক নভেলগুলোও বহন করে। সুদিন একদিন আমাদেরও আসবে, আমরা কেন চোখ রাখবোনা? show less
ইংরেজী সাহিত্য পৃথিবীকে অসামান্য কিছু গোয়েন্দা চরিত্র উপহার দিয়েছে। সেই ১৭৫ বছর আগে এডগার অ্যালান পো’র হাত ধরে এলো প্রথম আধুনিক গোয়েন্দা চরিত্র সি অগাস্তে দুপ্যাঁ (দি মার্ডারস ইন দ্যা রু মর্গ), যিনি যুক্তিবিদ্যার প্রয়োগে একের পর এক সূত্র সাজিয়ে রীতিমতো বৈজ্ঞানিক উপায়ে রহস্যের সমাধান করেন। এরও প্রায় অর্ধশত বছর পর স্যার আর্থার কোনান ডয়েল সৃষ্টি করলেন তাঁর অমর চরিত্র শার্লক হোমস, যা গোয়েন্দা সাহিত্যের মানদণ্ড হিসেবে বৈশ্বিকভাবে আজ মোটামুটি স্বীকৃত। আজ অব্দি ইংরেজী ভাষায় যত গোয়েন্দা সাহিত্য রচিত হয়েছে, উল্লেখ্যযোগ্য প্রায় প্রতিটি গোয়েন্দা চরিত্রেরই তুলনা show more হয়েছে হোমসের সাথে। বস্তুত, তুলনার এই আলোচনাটিই ক্ষেত্রবিশেষে নির্ধারণ করে দেয় আলোচ্য গোয়েন্দাটি কতটা সফল! বিবিসি’র টিভি সিরিজের কল্যাণে বইয়ের পাঠকের এই ভীষণ আকালের দিনে যাঁর শার্লক হোমসের নামই শুনবার কথা নয়, তিনিও দিব্যি গোয়েন্দাপ্রবরের অনুরক্ত হন, তাঁর অনুসরণেই অনেকটা, আশপাশের মানুষদের বুঝে ফেলার নিমিত্তে কুঞ্চিত চোখে দৃষ্টি হানেন, কথা কন। শার্লক হোমসের গল্পগুলো শুধুমাত্র হোমসের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রদর্শণীর জন্যই বিখ্যাত নয়। গোয়েন্দা কাহিনী লিখবার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়টি, সময়ের পরীক্ষায় যা আজও বেশ ভালো নম্বর পেয়ে পাশ করে যায়, তা ডয়েলের অবদান। এই ঢংয়ে গল্প বিবৃত করবেন গোয়েন্দা চরিত্রটির চেয়ে ঢের ক্ষীণবুদ্ধির কেউ একজন, যিনি নিজের সাথে গোয়েন্দাপ্রবরের বুদ্ধির হতাশাজনক পার্থক্যটি গল্পের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়ে গোয়েন্দা মশায়ের খাসা মগজটিকে বিজ্ঞাপিত করবেন (অনেকটা যেমন আমরা সিনেমায় মূল নায়কের পাশে তাঁর চেয়ে বেঁটে, কম সুদর্শন পার্শ্বনায়ককে দেখি। নাচ-গানে তিনি খুব কম অপটু নন, তবে তা নায়িকার রুচিমতো নয়, তাঁর নাচ গানে মজবেন নায়িকার চেয়ে বেঁটে, কম সুদর্শন উপনায়িকা। হাত পা চালাতেও পার্শ্বনায়ক খুব কম যান না, তবে মূল ভিলেনের সাথে কোনমতেই পেরে উঠেন না)। হোমসের সহকারী ওয়াটসন, শরদিন্দুর ব্যোমকেশের সহকারী অজিত, সত্যজিতের ফেলুদার সহকারী তোপসে, রহস্য সম্রাজ্ঞী ক্রিস্টির এরকুল পোয়ারো’র সহকারী হেস্টিংস-এঁদের জবানীতেই আমরা যাঁর যাঁর গোয়েন্দা চরিত্রের কীর্তিগাঁথা পড়েছি। সহকারীদের সাথে গোয়েন্দাদের বুদ্ধির মহাজাগতিক ফারাক দেখে আবার ভেবে বসবেন না ওয়াটসন, অজিত, তোপসে কি হেস্টিংস হওয়া আপনার-আমার কর্ম! মনে রাখবেন কুরুক্ষেত্রের ময়দানে মহাবীর অর্জুনের রত্থের সারথী হয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং।
দুপ্যাঁ, হোমসের জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় জি কে চেস্টারটন ১৯১০ সালে সৃষ্টি করলেন তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র ফাদার ব্রাউন। একেবারে যেন হোমসের উল্টোরথ এই বাদামী পাদ্রী মশায়টি। পাদ্রীর পেশাটিই বলে দেয় হোমসের মতো যথেচ্ছাচারী নন ব্রাউন। হোমসের সেই সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলী, যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভীষণ দোষের, তার কোনোটাই ব্রাউনের মাঝে পাবেননা। ব্রাউন কোকেন সেবন করেন না, তিনি অহংকারী নন, অনিয়ম করেন না, বুদ্ধির লড়াইয়ে অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না……অর্থাৎ, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের একটি খ্রিষ্টান অবতার বিশেষ। ঈশ্বর ভীরু বিশেষত ধর্ম-প্রচারক হয়েও যে ঈশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়কে বিশেষ পাত্তা না দেয়া ভীষণ বুদ্ধিমান হোমসের সমকক্ষ হওয়া যায় তা প্রমাণ করাই কি চেস্টারটনের লক্ষ্য ছিলো? বস্তুত ফাদার ব্রাউনের গল্পগুলোর মাঝে বেশ একটা anti-হোমস পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। একাহারা গড়নের ঢ্যাঙা হোমস প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে পিছু হটতেননা (হোমস শখের মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন), কখনো সখনো আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করেছেন, ব্রাউন সহিংসার সেসব পথ কখনো মাড়াননি। পাদ্রীর সাদামাটা পোশাকে ছাতা হাতে বেঁটে খাটো এক মানুষ, যাঁকে দেখে সম্ভ্রম উদ্রেকের সম্ভাবনা নিতান্তই কম, এমন একটি চরিত্র তৈরী করে চেস্টারটন হোমসকে বেশ এক হাত নিতে চেয়েছিলেন বোধ করি!
হোমস আর ফাদার ব্রাউনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা অন্য জায়গায়। হোমসের কর্মপদ্ধতি হলো deductive, যুক্তি সাজিয়ে সাজিয়ে রহস্যের সমাধান করা। অপরদিকে, ব্রাউনের পদ্ধতি হলো intuitive, অর্থাৎ কিনা, যা দেখতে হাঁসের মতো, হাঁটে-চলে হাঁসের মতো, ডাকেও হাঁসের মতো, তা হাঁস নয়তো আর কি? (ধর্মের পতাকা সুউচ্চে ধারণ করা যাঁদের প্রধান শীরঃপীড়া, তাঁদের বেশীরভাগের বক্তব্যই কি এমন?)। চেস্টারটন অবশ্য ফাদার ব্রাউনের এমন intuitive পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দীর্ঘকাল পাদ্রীর পেশার সাথে জড়িত থাকার কারণে ব্রাউনকে প্রচুর মানুষের confession শুনতে হয়েছে, ফলে মানব মনের অন্ধকার অলি-গলিগুলো নাকি তাঁর বেশ চেনা হয়ে গেছে। তাই হাঁসের মতো দেখলেই পরিচিত ছাঁচে বসিয়ে রহস্যভেদ করে নেন তিনি। জীবন যাপনের ধরণ থেকে শুরু করে কর্মপদ্ধতি পর্যন্ত হোমসের একেবারে বিপরীত চরিত্র করে চেস্টারটন ফাদার ব্রাউনকে সৃষ্টি করেছেন। কারো কারো মনে নিশ্চয়ই এসব কারণে ফাদার ব্রাউন বিশেষ রেখাপাত করেছেন, তবে ফাদার ব্রাউনের পক্ষে সবচেয়ে বড় সাফাইটা গেয়েছেন খুবই অপ্রত্যাশিত একজন মানুষঃ ইতালীয় মার্ক্স তত্ত্ববিদ আন্তনিও গ্রামসি। সংস্কার বা অনুমানের ওপর ভর করে গোয়েন্দাগিরি করবার জন্য গ্রামসি ব্রাউনের তারিফ তো করেছেনই, এও দাবী করেছেন চেস্টারটন ব্রাউনের কাছে হোমসকে নিতান্তই ‘বালখিল্য’ ও ‘দাম্ভিক’ (pretentious little boy) বানিয়ে ছেড়েছেন। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মার্ক্সপন্থী কাউকে খুব একটা সুনজরে দেখিনা (এবং দেখবার কারণও বিশেষ পাইনা!) তবে ইতালীর ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে গ্রামসির সংগ্রামের গল্পটা জানলে তাঁর প্রতি সম্মান জাগবেই। এগার বছর জেলে পঁচেছেন, শরীরে ধারণ করেছেন অমানুষিক অত্যাচার। যখন ছাড়া পান, ততদিনে দাঁত পড়ে গিয়েছে, পরিপাক্তন্ত্রের বেহাল দশা। তরল খাদ্য ছাড়া আর কিছু খেতে পারতেননা। এভাবে ধুঁকে ধুঁকেই মাত্র ৪৬ বছর বয়েসে মারা যান গ্রামসি।
হোমসের ঈশ্বর-বিশ্বাস নিয়ে ভক্তদের মাঝে আলোচনার কমতি নেই। হোমসকে মূলত অজ্ঞেয়বাদী ধরে নেয়া হয়। ‘দি নেভাল ট্রিটি’ গল্পে হোমসের একটি উক্তি হোমসের আস্তিকতা প্রমাণে প্রচুর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখানে সেটির একটি দূর্বল অনুবাদ জুড়ে দিলামঃ
অর্থাৎ, হোমস পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচার-দুষ্টের প্রবল প্রতাপ দেখে ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে ভরসা পাননা, মনেই হয়না ঈশ্বর আমাদের নিয়ে দুদণ্ডও ভাবেন, কিন্তু, একইসাথে, পৃথিবীর সৌন্দর্য্যের কথা ভেবে হোমস সম্ভবত একেবারে পাঁড় নাস্তিকও হয়ে যেতে পারছেননা! বলাবাহুল্য, ফাদার ব্রাউনের কাছে এসব ‘কাব্যিক’ সংশয়ের লেশমাত্র অস্তিত্ব নেই।
আর সব গোয়েন্দার মতো ব্রাউনেরও একজন সহকারী আছেন, ফ্ল্যামবোও (Flambeau), যিনি একসময় ইয়োরোপের সবচেয়ে ধূর্ত অপরাধী ছিলেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর ফরাসী ফ্ল্যামবোও বুদ্ধির খেলায় ফাদার ব্রাউনের কাছে হার মেনে অতীতের পাপাচারকে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্রাউনের শিষ্য হয়ে যান। খটকার ব্যাপারটা হলো ফ্ল্যামবোও’র বুদ্ধির যে নমুনা চেস্টারটন দিলেন গল্পগুলোতে (অপরাধী হিসেবেই ফ্ল্যামবোও এর বুদ্ধির বিচার হোক, ব্রাউনীয় পরশপাথরের ছোঁয়ায় তিনি যখন পার্শ্বনায়ক বনে গেলেন, তখন ডয়েলের দেখানো পথে গোয়েন্দার সহকারী হিসেবে তাঁর বুদ্ধি এমনিই কমে যাবে সেতো জানা কথা!) তাতে তাঁকে খুব জোর পাড়াতো ছ্যাঁচড়া চোর মনে হতে পারে, ইয়োরোপের সব দেশের পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়ানো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ধুরন্ধর কিছুতেই মনে হয় না। ফ্ল্যামবোও সত্যিই অতটা বুদ্ধি ধরলে সে সময়ের ইয়োরোপের পুলিশ বাহিনীগুলো তাঁদের র্যাশনে খাদ্য হিসেবে ঘাস পেতেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ হয় (সে সন্দেহ অবশ্য যখন ইন্সপেক্টর লেস্ট্রেড রহস্যের কূলকিনারা করতে না পেরে শার্লক হোমসের শরণাপন্ন হতেন তখন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডস নিয়েও হতো!)।
ধর্মকে পুঁজি করে যেহেতু ফাদার ব্রাউনের রহস্যগল্পগুলো লেখা, ধর্মের জয়গান গাইবার উদ্দেশ্যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জোর করে রহস্যের সমাধান করে দেয়া হয়েছে। স্কুলজীবনে ভীষণ প্রচলিত একটি দুষ্টু গল্পের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাকঃ
সভ্যজন মাত্রেই গল্পটির নোংরামোতে শিউরে উঠবেন, আমায় শাপ-শাপান্তও হয়তো কিছু কম করবেননা! মানছি, গল্পের সমাপ্তি আকর্ষনীয়, তবে গল্পটিতে কোন যৌক্তিকতা নেই, স্রেফ যৌন সুড়সুড়ির জন্যই জোর করে মিলিয়ে দেয়া। ফাদার ব্রাউনের গল্পের ধাঁচও এমনই। নাস্তিকের ভুল ধরিয়ে দেবার জন্য ধর্মের পথে হেঁটে ঠিক এমনই হাস্যকর ভাবে গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন। গল্প চলেছে নেহাৎ-ই সরল রেখা ধরে; উপসংহার মেলাতে প্রায়শয়ই "নাভী"তে "আঙুল" চলে গিয়েছে অনেকটা অবধারিতভাবেই।
চেস্টারটন ফাদার ব্রাউনকে নিয়ে সর্বমোট তিপ্পান্নটি ছোট গল্প লিখেছেন পাঁচটি বইয়ে। ‘দ্যা ইনোসেন্স অফ ফাদার ব্রাউন’ হলো এই পাঁচটির প্রথমটি। আমার সংগ্রহে পাঁচটি বইই আছে, একটি অখণ্ড সংস্করণ হিসেবে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ক্ল্যাসিকস থেকে প্রকাশিত এই অখণ্ড সংস্করণের ভূমিকায় ডেভিড স্টুয়ার্ট ডেভিস লিখেছেন ফাদার ব্রাউনের পরবর্তী গল্পগুলো প্রথম দিকের গল্পগুলোর মতো অত সৃজনশীল নয় এবং চেস্টারটন মূলত সেসব গল্পে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার রসে রহস্যের জিলিপী ভেজেছেন। ইনোসেন্স অফ ফাদার ব্রাউন বইটিতে সংকলিত বারোটির মাঝে প্রথম আটটি গল্প হতাশাজনকরকম বেশী সময় লাগিয়ে পড়বার পর ডেভিসের ‘অত সৃজনশীল নয়’ মতটি নিয়ে মনে মনে ঢোঁক গিলছিলাম ভীষণ। প্রথম বইয়েই এ হাল হলে পরে কি হবে? পাঠক হিসেবে হতাশা তো ছিলোই, তবে ঢোঁক গেলার কারণটা ভিন্ন। আমার যিনি আধেক ভালো-সেই বেটার হাফ’র রক্তচক্ষু এড়িয়ে তাঁর দেখিয়ে দেয়া বইগুলো উপেক্ষা করে আটশ পৃষ্ঠার ঢাউস বইটি কিনবার ফলাফল শেষতক তবে এই? সাংসারিক আর দশটা বাজার করতে গিয়ে নিয়মিতই কাবু হচ্ছি, ভরসার সেই বইও এবার লেঙ্গি মেরে দিলো। এমন misadventure হলে বিবাহিত পুরুষ মাত্রেই জানেন বিপরীত দিক হতে আক্রমণটা কিভাবে আসবে, “আমি তো আগেই জানতাম...” অর্থাৎ, সেই intuition। মহামতি ঈশপের গল্পের মতোই গোটা এ বইয়ের শেষেও একটি ‘moral’ পেলাম তবে, ফাদার ব্রাউনের intuition যদি বা উড়িয়ে দেয়া যায়, স্ত্রীরটি কভু নয়!
এ বইয়েরউল্লেখ্যযোগ্য গল্পঃ The Wrong Shape, The Sins of Prince Saradine, The Hammer of God, The Eye of Apollo, The Sign of the Broken Sword ও The Three Tools of Death show less
দুপ্যাঁ, হোমসের জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় জি কে চেস্টারটন ১৯১০ সালে সৃষ্টি করলেন তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র ফাদার ব্রাউন। একেবারে যেন হোমসের উল্টোরথ এই বাদামী পাদ্রী মশায়টি। পাদ্রীর পেশাটিই বলে দেয় হোমসের মতো যথেচ্ছাচারী নন ব্রাউন। হোমসের সেই সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলী, যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভীষণ দোষের, তার কোনোটাই ব্রাউনের মাঝে পাবেননা। ব্রাউন কোকেন সেবন করেন না, তিনি অহংকারী নন, অনিয়ম করেন না, বুদ্ধির লড়াইয়ে অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না……অর্থাৎ, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের একটি খ্রিষ্টান অবতার বিশেষ। ঈশ্বর ভীরু বিশেষত ধর্ম-প্রচারক হয়েও যে ঈশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়কে বিশেষ পাত্তা না দেয়া ভীষণ বুদ্ধিমান হোমসের সমকক্ষ হওয়া যায় তা প্রমাণ করাই কি চেস্টারটনের লক্ষ্য ছিলো? বস্তুত ফাদার ব্রাউনের গল্পগুলোর মাঝে বেশ একটা anti-হোমস পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। একাহারা গড়নের ঢ্যাঙা হোমস প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে পিছু হটতেননা (হোমস শখের মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন), কখনো সখনো আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করেছেন, ব্রাউন সহিংসার সেসব পথ কখনো মাড়াননি। পাদ্রীর সাদামাটা পোশাকে ছাতা হাতে বেঁটে খাটো এক মানুষ, যাঁকে দেখে সম্ভ্রম উদ্রেকের সম্ভাবনা নিতান্তই কম, এমন একটি চরিত্র তৈরী করে চেস্টারটন হোমসকে বেশ এক হাত নিতে চেয়েছিলেন বোধ করি!
হোমস আর ফাদার ব্রাউনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা অন্য জায়গায়। হোমসের কর্মপদ্ধতি হলো deductive, যুক্তি সাজিয়ে সাজিয়ে রহস্যের সমাধান করা। অপরদিকে, ব্রাউনের পদ্ধতি হলো intuitive, অর্থাৎ কিনা, যা দেখতে হাঁসের মতো, হাঁটে-চলে হাঁসের মতো, ডাকেও হাঁসের মতো, তা হাঁস নয়তো আর কি? (ধর্মের পতাকা সুউচ্চে ধারণ করা যাঁদের প্রধান শীরঃপীড়া, তাঁদের বেশীরভাগের বক্তব্যই কি এমন?)। চেস্টারটন অবশ্য ফাদার ব্রাউনের এমন intuitive পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দীর্ঘকাল পাদ্রীর পেশার সাথে জড়িত থাকার কারণে ব্রাউনকে প্রচুর মানুষের confession শুনতে হয়েছে, ফলে মানব মনের অন্ধকার অলি-গলিগুলো নাকি তাঁর বেশ চেনা হয়ে গেছে। তাই হাঁসের মতো দেখলেই পরিচিত ছাঁচে বসিয়ে রহস্যভেদ করে নেন তিনি। জীবন যাপনের ধরণ থেকে শুরু করে কর্মপদ্ধতি পর্যন্ত হোমসের একেবারে বিপরীত চরিত্র করে চেস্টারটন ফাদার ব্রাউনকে সৃষ্টি করেছেন। কারো কারো মনে নিশ্চয়ই এসব কারণে ফাদার ব্রাউন বিশেষ রেখাপাত করেছেন, তবে ফাদার ব্রাউনের পক্ষে সবচেয়ে বড় সাফাইটা গেয়েছেন খুবই অপ্রত্যাশিত একজন মানুষঃ ইতালীয় মার্ক্স তত্ত্ববিদ আন্তনিও গ্রামসি। সংস্কার বা অনুমানের ওপর ভর করে গোয়েন্দাগিরি করবার জন্য গ্রামসি ব্রাউনের তারিফ তো করেছেনই, এও দাবী করেছেন চেস্টারটন ব্রাউনের কাছে হোমসকে নিতান্তই ‘বালখিল্য’ ও ‘দাম্ভিক’ (pretentious little boy) বানিয়ে ছেড়েছেন। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মার্ক্সপন্থী কাউকে খুব একটা সুনজরে দেখিনা (এবং দেখবার কারণও বিশেষ পাইনা!) তবে ইতালীর ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে গ্রামসির সংগ্রামের গল্পটা জানলে তাঁর প্রতি সম্মান জাগবেই। এগার বছর জেলে পঁচেছেন, শরীরে ধারণ করেছেন অমানুষিক অত্যাচার। যখন ছাড়া পান, ততদিনে দাঁত পড়ে গিয়েছে, পরিপাক্তন্ত্রের বেহাল দশা। তরল খাদ্য ছাড়া আর কিছু খেতে পারতেননা। এভাবে ধুঁকে ধুঁকেই মাত্র ৪৬ বছর বয়েসে মারা যান গ্রামসি।
হোমসের ঈশ্বর-বিশ্বাস নিয়ে ভক্তদের মাঝে আলোচনার কমতি নেই। হোমসকে মূলত অজ্ঞেয়বাদী ধরে নেয়া হয়। ‘দি নেভাল ট্রিটি’ গল্পে হোমসের একটি উক্তি হোমসের আস্তিকতা প্রমাণে প্রচুর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখানে সেটির একটি দূর্বল অনুবাদ জুড়ে দিলামঃ
“যুক্তির প্রয়োগটা ধর্মের চেয়ে আর কোথাও বেশী লাগেনা। (ধর্মে বিশ্বাসী) যুক্তিবাদী মাত্রেই যুক্তিতক্ক দিয়ে ধর্মকে একেবারে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বানিয়ে ছাড়েন। আমার মনে হয়, বিশ্বজগতের সব প্রাণের দেখভাল করবার মহৎ ঐশ্বরিক গুণটি ফুলের সৌন্দর্য্যের কাছে এসে থমকে পড়ে। আমাদের খিদে, বাসনা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এসব কিছুই বস্তুত আমাদের অস্তিত্বের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু এই যে গোলাপের সৌন্দর্য্য, এর গন্ধ, রঙ, এগুলো হলো বাড়তি, এই অলঙ্কারের না হলেও চলতো। এই বাড়তি সৌন্দর্য্যটা আসলে (স্রষ্টার?) মহত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই বলি, ভাবনার খোরাক ফুলের কাছেও খুব কম কিছু নেই”!
অর্থাৎ, হোমস পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচার-দুষ্টের প্রবল প্রতাপ দেখে ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে ভরসা পাননা, মনেই হয়না ঈশ্বর আমাদের নিয়ে দুদণ্ডও ভাবেন, কিন্তু, একইসাথে, পৃথিবীর সৌন্দর্য্যের কথা ভেবে হোমস সম্ভবত একেবারে পাঁড় নাস্তিকও হয়ে যেতে পারছেননা! বলাবাহুল্য, ফাদার ব্রাউনের কাছে এসব ‘কাব্যিক’ সংশয়ের লেশমাত্র অস্তিত্ব নেই।
আর সব গোয়েন্দার মতো ব্রাউনেরও একজন সহকারী আছেন, ফ্ল্যামবোও (Flambeau), যিনি একসময় ইয়োরোপের সবচেয়ে ধূর্ত অপরাধী ছিলেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর ফরাসী ফ্ল্যামবোও বুদ্ধির খেলায় ফাদার ব্রাউনের কাছে হার মেনে অতীতের পাপাচারকে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্রাউনের শিষ্য হয়ে যান। খটকার ব্যাপারটা হলো ফ্ল্যামবোও’র বুদ্ধির যে নমুনা চেস্টারটন দিলেন গল্পগুলোতে (অপরাধী হিসেবেই ফ্ল্যামবোও এর বুদ্ধির বিচার হোক, ব্রাউনীয় পরশপাথরের ছোঁয়ায় তিনি যখন পার্শ্বনায়ক বনে গেলেন, তখন ডয়েলের দেখানো পথে গোয়েন্দার সহকারী হিসেবে তাঁর বুদ্ধি এমনিই কমে যাবে সেতো জানা কথা!) তাতে তাঁকে খুব জোর পাড়াতো ছ্যাঁচড়া চোর মনে হতে পারে, ইয়োরোপের সব দেশের পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়ানো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ধুরন্ধর কিছুতেই মনে হয় না। ফ্ল্যামবোও সত্যিই অতটা বুদ্ধি ধরলে সে সময়ের ইয়োরোপের পুলিশ বাহিনীগুলো তাঁদের র্যাশনে খাদ্য হিসেবে ঘাস পেতেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ হয় (সে সন্দেহ অবশ্য যখন ইন্সপেক্টর লেস্ট্রেড রহস্যের কূলকিনারা করতে না পেরে শার্লক হোমসের শরণাপন্ন হতেন তখন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডস নিয়েও হতো!)।
ধর্মকে পুঁজি করে যেহেতু ফাদার ব্রাউনের রহস্যগল্পগুলো লেখা, ধর্মের জয়গান গাইবার উদ্দেশ্যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জোর করে রহস্যের সমাধান করে দেয়া হয়েছে। স্কুলজীবনে ভীষণ প্রচলিত একটি দুষ্টু গল্পের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাকঃ
জনৈকা শিক্ষিকার অনেক রাত অব্দি ছাত্রকে প্রাইভেট পড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়ের ব্যাপারে হুঁশ হলো। অত রাতে ছাত্রকে বাড়ী চলে যেতে বলা চলেনা। তাই প্রস্তাব দিলেন তাঁর সাথে রাতটা থেকে যেতে। ছোট ছেলে, পাছে রাতে ভয় পায়, তাই শিক্ষিকা ছাত্রকে সাথে নিয়ে ঘুমোলেন। সকালে উঠে শিক্ষিকা ছাত্রকে জিজ্ঞেশ করলেন তুমি আমায় রাতে গুঁতো দিচ্ছিলে কেন? ছাত্রের উত্তর, ‘আমি নাভীতে আঙ্গুল রেখে ঘুমোতে ভালোবাসি’। শিক্ষিকা বললেন, তুমি যেটা নাভী ভাবছো ওটা আমার নাভী নয়! ‘আপনি যেটা আঙ্গুল ভাবছেন, সেটাও আমার আঙ্গুল নয়!’-ছাত্রের উত্তর।
সভ্যজন মাত্রেই গল্পটির নোংরামোতে শিউরে উঠবেন, আমায় শাপ-শাপান্তও হয়তো কিছু কম করবেননা! মানছি, গল্পের সমাপ্তি আকর্ষনীয়, তবে গল্পটিতে কোন যৌক্তিকতা নেই, স্রেফ যৌন সুড়সুড়ির জন্যই জোর করে মিলিয়ে দেয়া। ফাদার ব্রাউনের গল্পের ধাঁচও এমনই। নাস্তিকের ভুল ধরিয়ে দেবার জন্য ধর্মের পথে হেঁটে ঠিক এমনই হাস্যকর ভাবে গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন। গল্প চলেছে নেহাৎ-ই সরল রেখা ধরে; উপসংহার মেলাতে প্রায়শয়ই "নাভী"তে "আঙুল" চলে গিয়েছে অনেকটা অবধারিতভাবেই।
চেস্টারটন ফাদার ব্রাউনকে নিয়ে সর্বমোট তিপ্পান্নটি ছোট গল্প লিখেছেন পাঁচটি বইয়ে। ‘দ্যা ইনোসেন্স অফ ফাদার ব্রাউন’ হলো এই পাঁচটির প্রথমটি। আমার সংগ্রহে পাঁচটি বইই আছে, একটি অখণ্ড সংস্করণ হিসেবে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ক্ল্যাসিকস থেকে প্রকাশিত এই অখণ্ড সংস্করণের ভূমিকায় ডেভিড স্টুয়ার্ট ডেভিস লিখেছেন ফাদার ব্রাউনের পরবর্তী গল্পগুলো প্রথম দিকের গল্পগুলোর মতো অত সৃজনশীল নয় এবং চেস্টারটন মূলত সেসব গল্পে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার রসে রহস্যের জিলিপী ভেজেছেন। ইনোসেন্স অফ ফাদার ব্রাউন বইটিতে সংকলিত বারোটির মাঝে প্রথম আটটি গল্প হতাশাজনকরকম বেশী সময় লাগিয়ে পড়বার পর ডেভিসের ‘অত সৃজনশীল নয়’ মতটি নিয়ে মনে মনে ঢোঁক গিলছিলাম ভীষণ। প্রথম বইয়েই এ হাল হলে পরে কি হবে? পাঠক হিসেবে হতাশা তো ছিলোই, তবে ঢোঁক গেলার কারণটা ভিন্ন। আমার যিনি আধেক ভালো-সেই বেটার হাফ’র রক্তচক্ষু এড়িয়ে তাঁর দেখিয়ে দেয়া বইগুলো উপেক্ষা করে আটশ পৃষ্ঠার ঢাউস বইটি কিনবার ফলাফল শেষতক তবে এই? সাংসারিক আর দশটা বাজার করতে গিয়ে নিয়মিতই কাবু হচ্ছি, ভরসার সেই বইও এবার লেঙ্গি মেরে দিলো। এমন misadventure হলে বিবাহিত পুরুষ মাত্রেই জানেন বিপরীত দিক হতে আক্রমণটা কিভাবে আসবে, “আমি তো আগেই জানতাম...” অর্থাৎ, সেই intuition। মহামতি ঈশপের গল্পের মতোই গোটা এ বইয়ের শেষেও একটি ‘moral’ পেলাম তবে, ফাদার ব্রাউনের intuition যদি বা উড়িয়ে দেয়া যায়, স্ত্রীরটি কভু নয়!
এ বইয়েরউল্লেখ্যযোগ্য গল্পঃ The Wrong Shape, The Sins of Prince Saradine, The Hammer of God, The Eye of Apollo, The Sign of the Broken Sword ও The Three Tools of Death show less
Nocturnes are short musical compositions that are meant to praise the beauty of the night. Most of the famous nocturnes were written in the romance era of classical music. Frédéric Chopin and Claude Debussy are my personal favorite nocturne composers. Now, I do not dare much to claim myself to be a classical music geek but yes, I am one of those fortunate people on earth who are tremendously touched by the beauty of it. My addiction towards classical music often forced me to rummage through the internet for getting more and more and more. Literature and music, according to my belief, complements each other. They are just identical twins who keep morphing into one another. Having said so, never did it occur to me that short stories could be compared with nocturnes, literally! And Kazuo Ishiguro introduced me with this crazy idea in this book. Like musical ones, Ishiguro's nocturnes are short, sweet, appealingly beautiful and of course 'melodic'. Indeed, when I picked up the book in my hand for the first time, it baffled me with its name. After reading it, I now know Ishiguro truly composed 5 nocturnes!
Japanese born Kazuo Ishiguro was brought to England at a very little age. That probably explains how he got this typical British sense of humor. His brilliant observations and portraits of the comedic scenes often reminded me of William Somerset Maugham! Not as wordy as Maugham, okay, but witty. All the five stories are written from a musician's (or maybe five musicians) show more perspective and his (or their) wit is quite sardonic too. I particularly liked 'Come Rain or Come Shine', 'Nocturne' and 'Cellists'. There's this belief goes by that one doesn't necessarily have to write poems to be a poet! It's just a matter of having a poetic mind. The final story of the collection, 'Cellists' reflects this idea. There's a very good chance that you won't want to buy this belief but then again, what does a film director do? A good director just knows which piece fits best where. Definitely it's a very argumentative issue but hey, I am only extolling Ishiguro! I literally laughed out loud while reading 'Come Rain or Come Shine', named after the famous song performed by even famous artist Ray Charles. After writing all these words about this book, now if I don't mention the short story 'Nocturne', it would be simply a crime! This story is weird, funny and strangely sad. Short yet dark, just like nightfall. 'Nocturne' is probably too literally a nocturne!
A Japanese brain and an English humor, what else do you need to see in a writer? It's a fast read and it's strange too. Not that everyone would appreciate it equally but if you're into music, specially classical ones, you might want to check this out. show less
Japanese born Kazuo Ishiguro was brought to England at a very little age. That probably explains how he got this typical British sense of humor. His brilliant observations and portraits of the comedic scenes often reminded me of William Somerset Maugham! Not as wordy as Maugham, okay, but witty. All the five stories are written from a musician's (or maybe five musicians) show more perspective and his (or their) wit is quite sardonic too. I particularly liked 'Come Rain or Come Shine', 'Nocturne' and 'Cellists'. There's this belief goes by that one doesn't necessarily have to write poems to be a poet! It's just a matter of having a poetic mind. The final story of the collection, 'Cellists' reflects this idea. There's a very good chance that you won't want to buy this belief but then again, what does a film director do? A good director just knows which piece fits best where. Definitely it's a very argumentative issue but hey, I am only extolling Ishiguro! I literally laughed out loud while reading 'Come Rain or Come Shine', named after the famous song performed by even famous artist Ray Charles. After writing all these words about this book, now if I don't mention the short story 'Nocturne', it would be simply a crime! This story is weird, funny and strangely sad. Short yet dark, just like nightfall. 'Nocturne' is probably too literally a nocturne!
A Japanese brain and an English humor, what else do you need to see in a writer? It's a fast read and it's strange too. Not that everyone would appreciate it equally but if you're into music, specially classical ones, you might want to check this out. show less
সুবোধ ঘোষ এর ৫১ টি ছোট গল্পের সংকলন ‘গল্পসমগ্র ২’। এ জাতীয় সমগ্র নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছুটা বিপাকেই পড়তে হয়; অর্ধশতাধিক গল্পের স্মৃতি সচরাচর মনে খুব বেশী সময় আটকে থাকেনা। সূচীপত্র দেখে গল্পের নাম পড়লে তবেই গল্পের প্লট মনে পড়ে। সপ্তাহ কয়েক পরে নিশ্চয়ই এটুকুও মনে করতে পারবোনা, তখন হয়তো গল্পের শুরুর আর শেষের কয়েক চরণ পড়ে মনে করতে হবে “ও হ্যাঁ, গল্পটা ছিলো এই…”। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্প মনে রাখা বেশী কঠিন। উপন্যাসে চরিত্রগুলোর বারবার উল্লেখ ঘটে তাই তাদের ভোলা যায়না। ছোটগল্পের স্বল্প ব্যাপ্তীতে ঘটনার ঘনঘটায় চরিত্রগুলো মন থেকে হারিয়ে যায় show more বেশীর ভাগ সময়; আর কাহিনী, সে তো দূর অস্ত! এই বইটিতে সংগৃহীত সুবোধ ঘোষের গল্পগুলোও নিশ্চয় তার খুব ব্যতিক্রম কিছু নয়। কিন্তু তবু মানের দিক থেকে এই গল্পগুলো অনেকটাই ব্যতিক্রম। এক সংকলনে গ্রন্থিত এত বিপুল সংখ্যক দারুণ মানের গল্প বেশ একটু দূর্লভ-ই বটে! এ যেন অনেকটা ভালো সব ছাত্রদের (ছাত্রীদের হতেও দোষ নেই!) নিয়ে বানানো এক ক্লাসরুম। কেউ হয়তো ৯০ পায়, কেউ তার চেয়ে ঢের কম, কিন্তু নূন্যতম ৬০ মার্ক পেয়ে সবাই-ই পাশ করে!
সুবোধ ঘোষের (১৯০৯-১৯৮০) গল্পে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন আছে বেশ স্পষ্টভাবে। তাই তাঁর গল্পের আলোচনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছুটা টানাহেঁচড়া করা সম্ভবত প্রাসঙ্গিক-ই! বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার জীবন সুবোধ ঘোষের। জীবিকার জন্য টিউশনিকে বেছে নিয়েছিলেন প্রথম জীবনে। এরপর বাস কন্ডাক্টরী করেছেন, ট্রাক চালিয়েছেন, সার্কাস পার্টিতে কাজ করেছেন, এমনকি বোম্বাই মিউনিসিপ্যালিটি তে ঝাড়ুদারিও করেছেন কিছুদিন। পূর্ব আফ্রিকাতে গিয়েছেন মহামারীর টিকাদানের জন্য। এই মানুষই আবার পরবর্তী জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হয়েছেন। শ্রমজীবী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দীর্ঘদিন এ পেশাগুলোর মধ্য দিয়ে, সে জন্যই হয়তো এই সমাজটি প্রায়শয়ই তাঁর গল্পের মূল উপজীব্য হিসেবে উঠে এসেছে। গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা, স্যাটায়ার, মার খাওয়া মানুষ, কামনা, প্রেমের সফল-ব্যর্থ রূপ ইত্যাদি বিষয় কে কেন্দ্র করে, তবে সবকিছু ছাপিয়ে মানব চরিত্রের কাটাছেঁড়াই মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। চাবুকের বাড়ির অত্যাচার যাঁকে হজম করতে হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তিনিই সবচেয়ে ভালো অনুভব করতে পারেন। বাস কন্ডাক্টর ঠিক ঠিক জানে কি কি অজুহাতে শার্ট প্যান্ট পরা আপাত ভদ্রবেশী লোকটি দশটা টাকা ভাড়া কম দেবে। ধর্ষিত যিনি হন, তাঁর জীবন উপলব্ধি ধর্ষকের জীবন দর্শনের চেয়ে শতগুণে উন্নত। দুর্বল গাঁথুনির বহুতল ভবনের নড়বড়ে কাঠামো নিচতলা থেকেই ভালো দেখতে পাওয়া যায়, ওপর তলা থেকে নয়। সমাজের চোখে ভীষণ নিচু সব পেশায় কাজ করে মানব চরিত্রের কদর্য দিকগুলো চিনে ফেলবেন সুবোধ ঘোষ, এ আর বিচিত্র কী!
সুবোধ ঘোষের জনপ্রিয়তা বিগত দশকগুলোর চেয়ে বর্তমানে অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। দুটি মুখ্য কারণ হতে পারে তাঁর ভাষার ব্যবহার ও সময়ের পরিবর্তন। ইংরেজী ভাষার বহুল চর্চার ফাঁদে বাংলাদেশে বর্তমানে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে, পড়তে ও লিখতে পারাটা রীতিমত ন্যাক্কারজনক রকম গেঁয়ো একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজী টানে বাংলা ও হিন্দী টানে ইংরেজী বলাটাই বরং অধিক গ্রহণযোগ্য। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পড়া শিশুটি যতবার বাংলায় একটি সম্পূর্ণ কথোপকথন চালাতে ব্যর্থ হয়, শিশুটির বাবা-মা’র আনন্দ জ্যামিতিক হারে তত বেড়ে যায়। এ আনন্দ আভিজাত্যের সাদা জামায় লেগে থাকা পানের ছোপের মত নোংরা বাঙ্গালী পরিচয়টাকে ইংরেজীর ডিটারজেন্ট দিয়ে মুছে ফেলার আনন্দ। সন্তানের হাতে সুবোধ ঘোষদের মত অলংকারময় ভাষার লেখকদের বাংলা বই এর চেয়ে ইংরেজী বই তুলে দিতেই পিতা-মাতাদের আগ্রহ বেশী (সে ইংরেজী বইও মহান কোন সাহিত্য নয়, যা পড়ে বড় ইংরেজী বিশারদ হয়ে যাবে আদরের সন্তানটি। পৃথিবীটাই বোধহয় এমন। প্রতি পাতায় গড়ে ৪ বার ‘ফাক’ লেখা ও কথায় কথায় ‘প্যান্টি’ নামিয়ে ফেলা নায়িকাদের স্রষ্টা লেখনী প্রতিভার ছিটেফোঁটাহীন হ্যারল্ড রবিন্স তার যৌনতার বন্যায় ভাসানো বইগুলোর ৭৫০ মিলিয়ন কপি বেচেন, আর ফ্রাঞ্জ কাফকা, অ্যালান পো’রা কপর্দকশূন্য অবস্থায় মারা যান)। তুলনামূলক উন্নত অঞ্চল বলেই হয়তো ইংরেজীর এ হাওয়া কলকাতার বাঙ্গালী পরিবার গুলোতে আরো অনেক আগেই বয়ে গেছে। কমে গেছে দু'দেশের বাংলা পাঠক। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দু'বাংলাতেই ছবি বানাবার সবচেয়ে সহজ ও লাভজনক প্লট হলো জমিদারপুত্র-শ্রমিককন্যা কিংবা গার্মেন্টস মালিকের মেয়ে-চানাচুর ওয়ালার ছেলে ইত্যাদি শ্রেণী-বিভাজন জনিত প্রেম। গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে এই একটি প্লট পরিচালক-প্রযোজকদের অন্ন যুগিয়ে আসছে, এবং সম্ভবত আরো দু-এক দশক যুগিয়েও যাবে। ধনী সমাজ যেচে গরীব সমাজের সাথে প্রেম করতে যাবে, ইতিহাস এমন দুরাশা করতে সাহস দেয়না। এমন অলীক প্রেমের গল্প শুধুমাত্র শ্রমিক-মিস্ত্রী-ঠেলাওয়ালা ঘরানার মানুষদের উদ্দেশ্য করেই বানানো। সুবোধ ঘোষের একাধিক গল্পে ‘ধনী-গরীবের প্রেমের জয়’-এ বিষয়টি আসায় গত কয়েক দশকের একইরকম প্রেমের ছবি দেখে চোখ পাকিয়ে ফেলা বর্তমানের পাঠক হয়তো কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। হয়তো লেখকের পেশাগত জীবনকেও এ ধরণের গল্প উদ্ভাবনের কারণ হিসেবে দেখতে পারেন!
ছোট জামাকাপড়ে সজ্জিত নায়িকাদের কোমর দোলানো নাচের মুদ্রার অংশ হিসেবে পা তুলে এক পলক অন্তর্বাস প্রদর্শনের মাধ্যমে ধনী গরীবের প্রেমের চর্বিত চর্বণ ক্লিশে হয়ে যাওয়া গল্পগুলোই হিন্দী সিনেমা আকারে যাঁদের কাছে হালাল হয়ে যায়, তাঁদের জ্ঞাতার্থে নিবেদন, ‘ম্যায় প্রেম কি দিওয়ানা হুঁ’ ছবিটি সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনেই নির্মিত। show less
সুবোধ ঘোষের (১৯০৯-১৯৮০) গল্পে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন আছে বেশ স্পষ্টভাবে। তাই তাঁর গল্পের আলোচনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছুটা টানাহেঁচড়া করা সম্ভবত প্রাসঙ্গিক-ই! বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার জীবন সুবোধ ঘোষের। জীবিকার জন্য টিউশনিকে বেছে নিয়েছিলেন প্রথম জীবনে। এরপর বাস কন্ডাক্টরী করেছেন, ট্রাক চালিয়েছেন, সার্কাস পার্টিতে কাজ করেছেন, এমনকি বোম্বাই মিউনিসিপ্যালিটি তে ঝাড়ুদারিও করেছেন কিছুদিন। পূর্ব আফ্রিকাতে গিয়েছেন মহামারীর টিকাদানের জন্য। এই মানুষই আবার পরবর্তী জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হয়েছেন। শ্রমজীবী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দীর্ঘদিন এ পেশাগুলোর মধ্য দিয়ে, সে জন্যই হয়তো এই সমাজটি প্রায়শয়ই তাঁর গল্পের মূল উপজীব্য হিসেবে উঠে এসেছে। গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা, স্যাটায়ার, মার খাওয়া মানুষ, কামনা, প্রেমের সফল-ব্যর্থ রূপ ইত্যাদি বিষয় কে কেন্দ্র করে, তবে সবকিছু ছাপিয়ে মানব চরিত্রের কাটাছেঁড়াই মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। চাবুকের বাড়ির অত্যাচার যাঁকে হজম করতে হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তিনিই সবচেয়ে ভালো অনুভব করতে পারেন। বাস কন্ডাক্টর ঠিক ঠিক জানে কি কি অজুহাতে শার্ট প্যান্ট পরা আপাত ভদ্রবেশী লোকটি দশটা টাকা ভাড়া কম দেবে। ধর্ষিত যিনি হন, তাঁর জীবন উপলব্ধি ধর্ষকের জীবন দর্শনের চেয়ে শতগুণে উন্নত। দুর্বল গাঁথুনির বহুতল ভবনের নড়বড়ে কাঠামো নিচতলা থেকেই ভালো দেখতে পাওয়া যায়, ওপর তলা থেকে নয়। সমাজের চোখে ভীষণ নিচু সব পেশায় কাজ করে মানব চরিত্রের কদর্য দিকগুলো চিনে ফেলবেন সুবোধ ঘোষ, এ আর বিচিত্র কী!
সুবোধ ঘোষের জনপ্রিয়তা বিগত দশকগুলোর চেয়ে বর্তমানে অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। দুটি মুখ্য কারণ হতে পারে তাঁর ভাষার ব্যবহার ও সময়ের পরিবর্তন। ইংরেজী ভাষার বহুল চর্চার ফাঁদে বাংলাদেশে বর্তমানে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে, পড়তে ও লিখতে পারাটা রীতিমত ন্যাক্কারজনক রকম গেঁয়ো একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজী টানে বাংলা ও হিন্দী টানে ইংরেজী বলাটাই বরং অধিক গ্রহণযোগ্য। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পড়া শিশুটি যতবার বাংলায় একটি সম্পূর্ণ কথোপকথন চালাতে ব্যর্থ হয়, শিশুটির বাবা-মা’র আনন্দ জ্যামিতিক হারে তত বেড়ে যায়। এ আনন্দ আভিজাত্যের সাদা জামায় লেগে থাকা পানের ছোপের মত নোংরা বাঙ্গালী পরিচয়টাকে ইংরেজীর ডিটারজেন্ট দিয়ে মুছে ফেলার আনন্দ। সন্তানের হাতে সুবোধ ঘোষদের মত অলংকারময় ভাষার লেখকদের বাংলা বই এর চেয়ে ইংরেজী বই তুলে দিতেই পিতা-মাতাদের আগ্রহ বেশী (সে ইংরেজী বইও মহান কোন সাহিত্য নয়, যা পড়ে বড় ইংরেজী বিশারদ হয়ে যাবে আদরের সন্তানটি। পৃথিবীটাই বোধহয় এমন। প্রতি পাতায় গড়ে ৪ বার ‘ফাক’ লেখা ও কথায় কথায় ‘প্যান্টি’ নামিয়ে ফেলা নায়িকাদের স্রষ্টা লেখনী প্রতিভার ছিটেফোঁটাহীন হ্যারল্ড রবিন্স তার যৌনতার বন্যায় ভাসানো বইগুলোর ৭৫০ মিলিয়ন কপি বেচেন, আর ফ্রাঞ্জ কাফকা, অ্যালান পো’রা কপর্দকশূন্য অবস্থায় মারা যান)। তুলনামূলক উন্নত অঞ্চল বলেই হয়তো ইংরেজীর এ হাওয়া কলকাতার বাঙ্গালী পরিবার গুলোতে আরো অনেক আগেই বয়ে গেছে। কমে গেছে দু'দেশের বাংলা পাঠক। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দু'বাংলাতেই ছবি বানাবার সবচেয়ে সহজ ও লাভজনক প্লট হলো জমিদারপুত্র-শ্রমিককন্যা কিংবা গার্মেন্টস মালিকের মেয়ে-চানাচুর ওয়ালার ছেলে ইত্যাদি শ্রেণী-বিভাজন জনিত প্রেম। গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে এই একটি প্লট পরিচালক-প্রযোজকদের অন্ন যুগিয়ে আসছে, এবং সম্ভবত আরো দু-এক দশক যুগিয়েও যাবে। ধনী সমাজ যেচে গরীব সমাজের সাথে প্রেম করতে যাবে, ইতিহাস এমন দুরাশা করতে সাহস দেয়না। এমন অলীক প্রেমের গল্প শুধুমাত্র শ্রমিক-মিস্ত্রী-ঠেলাওয়ালা ঘরানার মানুষদের উদ্দেশ্য করেই বানানো। সুবোধ ঘোষের একাধিক গল্পে ‘ধনী-গরীবের প্রেমের জয়’-এ বিষয়টি আসায় গত কয়েক দশকের একইরকম প্রেমের ছবি দেখে চোখ পাকিয়ে ফেলা বর্তমানের পাঠক হয়তো কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। হয়তো লেখকের পেশাগত জীবনকেও এ ধরণের গল্প উদ্ভাবনের কারণ হিসেবে দেখতে পারেন!
ছোট জামাকাপড়ে সজ্জিত নায়িকাদের কোমর দোলানো নাচের মুদ্রার অংশ হিসেবে পা তুলে এক পলক অন্তর্বাস প্রদর্শনের মাধ্যমে ধনী গরীবের প্রেমের চর্বিত চর্বণ ক্লিশে হয়ে যাওয়া গল্পগুলোই হিন্দী সিনেমা আকারে যাঁদের কাছে হালাল হয়ে যায়, তাঁদের জ্ঞাতার্থে নিবেদন, ‘ম্যায় প্রেম কি দিওয়ানা হুঁ’ ছবিটি সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনেই নির্মিত। show less
Cosmos by Carl Sagan
সে অনেককাল আগের কথা; ৩-৪ হাজার বছরের কম হবেনা। প্রাচীন গ্রীকরা তখন Chaos কে আদি পিতা মানতো। আজকের আধুনিক ইংরেজী অভিধানে ঢুকে পড়া Chaos শব্দটি বর্তমানে ব্যবহৃত হয় ‘বিশৃঙ্খলা’ অর্থে। তবে, শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থের কিন্তু খুব একটা হেরফের হয়নি এই গত কয়েক হাজার বছরেও। প্রাচীন সেই গ্রীক বিশ্বাসমতে Chaos দেবতাটি ছিলেন সম্পূর্ণ আকার-অবয়ব বিহীন এবং আদিতে যেহেতু Chaos ছাড়া আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিলোনা, তাই সৃষ্টিজগতের পুরোটাই ছিলো অবিন্যস্ত, ভীষণ এলোমেলো, আধুনিক সময়ে যাকে আমরা বলি ‘Chaotic’! এরপর Chaos সৃষ্টি করলেন দেবী Night কে। Chaos ও Night এর মিলনে জন্ম নিলো দুটি জাতিঃ মানুষ আর দেবতা। ক্রমে show more দেবতারা তাঁদের খামখেয়ালী আচরণে মানবজাতিকে বাঁদর নাচ নাচানো শুরু করলেন। দেবতার ইচ্ছেতেই সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়, ঋতুর পরিবর্তন, গাছের বেড়ে ওঠা। সে যুগের মানুষের কাছে চন্দ্র-সূর্যের গ্রহণ, দিন-রাতের ছোট বড় হয়ে যাওয়া, আবহাওয়ার হঠাৎ বদলে যাওয়া, এসব কিছুরই কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছিলোনা; সবই দেবতাদের মনের খেয়াল। এ বিশ্বাস লালন করেই মানবসমাজ দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছিলো শতাব্দীর পর শতাব্দী। কিন্তু বাধ সেধে বসলো আয়োনিয়া’র (বর্তমান তুরস্ক) কতিপয় গ্রীক অধিবাসী। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সালে এই আয়োনিয়ানরা দাবী করে বসলো সৃষ্টিজগৎ আসলে যথেষ্টই সুবিন্যস্ত। এর ব্যাখ্যা আছে! চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র-ঋতু-আবহাওয়া-মায় গোটা প্রকৃতি-ই আসলে নিয়ম মেনে চলে, হঠাৎ এমনি এমনি কিছুই হয়ে যায়না। প্রাকৃতিক এ পরিবর্তনগুলোর পেছনে নেই কোন দেবতার কলকাঠি নাড়ানো কিংবা জাদুকাঠি ছোঁয়ানো, আছে রীতিমতো জটিল সব গাণিতিক হিসেব নিকেশ। রোগ বালাই এর পেছনেও নেই দেবতার অভিশাপ। শত শত বছরের প্রচলিত বিশ্বাসকে টলিয়ে দিয়ে আয়োনিয়ান গ্রীকরা উদ্ভাবন করলো নতুন এক শব্দেরঃ Cosmos, কার্যত যা Chaos এর বিপরীত। নিয়মের একান্ত বাধ্যগত হয়ে থাকা এক মহাবিশ্বকে বোঝাতেই Cosmos শব্দের উদ্ভাবন।
১৯৮০ সালে জ্যোতির্পদার্থবিদ কার্ল সাগান একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরী করেন Cosmos: A Personal Voyage নামে, উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়া, চিন্তার সুতো ধরিয়ে দেয়া। ১৩ পর্বের এই অনুষ্ঠানটিই পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করেন সাগান। ১৩টি অধ্যায়ে সাগান তুলে এনেছেন মানুষের বিজ্ঞানযাত্রার অবিস্মরণীয় সেই ইতিহাস, হাজার হাজার বছর আগে শুরু হওয়া যে পথে আজো হেঁটে চলেছে বিজ্ঞান, ক্রমাগত বড় হয়ে যাওয়া লক্ষ্যের দিকে।
Cosmos এর শুরু হয়েছে মিশরের বিখ্যাত আলেক্সান্দ্রিয়া শহরের গল্প দিয়ে। যে শহর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আলেকজান্ডার দি গ্রেট, যে শহরে একসময় ছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার, আর যে শহরে বাস করতেন এরাটোস্থেনেস, একাধারে যিনি দার্শনিক, গণিতবিদ, নাট্য সমালোচক, জ্যোতির্বিদ, কবি, ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিদ। তাঁর সমসাময়িক কে একজন হিংসে করে তাঁকে ডাকতো বেটা (Beta), যা গ্রীক বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর (ঈর্ষান্বিত সমসাময়িক এই বন্ধুর মতে এরাটোস্থেনেস নাকি সব বিষয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছিলেন)। তবে এরাটোস্থেনেস এর অসামান্য সব কীর্তিকলাপের কথা জানলে তাঁকে কোনভাবেই বেটা নয়, আলফা-ই মানতে হবে। আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীর পরিচালক এরাটোস্থেনেস একদিন এক প্যাপিরাস বইতে পড়লেন সাইন নগরীতে পৃথিবীর দীর্ঘতম দিন ২১শে জুন মধ্যদুপুরে মাটিতে পুঁতে রাখা কাঠির কোন ছায়া পড়েনা। সেখানে নাকি সূর্য যতো দুপুর বেলার দিকে গড়ায়, মন্দিরের স্তম্ভের ছায়া ততো ছোট হতে থাকে, আর ঠিক মধ্যদুপুরে, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, তখন ছায়া বিলীন হয়ে যায়। অন্য কেউ হয়তো সূর্য, ছায়া, কাঠি এসব নিয়ে ভেবে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতেন চাইতেন না। এরাটোস্থেনেস করলেন। কেন একই দিনে আলেক্সান্দ্রিয়ার মাটিতে পোঁতা কাঠির ছায়া পড়ে কিন্তু সাইনে পড়ে না এ প্রশ্ন তাঁর শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। পৃথিবী যদি সত্যি সমতল হয়ে থাকে (সে যুগের বিশ্বাস মোতাবেক), তাহলে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে থাকলে তো পৃথিবীর কোথাওই মাটিতে পুঁতে রাখা কাঠির ছায়া পড়বার কথা নয়, সূর্যের খাড়াভাবে আলো দেবার কারণে। সূর্য যদি বিশেষ কোন কোণে বেঁকে আলো দেয়, তাহলে সমতল পৃথিবীর সব অঞ্চলেই কাঠির ছায়ার মাপ সমান হবার কথা। কিন্তু বাস্তবতা তো তাও নয়! এরাটোস্থেনেস ভেবে বার করলেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ বক্র হলেই (অর্থাৎ পৃথিবীর আকার গোল হলে) একমাত্র সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার ছায়ারহস্যের সমাধান মেলে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের এ বক্রতা যত বেশী, মাটিতে পড়া ছায়ার দৈর্ঘ্যও ততো বড়। সূর্য পৃথিবী থেকে অসম্ভব দূরে বলে আলোকরশ্মিগুলো পৃথিবীর ওপর সমান্তরাল ভাবে এসে পড়ে।
এরাটোস্থেনেস হিসেব করতে বসলেন, সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার মাটিতে পোঁতা কাঠির দৈর্ঘ্যকে যদি মনে মনে বাড়িয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে পৃথিবীর কেন্দ্রে কাঠিদ্বয় একে অপরকে কত কোণে ছেদ করবে?
আলেক্সান্দ্রিয়ায় পোঁতা কাঠির ওপর খাড়াভাবে সূর্যের আলো পড়লে ছায়া উৎপন্ন হয় ৭ ডিগ্রী কোণে (চিত্র দ্রষ্টব্যঃ angle A)। পৃথিবীর কেন্দ্রে সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার কাঠিদ্বয় একে অপরকে B কোণে ছেদ করলে তা হবে A কোণ এর সমান (কারণ, দুটি সমান্তরাল রেখাকে তৃতীয় একটি রেখা ছেদ করলে ছেদক দ্বারা উৎপন্ন একান্তর কোণদ্বয় পরস্পর সমান!)। অতএব, কোন A = কোণ B = ৭ ডিগ্রী। ৭ ডিগ্রী ৩৬০ ডিগ্রী'র (পৃথিবী বৃত্তাকার হলে কোণের সম্পূর্ণ পরিমাপ) মেরেকেটে ১/৫০ ভাগ। আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে সাইনের দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার , সুতরাং, ৮০০ X ৫০ = ৪০,০০০ কিলোমিটার (২৫,০০০ মাইল) হলো পৃথিবীর পরিধি! ২২০০ বছর আগে স্রেফ কাঠির ছায়া থেকে এরাটোস্থেনেস পৃথিবীর আকার সঠিকভাবে বলে দিলেন ও পৃথিবীর পরিধির হিসেব করে ফেললেন, বর্তমানের নিখুঁত পরিমাপের সাথে যার পার্থক্য ০.১৬ শতাংশ!
বিজ্ঞানের আজকের প্রসারের পেছনে আলেক্সান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের খুব কম ভূমিকা নেই, যদিওবা এর বেশীর ভাগটাই ধংস হয়ে গেছে মানুষের নির্বুদ্ধিতার জন্যই। আলেক্সান্দ্রিয়ার এই গ্রন্থাগার ছিলো সেই যুগের প্রথম আধুনিক গবেষণালয়। এরাটোস্থেনেস তো ছিলেন-ই, আরো ছিলেন জ্যোতির্বিদ হিপ্পারকাস, যিনি নক্ষত্রপুঞ্জের মানচিত্র তৈরী করেন ও নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার পরিমাপ করেন। ছিলেন ইউক্লিড, আজ আমরা জ্যামিতি বই পড়তে পাই যাঁর কল্যাণে, ছিলেন ডায়োনিসাস, যিনি ভাষার পদসমূহকে (Parts of Speech) প্রথম সংজ্ঞায়িত করেন। ভাষাতত্ত্বে তাঁর অবদান ঠিক জ্যামিতিতে ইউক্লিডের যেমন। আলেক্সান্দ্রিয়ায় আরো ছিলেন হেরোফিলাস, যিনি আবিষ্কার করেন হৃদয় নয় মস্তিষ্কই বুদ্ধিমত্তার চালক। ছিলেন হেরন, বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের উদ্ভাবক ও রোবটিক্সের প্রথম বইয়ের লেখক। ছিলেন অ্যাপোলোনিয়াস, যিনি কণিক আকৃতিসমূহকে উপবৃত্ত (Ellipse), পরাবৃত্ত (Parabola) ও অধিবৃত্ত (Hyperbola) এই তিনভাগে ভাগ করেন। ছিলেন আর্কিমিডিস ও টলেমিও। এইসব মহা মহা 'পুরুষ' দের সাথে ছিলেন একজন অসামান্য নারীওঃ হাইপেশিয়া। জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের জ্ঞান দিয়ে যিনি আলো করে রেখেছিলেন আলেক্সান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার। হাইপেশিয়াকে নিয়ে ২০০৯ সালেই ছবি হয়েছে, 'Agora'। হাইপেশিয়া'র চরিত্রে অভিনয় করেন র্যাচেল ভাইৎস।
১৯৮০ সালে লেখা কার্ল সাগানের Cosmos বইটি আজ পর্যন্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বহু বিজ্ঞানী পরবর্তী জীবনে তাঁদের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পেছনে এই বইটির ভূমিকার কথা বলেছেন। বইটির অন্যতম প্রধান একটি আকর্ষণ হলো এর ছবির প্রাচুর্য। সাদা-কালো ও রঙিন মিলিয়ে মোটমাট সাড়ে ৫শ'র মতো ছবি আছে এই বইতে। Cosmos-এর এ আলোচনায় আমি উল্লেখ্যযোগ্য কিছু ছবি এখানে সেঁটে দিলাম। বলাবাহুল্যমাত্র, বইয়ের মূল ছবির সংখ্যা ও মানের তুলনায় এখানের ছবির সংখ্যা ও মান নিতান্তই হাস্যকর।
ছবিঃ চন্দ্র গ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়ার আকার পরিমাপ করবার 'পেপার কম্পিউটার'। ১৫৪০ সালে জার্মানী থেকে প্রকাশিত Astronomicum Caesarium এর পাতা থেকে।
ছবিঃ ওপর থেকে বামেঃ নভেম্বর মাসের ক্যালেন্ডারের পাতা, মাঝে গোল বৃত্তে ধনুর্বিদ স্যাগেটারিয়াস, যার নামানুসারে ধনু রাশি, জার্মানী, ১৪৫০। ওপর থেকে ডানেঃ দিন ও রাতের তুলনামূলক দৈর্ঘ্যের মধ্যযুগীয় বিবরণী। নিচ থেকে বামেঃ প্রাক-কোপার্নিকাস যুগের খ্রিষ্টীয় ইওরোপের পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্ব। কেন্দ্রে অবস্থিত পৃথিবী স্বর্গ (তামাটে) ও নরক (বাদামী)-এ দু'ভাগে বিভক্ত। পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে পানি (সবুজ), বায়ু (নীল) ও আগুন (লাল)। বাইরের দিকে একে একে সাতটি গ্রহ, চাঁদ ও সূর্য; এই ১২টি উপকরণ নিয়ে Twelve Orders of the Blessed Spirits। Cherubim and the Seraphim-জার্মানী, ১৪৫০। নিচ থেকে ডানেঃ রাশির ১২টি প্রতীক, কেন্দ্রে আছেন সূর্য ও চন্দ্র। চার কোনায় চার দিকের চার বায়ু (The Four Winds)। বর্ণের ভিন্নতা দিয়ে পার্থিব মৌলগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছেঃ মাটি (বাদামী), বায়ু (নীল), পানি (সবুজ) ও আগুন (লাল)।
ছবিঃ ওপরেঃ সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ এর ভবিষ্যৎবাণী করবার জন্য ব্যবহৃত 'পেপার কম্পিউটার'। গোল চাকতিগুলোকে দাগে অনুযায়ী ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হিসেব করা হতো, জার্মানী, ১৫৪০। নিচ থেকে বামেঃ গ্রহের সাপেক্ষে চাঁদের গতিপথ নির্ণয় করবার ছক। নিচ থেকে ডানেঃ বুধ গ্রহ (গাঢ় নীল বর্ণের গোলক) ও বুধের চারপাশের ঘিরে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জ। বুধের ঠিক নিচেই ক্যাসিওপিয়া বসে আছে, ডানে ওরায়অন পশু বধ করছে। নিচে গ্রহগুলো দ্বারা পরিচালিত মানুষের নানা কর্মকান্ড, জার্মানী, ১৫৪০।
মানবসভ্যতার প্রায় শুরু থেকেই লেজওয়ালা ধূমকেতু মানুষকে ভাবিয়েছে। Cosmos-এ ধূমকেতুর ওপর প্রায় গোটা একটি অধ্যায়ই বরাদ্দ করেছেন সাগান (Chapter IV: Heaven and Hell)। ধূমকেতুর রাসায়নিক উপাদানের আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছেন বিভিন্ন সভ্যতায় বিভিন্ন সময়ে মানুষ যেভাবে ধূমকেতুকে দেখেছে তার কিছু ছবি। এখানে দু-চারটা জুড়ে দেবার লোভ সামলাতে পারছিনাঃ
ছবিঃ ১১শ শতকের বেইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে (Bayeux Tapestry) অঙ্কিত ১০৬৬ সনের এপ্রিল মাসে দেখা হ্যালি'র ধূমকেতু। বাম পাশে ল্যাটিনে লেখা "ধূমকেতুর আবির্ভাবে বিমোহিত মানুষেরা"। ডানে রাজ অমাত্য তড়িঘড়ি করে ধূমকেতু দেখবার খবর ইংল্যান্ডের নকীবকে শোনাচ্ছে। রাণী মাটিল্ডের অর্থায়নে এই বেইয়ু ট্যাপেস্ট্রি অঙ্কিত হয়।
ছবিঃ রেনেসাঁ যুগের শুরুর দিকের শিল্পী জিওত্তো'র চোখে "অ্যাডোরেশন অফ দ্যা ম্যাজাই", ১৩০৪। বাইবেলে বর্ণিত যিশুর আবির্ভাব ঘোষণাকারী নক্ষত্র স্টার অফ বেথেলহেমকে ঐশ্বরিক কোন ইঙ্গিত হিসেবে না নিয়ে জিওত্তো সাধারণ এক ধূমকেতু হিসেবে দেখেছেন।
ছবিঃ অ্যাজটেক শিল্প। সম্রাট মক্তেজুমা বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ধূমকেতু দেখছেন। অ্যাজটেক বিশ্বাসমতে ধূমকেতু বিপদের আগাম বার্তা বয়ে আনে। সম্রাট মক্তেজুমা ধূমকেতু দর্শনের পর রাজকার্জে উদাসীন হয়ে পড়েন যা স্প্যানিশদের অ্যাজটেক বিজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
ছবিঃ তুর্কি শিল্পীর চোখে ১৫৭৭ সালের The Great Comet। এই ধূমকেতুর আবির্ভাবের পরপরই ইস্তানবুল অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বইতে অবশ্য ছবিটি উলটো করে ছাপা হয়েছে।
ছবিঃ চেক শিল্পী পিটার কোডিসিলাস-এর চোখে ১৫৭৭ সালের গ্রেট কমেট। কোডিসিলাস এই ধূমকেতুটিকে চাঁদ আর শনিগ্রহ ওপর বিস্তৃত করে এঁকেছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে লণ্ঠন জ্বালিয়ে একজন ধূমকেতুটির ছবি আঁকছেন। জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে অংক কষে হিসেব করেন গ্রেট কমেট চাঁদের থেকেও দূরে অবস্থিত যার ওপর ভিত্তি করে ব্রাহে নিশ্চিত হন ধূমকেতুর অবস্থান মহাকাশে, এটি পার্থিব কিছু নয়!
৬ষ্ঠ এবং ৭ম শতকের নামী সব জ্যোতির্বিদদেরও (এমনকি নিউটনকেও) ধূমকেতু বেশ ভাবিয়েছিলো। ইয়োহানেস কেপলার আকাশের বুক চিরে যাওয়া ধূমকেতু দেখে একে সামুদ্রিক মাছের সাথে তুলনা করেছিলেন। দার্শনিক ডেভিড হিউমের কাছে লেজসহ ধূমকেতু ধরা দিয়েছিলো জননকোষ হিসেবে। তাঁর মনে হয়েছিলো ধূমকেতু মূলত নাক্ষত্রিক শুক্রাণূ কিংবা ডিম্বাণু এবং গ্রহের জন্ম হয় আসলে আন্তঃনাক্ষত্রিক যৌনমিলনের ফলে!
গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চার জন্য আমেরিকা আজ গোটা বিশ্বের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তদশ শতকে এই কীর্তির দাবীদার ছিলো হল্যান্ড। ইওরোপের অন্যান্য অঞ্চলে চার্চের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার জন্য যখন জিওর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, গ্যালিলিও গ্যালিলিকে জেলের অন্ধকারে আটকা রাখা হচ্ছে হল্যান্ডে তখন চলছে জ্ঞানের সর্বোচ্চ চর্চা। হল্যান্ডে তখন আছেন দার্শনিক স্পিনোজা, গণিতবিদ-দার্শনিক রেনে দেকার্ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন লক, শিল্পী রেমব্রাঁ, ভারমিয়ার ও ফ্রান্স হেলস, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের উদ্ভাবক লিউয়েন হুক, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠাতা গ্রোটিয়াস ও আলোর প্রতিসরণের আবিষ্কর্তা উইলব্রড স্নেলিয়াস।
হল্যান্ডের সেই পরিবেশ জন্ম দিয়েছিলো বিজ্ঞানের আরেকজন মহারথীকে। তাঁর নাম ক্রিশ্চিয়ান হায়োগেন (Christian Huygens)। হায়োগেনের বিষয়ে আসবার আগে তাঁর বাবার (Constantijn Huygen) কথা না বললেই নয়। কনস্তান্তিন হায়োগেন ছিলেন একজন ঝানু কূটনীতিক, কবি, সাহিত্যিক এবং সুরকার। কন্সতান্তিন বিখ্যাত ইংলিশ কবি জন ডন এর ভালো বন্ধুও ছিলেন যাঁর No Man is an Island কবিতার "Any man's death diminishes me, Because I'm involved in mankind, And therefore never send to know for whom the bell tolls, it tolls for thee" চরণ ক'টি বিশ্ব মানবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ (আমার ধারণা শ্রেষ্ঠতম!) বানী হয়ে আছে আজো। কন্সতান্তিন-ই সর্বপ্রথম শিল্পী রেমব্রাঁকে আবিষ্কার করেন, আজ রেমব্রাঁ'র এক একটি ছবি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে বিকোয়। রেনে দেকার্ত কন্সতান্তিন এর সাথে দেখা করবার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন "আমি কখনোই বিশ্বাস করতে পারতামনা একজন মানুষের একার পক্ষে এত কিছু নিয়ে ভাবা এবং প্রত্যেকটি বিষয়েই এতটা দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব"! এই কন্সতান্তিন এর পুত্র ক্রিশ্চিয়ান যে গণিতে, আইনে, বিজ্ঞানে, প্রকৌশল-বিদ্যায় এবং সংগীতে ওস্তাদ হবেন এবং নেহাৎ খেলাচ্ছলেই বলবেন "পৃথিবী আমার দেশ, বিজ্ঞান আমার ধর্ম"-সে আর বিচিত্র কি?
কসমস-এ সাগান হায়োগেন এর ওপর টানা কয়েক পৃষ্ঠা লিখে গেছেন। ক্রিশ্চিয়ান হায়োগেন এবং লিউয়েন হুক হলেন সেইসব সৌভাগ্যবানদের মধ্যে অন্যতম যাঁরা প্রথম মানুষের শুক্রাণু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখেছেন, মানুষের জনন প্রক্রিয়া বুঝবার জন্য যেটি প্রথম ধাপ। হায়োগেন প্রথম ব্যাক্তি যিনি পৃথিবী ভিন্ন অন্য গ্রহের পরিধি নির্ণয় করেছেন-অনেকটা এরাটোস্থেনেস এর মতোই, মঙ্গল গ্রহের ভূপৃষ্ঠের সঠিক বর্ণনা দিয়েছেন, মঙ্গলের দিন যে পৃথিবীর মতোই ২৪ ঘন্টায় হয় তা নির্ণয় করেছেন, শনি গ্রহের চারপাশে যে চক্র আছে তা আবিষ্কার করেছেন। শনি'র সবচেয়ে বড় চাঁদ 'টাইটান'ও তাঁরই আবিষ্কার। এই সব কিছুই হায়োগেন জুনিয়র ত্রিশের কোটা ধরবার আগেই করে ফেলেছেন।
কিন্তু হায়োগেন কীর্তি'র এখানেই শেষ নয়! সব কথা এখানে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। সে পথে আর না হাঁটাই শ্রেয়। তাছাড়াও, হিংসেটাও নেহাৎ কম নয় বৈকি!
ছবিঃ নতুন পৃথিবীর মানচিত্র। ওপরে ভয়েজার ১ এবং ২ এর পাঠানো তথ্য অনুযায়ী ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তৈরীকৃত বৃহস্পতি'র চাঁদ আয়ো'র (Io) মানচিত্র। নিচে দুই আমেরিকাকে একসাথে দেখানো প্রথম মানচিত্র, তৈরী করেছেন হুয়ান দে লা কোসা। কলম্বাস এর অধীনে চাকরি করবার সময় কোসা মানচিত্রটি বানান ১৫০০ সালে।
মিলেটাস নগরীর থেলিসকে বলা হয় প§ show less
১৯৮০ সালে জ্যোতির্পদার্থবিদ কার্ল সাগান একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরী করেন Cosmos: A Personal Voyage নামে, উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়া, চিন্তার সুতো ধরিয়ে দেয়া। ১৩ পর্বের এই অনুষ্ঠানটিই পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করেন সাগান। ১৩টি অধ্যায়ে সাগান তুলে এনেছেন মানুষের বিজ্ঞানযাত্রার অবিস্মরণীয় সেই ইতিহাস, হাজার হাজার বছর আগে শুরু হওয়া যে পথে আজো হেঁটে চলেছে বিজ্ঞান, ক্রমাগত বড় হয়ে যাওয়া লক্ষ্যের দিকে।
Cosmos এর শুরু হয়েছে মিশরের বিখ্যাত আলেক্সান্দ্রিয়া শহরের গল্প দিয়ে। যে শহর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আলেকজান্ডার দি গ্রেট, যে শহরে একসময় ছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার, আর যে শহরে বাস করতেন এরাটোস্থেনেস, একাধারে যিনি দার্শনিক, গণিতবিদ, নাট্য সমালোচক, জ্যোতির্বিদ, কবি, ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিদ। তাঁর সমসাময়িক কে একজন হিংসে করে তাঁকে ডাকতো বেটা (Beta), যা গ্রীক বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর (ঈর্ষান্বিত সমসাময়িক এই বন্ধুর মতে এরাটোস্থেনেস নাকি সব বিষয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছিলেন)। তবে এরাটোস্থেনেস এর অসামান্য সব কীর্তিকলাপের কথা জানলে তাঁকে কোনভাবেই বেটা নয়, আলফা-ই মানতে হবে। আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীর পরিচালক এরাটোস্থেনেস একদিন এক প্যাপিরাস বইতে পড়লেন সাইন নগরীতে পৃথিবীর দীর্ঘতম দিন ২১শে জুন মধ্যদুপুরে মাটিতে পুঁতে রাখা কাঠির কোন ছায়া পড়েনা। সেখানে নাকি সূর্য যতো দুপুর বেলার দিকে গড়ায়, মন্দিরের স্তম্ভের ছায়া ততো ছোট হতে থাকে, আর ঠিক মধ্যদুপুরে, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, তখন ছায়া বিলীন হয়ে যায়। অন্য কেউ হয়তো সূর্য, ছায়া, কাঠি এসব নিয়ে ভেবে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতেন চাইতেন না। এরাটোস্থেনেস করলেন। কেন একই দিনে আলেক্সান্দ্রিয়ার মাটিতে পোঁতা কাঠির ছায়া পড়ে কিন্তু সাইনে পড়ে না এ প্রশ্ন তাঁর শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। পৃথিবী যদি সত্যি সমতল হয়ে থাকে (সে যুগের বিশ্বাস মোতাবেক), তাহলে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে থাকলে তো পৃথিবীর কোথাওই মাটিতে পুঁতে রাখা কাঠির ছায়া পড়বার কথা নয়, সূর্যের খাড়াভাবে আলো দেবার কারণে। সূর্য যদি বিশেষ কোন কোণে বেঁকে আলো দেয়, তাহলে সমতল পৃথিবীর সব অঞ্চলেই কাঠির ছায়ার মাপ সমান হবার কথা। কিন্তু বাস্তবতা তো তাও নয়! এরাটোস্থেনেস ভেবে বার করলেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ বক্র হলেই (অর্থাৎ পৃথিবীর আকার গোল হলে) একমাত্র সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার ছায়ারহস্যের সমাধান মেলে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের এ বক্রতা যত বেশী, মাটিতে পড়া ছায়ার দৈর্ঘ্যও ততো বড়। সূর্য পৃথিবী থেকে অসম্ভব দূরে বলে আলোকরশ্মিগুলো পৃথিবীর ওপর সমান্তরাল ভাবে এসে পড়ে।
এরাটোস্থেনেস হিসেব করতে বসলেন, সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার মাটিতে পোঁতা কাঠির দৈর্ঘ্যকে যদি মনে মনে বাড়িয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে পৃথিবীর কেন্দ্রে কাঠিদ্বয় একে অপরকে কত কোণে ছেদ করবে?
আলেক্সান্দ্রিয়ায় পোঁতা কাঠির ওপর খাড়াভাবে সূর্যের আলো পড়লে ছায়া উৎপন্ন হয় ৭ ডিগ্রী কোণে (চিত্র দ্রষ্টব্যঃ angle A)। পৃথিবীর কেন্দ্রে সাইন আর আলেক্সান্দ্রিয়ার কাঠিদ্বয় একে অপরকে B কোণে ছেদ করলে তা হবে A কোণ এর সমান (কারণ, দুটি সমান্তরাল রেখাকে তৃতীয় একটি রেখা ছেদ করলে ছেদক দ্বারা উৎপন্ন একান্তর কোণদ্বয় পরস্পর সমান!)। অতএব, কোন A = কোণ B = ৭ ডিগ্রী। ৭ ডিগ্রী ৩৬০ ডিগ্রী'র (পৃথিবী বৃত্তাকার হলে কোণের সম্পূর্ণ পরিমাপ) মেরেকেটে ১/৫০ ভাগ। আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে সাইনের দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার , সুতরাং, ৮০০ X ৫০ = ৪০,০০০ কিলোমিটার (২৫,০০০ মাইল) হলো পৃথিবীর পরিধি! ২২০০ বছর আগে স্রেফ কাঠির ছায়া থেকে এরাটোস্থেনেস পৃথিবীর আকার সঠিকভাবে বলে দিলেন ও পৃথিবীর পরিধির হিসেব করে ফেললেন, বর্তমানের নিখুঁত পরিমাপের সাথে যার পার্থক্য ০.১৬ শতাংশ!
বিজ্ঞানের আজকের প্রসারের পেছনে আলেক্সান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের খুব কম ভূমিকা নেই, যদিওবা এর বেশীর ভাগটাই ধংস হয়ে গেছে মানুষের নির্বুদ্ধিতার জন্যই। আলেক্সান্দ্রিয়ার এই গ্রন্থাগার ছিলো সেই যুগের প্রথম আধুনিক গবেষণালয়। এরাটোস্থেনেস তো ছিলেন-ই, আরো ছিলেন জ্যোতির্বিদ হিপ্পারকাস, যিনি নক্ষত্রপুঞ্জের মানচিত্র তৈরী করেন ও নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার পরিমাপ করেন। ছিলেন ইউক্লিড, আজ আমরা জ্যামিতি বই পড়তে পাই যাঁর কল্যাণে, ছিলেন ডায়োনিসাস, যিনি ভাষার পদসমূহকে (Parts of Speech) প্রথম সংজ্ঞায়িত করেন। ভাষাতত্ত্বে তাঁর অবদান ঠিক জ্যামিতিতে ইউক্লিডের যেমন। আলেক্সান্দ্রিয়ায় আরো ছিলেন হেরোফিলাস, যিনি আবিষ্কার করেন হৃদয় নয় মস্তিষ্কই বুদ্ধিমত্তার চালক। ছিলেন হেরন, বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের উদ্ভাবক ও রোবটিক্সের প্রথম বইয়ের লেখক। ছিলেন অ্যাপোলোনিয়াস, যিনি কণিক আকৃতিসমূহকে উপবৃত্ত (Ellipse), পরাবৃত্ত (Parabola) ও অধিবৃত্ত (Hyperbola) এই তিনভাগে ভাগ করেন। ছিলেন আর্কিমিডিস ও টলেমিও। এইসব মহা মহা 'পুরুষ' দের সাথে ছিলেন একজন অসামান্য নারীওঃ হাইপেশিয়া। জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের জ্ঞান দিয়ে যিনি আলো করে রেখেছিলেন আলেক্সান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার। হাইপেশিয়াকে নিয়ে ২০০৯ সালেই ছবি হয়েছে, 'Agora'। হাইপেশিয়া'র চরিত্রে অভিনয় করেন র্যাচেল ভাইৎস।
১৯৮০ সালে লেখা কার্ল সাগানের Cosmos বইটি আজ পর্যন্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বহু বিজ্ঞানী পরবর্তী জীবনে তাঁদের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পেছনে এই বইটির ভূমিকার কথা বলেছেন। বইটির অন্যতম প্রধান একটি আকর্ষণ হলো এর ছবির প্রাচুর্য। সাদা-কালো ও রঙিন মিলিয়ে মোটমাট সাড়ে ৫শ'র মতো ছবি আছে এই বইতে। Cosmos-এর এ আলোচনায় আমি উল্লেখ্যযোগ্য কিছু ছবি এখানে সেঁটে দিলাম। বলাবাহুল্যমাত্র, বইয়ের মূল ছবির সংখ্যা ও মানের তুলনায় এখানের ছবির সংখ্যা ও মান নিতান্তই হাস্যকর।
ছবিঃ চন্দ্র গ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়ার আকার পরিমাপ করবার 'পেপার কম্পিউটার'। ১৫৪০ সালে জার্মানী থেকে প্রকাশিত Astronomicum Caesarium এর পাতা থেকে।
ছবিঃ ওপর থেকে বামেঃ নভেম্বর মাসের ক্যালেন্ডারের পাতা, মাঝে গোল বৃত্তে ধনুর্বিদ স্যাগেটারিয়াস, যার নামানুসারে ধনু রাশি, জার্মানী, ১৪৫০। ওপর থেকে ডানেঃ দিন ও রাতের তুলনামূলক দৈর্ঘ্যের মধ্যযুগীয় বিবরণী। নিচ থেকে বামেঃ প্রাক-কোপার্নিকাস যুগের খ্রিষ্টীয় ইওরোপের পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্ব। কেন্দ্রে অবস্থিত পৃথিবী স্বর্গ (তামাটে) ও নরক (বাদামী)-এ দু'ভাগে বিভক্ত। পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে পানি (সবুজ), বায়ু (নীল) ও আগুন (লাল)। বাইরের দিকে একে একে সাতটি গ্রহ, চাঁদ ও সূর্য; এই ১২টি উপকরণ নিয়ে Twelve Orders of the Blessed Spirits। Cherubim and the Seraphim-জার্মানী, ১৪৫০। নিচ থেকে ডানেঃ রাশির ১২টি প্রতীক, কেন্দ্রে আছেন সূর্য ও চন্দ্র। চার কোনায় চার দিকের চার বায়ু (The Four Winds)। বর্ণের ভিন্নতা দিয়ে পার্থিব মৌলগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছেঃ মাটি (বাদামী), বায়ু (নীল), পানি (সবুজ) ও আগুন (লাল)।
ছবিঃ ওপরেঃ সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ এর ভবিষ্যৎবাণী করবার জন্য ব্যবহৃত 'পেপার কম্পিউটার'। গোল চাকতিগুলোকে দাগে অনুযায়ী ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হিসেব করা হতো, জার্মানী, ১৫৪০। নিচ থেকে বামেঃ গ্রহের সাপেক্ষে চাঁদের গতিপথ নির্ণয় করবার ছক। নিচ থেকে ডানেঃ বুধ গ্রহ (গাঢ় নীল বর্ণের গোলক) ও বুধের চারপাশের ঘিরে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জ। বুধের ঠিক নিচেই ক্যাসিওপিয়া বসে আছে, ডানে ওরায়অন পশু বধ করছে। নিচে গ্রহগুলো দ্বারা পরিচালিত মানুষের নানা কর্মকান্ড, জার্মানী, ১৫৪০।
মানবসভ্যতার প্রায় শুরু থেকেই লেজওয়ালা ধূমকেতু মানুষকে ভাবিয়েছে। Cosmos-এ ধূমকেতুর ওপর প্রায় গোটা একটি অধ্যায়ই বরাদ্দ করেছেন সাগান (Chapter IV: Heaven and Hell)। ধূমকেতুর রাসায়নিক উপাদানের আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছেন বিভিন্ন সভ্যতায় বিভিন্ন সময়ে মানুষ যেভাবে ধূমকেতুকে দেখেছে তার কিছু ছবি। এখানে দু-চারটা জুড়ে দেবার লোভ সামলাতে পারছিনাঃ
ছবিঃ ১১শ শতকের বেইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে (Bayeux Tapestry) অঙ্কিত ১০৬৬ সনের এপ্রিল মাসে দেখা হ্যালি'র ধূমকেতু। বাম পাশে ল্যাটিনে লেখা "ধূমকেতুর আবির্ভাবে বিমোহিত মানুষেরা"। ডানে রাজ অমাত্য তড়িঘড়ি করে ধূমকেতু দেখবার খবর ইংল্যান্ডের নকীবকে শোনাচ্ছে। রাণী মাটিল্ডের অর্থায়নে এই বেইয়ু ট্যাপেস্ট্রি অঙ্কিত হয়।
ছবিঃ রেনেসাঁ যুগের শুরুর দিকের শিল্পী জিওত্তো'র চোখে "অ্যাডোরেশন অফ দ্যা ম্যাজাই", ১৩০৪। বাইবেলে বর্ণিত যিশুর আবির্ভাব ঘোষণাকারী নক্ষত্র স্টার অফ বেথেলহেমকে ঐশ্বরিক কোন ইঙ্গিত হিসেবে না নিয়ে জিওত্তো সাধারণ এক ধূমকেতু হিসেবে দেখেছেন।
ছবিঃ অ্যাজটেক শিল্প। সম্রাট মক্তেজুমা বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ধূমকেতু দেখছেন। অ্যাজটেক বিশ্বাসমতে ধূমকেতু বিপদের আগাম বার্তা বয়ে আনে। সম্রাট মক্তেজুমা ধূমকেতু দর্শনের পর রাজকার্জে উদাসীন হয়ে পড়েন যা স্প্যানিশদের অ্যাজটেক বিজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
ছবিঃ তুর্কি শিল্পীর চোখে ১৫৭৭ সালের The Great Comet। এই ধূমকেতুর আবির্ভাবের পরপরই ইস্তানবুল অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বইতে অবশ্য ছবিটি উলটো করে ছাপা হয়েছে।
ছবিঃ চেক শিল্পী পিটার কোডিসিলাস-এর চোখে ১৫৭৭ সালের গ্রেট কমেট। কোডিসিলাস এই ধূমকেতুটিকে চাঁদ আর শনিগ্রহ ওপর বিস্তৃত করে এঁকেছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে লণ্ঠন জ্বালিয়ে একজন ধূমকেতুটির ছবি আঁকছেন। জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে অংক কষে হিসেব করেন গ্রেট কমেট চাঁদের থেকেও দূরে অবস্থিত যার ওপর ভিত্তি করে ব্রাহে নিশ্চিত হন ধূমকেতুর অবস্থান মহাকাশে, এটি পার্থিব কিছু নয়!
৬ষ্ঠ এবং ৭ম শতকের নামী সব জ্যোতির্বিদদেরও (এমনকি নিউটনকেও) ধূমকেতু বেশ ভাবিয়েছিলো। ইয়োহানেস কেপলার আকাশের বুক চিরে যাওয়া ধূমকেতু দেখে একে সামুদ্রিক মাছের সাথে তুলনা করেছিলেন। দার্শনিক ডেভিড হিউমের কাছে লেজসহ ধূমকেতু ধরা দিয়েছিলো জননকোষ হিসেবে। তাঁর মনে হয়েছিলো ধূমকেতু মূলত নাক্ষত্রিক শুক্রাণূ কিংবা ডিম্বাণু এবং গ্রহের জন্ম হয় আসলে আন্তঃনাক্ষত্রিক যৌনমিলনের ফলে!
গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চার জন্য আমেরিকা আজ গোটা বিশ্বের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তদশ শতকে এই কীর্তির দাবীদার ছিলো হল্যান্ড। ইওরোপের অন্যান্য অঞ্চলে চার্চের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার জন্য যখন জিওর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, গ্যালিলিও গ্যালিলিকে জেলের অন্ধকারে আটকা রাখা হচ্ছে হল্যান্ডে তখন চলছে জ্ঞানের সর্বোচ্চ চর্চা। হল্যান্ডে তখন আছেন দার্শনিক স্পিনোজা, গণিতবিদ-দার্শনিক রেনে দেকার্ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন লক, শিল্পী রেমব্রাঁ, ভারমিয়ার ও ফ্রান্স হেলস, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের উদ্ভাবক লিউয়েন হুক, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠাতা গ্রোটিয়াস ও আলোর প্রতিসরণের আবিষ্কর্তা উইলব্রড স্নেলিয়াস।
হল্যান্ডের সেই পরিবেশ জন্ম দিয়েছিলো বিজ্ঞানের আরেকজন মহারথীকে। তাঁর নাম ক্রিশ্চিয়ান হায়োগেন (Christian Huygens)। হায়োগেনের বিষয়ে আসবার আগে তাঁর বাবার (Constantijn Huygen) কথা না বললেই নয়। কনস্তান্তিন হায়োগেন ছিলেন একজন ঝানু কূটনীতিক, কবি, সাহিত্যিক এবং সুরকার। কন্সতান্তিন বিখ্যাত ইংলিশ কবি জন ডন এর ভালো বন্ধুও ছিলেন যাঁর No Man is an Island কবিতার "Any man's death diminishes me, Because I'm involved in mankind, And therefore never send to know for whom the bell tolls, it tolls for thee" চরণ ক'টি বিশ্ব মানবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ (আমার ধারণা শ্রেষ্ঠতম!) বানী হয়ে আছে আজো। কন্সতান্তিন-ই সর্বপ্রথম শিল্পী রেমব্রাঁকে আবিষ্কার করেন, আজ রেমব্রাঁ'র এক একটি ছবি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে বিকোয়। রেনে দেকার্ত কন্সতান্তিন এর সাথে দেখা করবার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন "আমি কখনোই বিশ্বাস করতে পারতামনা একজন মানুষের একার পক্ষে এত কিছু নিয়ে ভাবা এবং প্রত্যেকটি বিষয়েই এতটা দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব"! এই কন্সতান্তিন এর পুত্র ক্রিশ্চিয়ান যে গণিতে, আইনে, বিজ্ঞানে, প্রকৌশল-বিদ্যায় এবং সংগীতে ওস্তাদ হবেন এবং নেহাৎ খেলাচ্ছলেই বলবেন "পৃথিবী আমার দেশ, বিজ্ঞান আমার ধর্ম"-সে আর বিচিত্র কি?
কসমস-এ সাগান হায়োগেন এর ওপর টানা কয়েক পৃষ্ঠা লিখে গেছেন। ক্রিশ্চিয়ান হায়োগেন এবং লিউয়েন হুক হলেন সেইসব সৌভাগ্যবানদের মধ্যে অন্যতম যাঁরা প্রথম মানুষের শুক্রাণু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখেছেন, মানুষের জনন প্রক্রিয়া বুঝবার জন্য যেটি প্রথম ধাপ। হায়োগেন প্রথম ব্যাক্তি যিনি পৃথিবী ভিন্ন অন্য গ্রহের পরিধি নির্ণয় করেছেন-অনেকটা এরাটোস্থেনেস এর মতোই, মঙ্গল গ্রহের ভূপৃষ্ঠের সঠিক বর্ণনা দিয়েছেন, মঙ্গলের দিন যে পৃথিবীর মতোই ২৪ ঘন্টায় হয় তা নির্ণয় করেছেন, শনি গ্রহের চারপাশে যে চক্র আছে তা আবিষ্কার করেছেন। শনি'র সবচেয়ে বড় চাঁদ 'টাইটান'ও তাঁরই আবিষ্কার। এই সব কিছুই হায়োগেন জুনিয়র ত্রিশের কোটা ধরবার আগেই করে ফেলেছেন।
কিন্তু হায়োগেন কীর্তি'র এখানেই শেষ নয়! সব কথা এখানে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। সে পথে আর না হাঁটাই শ্রেয়। তাছাড়াও, হিংসেটাও নেহাৎ কম নয় বৈকি!
ছবিঃ নতুন পৃথিবীর মানচিত্র। ওপরে ভয়েজার ১ এবং ২ এর পাঠানো তথ্য অনুযায়ী ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তৈরীকৃত বৃহস্পতি'র চাঁদ আয়ো'র (Io) মানচিত্র। নিচে দুই আমেরিকাকে একসাথে দেখানো প্রথম মানচিত্র, তৈরী করেছেন হুয়ান দে লা কোসা। কলম্বাস এর অধীনে চাকরি করবার সময় কোসা মানচিত্রটি বানান ১৫০০ সালে।
মিলেটাস নগরীর থেলিসকে বলা হয় প§ show less
পৃথিবীতে প্রেমের গল্পের চাহিদা অন্য আর সব ঘরানার গল্পের চেয়ে অনেক অনেক বেশী, সেটা কাগজের বইয়ের রূপে হোক আর চলচ্চিত্রের পর্দায়ই হোক। গল্পে প্রেম রাখা মানেই ‘হিট’ হবার পথে অর্ধেক রাস্তা এগিয়ে থাকা। প্রেমের গল্পের লেখককে তাই অন্ন জোটাবার চিন্তা বোধহয় অন্যদের চেয়ে কমই করতে হয়! মানুষের উপন্যাস লেখার ইতিহাস মেরে কেটে হাজার খানিক বছরের, আর ছবি বানাবার ইতিহাস দেড়শ বছরের। সেই শুরুর সময় থেকেই গল্প-উপন্যাস কিংবা চলচ্চিত্রের সাথে প্রেম বিষয়টি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত হয়ে আছে। একটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত প্রেমের গল্পগুলো শেষ হয়েছে “অতএব তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো” show more দিয়ে। প্রেমের সুখী পরিণামের গল্প এখন আর মানুষ শুনতে চায়না। কারণ পেছন ফিরে তাকালে এক হাজার বছরের একই কিসিমের ক্লান্তিকর গল্পের দেখা পাওয়া যায়। এখন দুঃখবিলাস এর যুগ। মানুষ এখন কাঁদতে চায়। প্রেমিক-প্রেমিকার করুণ পরিণতি দেখতে চায়। ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ দিয়ে দুঃখময় প্রেমের গল্পের আধুনিক যুগের সূচনা। এরপর ‘থ্রী কমরেডস’, ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, ‘ফর হুম দ্যা বেল টোলস’, ‘লাভ স্টোরী’ ইত্যাদি ধ্রুপদী উপন্যাসে কিংবা হালের ‘টাইটানিক’, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’, ‘তেরে নাম’, ‘কোল্ড মাউন্টেন’ ইত্যাদি ছবিতে সেই দুঃখময় প্রেমই উপজীব্য হয়ে এসেছে, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন ঘটেনা। বেশীর ভাগ সময়ই নায়ক বা নায়িকা, কোন একটি চরিত্রের প্রাণহানি ঘটে যা গল্পের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব ক্ষেত্রে পাঠক-দর্শকের বিসর্জিত অশ্রু অর্থাকারে লেখক-পরিচালকের ট্যাঁকে গিয়ে জমা হয়। অর্থাৎ, বিসর্জিত অশ্রু উসুলকৃত অর্থের সমানুপাতিক। জনপ্রিয় হবার অব্যর্থ এই ছাঁচে ফেলেই জন গ্রীন তাঁর টিন-এইজ প্রেমের গল্প ‘দ্যা ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ লিখেছেন, তবে পূর্বসুরীদের মত শিল্পিত উপায়ে নয়, খাঁটি বাণিজ্যিক উপায়ে।
টিন-এইজ প্রেম বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই খুব সুখকর কিছু নয় মোটেই! এ বয়েসের ছেলেরা প্রেমে পড়বার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, আর মেয়েরা কোন ছেলেকে ভালো লেগে গেলে ভাবে এর জন্যই বোধহয় তার জন্ম! এ সময়ের প্রেম আকাশ কুসুম কল্পনার ভুলে ভরা। এ সময়ের প্রেম মানে নিজে নিজে ঠিক করে নেয়া হাস্যকর সব ‘প্রেমের পরীক্ষা’য় নামা। আমার টিন-এইজ কালে প্রেমের পরীক্ষার অন্যতম নির্ধারক ছিলো ব্লেড দিয়ে কব্জির আশে পাশে ফালি ফালি করে কাটা। অতি উৎসাহী কেউ কেউ রক্ত বার করে চিঠিও লিখত। বন্ধুদের কারো হাতে ব্লেডের কাটার পরিচিত এই দাগ দেখলে বুঝতাম বন্ধু এখন প্রেমের পরীক্ষার মনোযোগী পরীক্ষার্থী, হয়ত সকলের দোয়াও প্রার্থী। জীবন চলার পথে এমন কারো কারো সাথেও দেখা হয়ে গেছে যাঁরা টিন-এইজ বয়েসের প্রেমের কালে দু হাতেরই কবজি থেকে বাহুমূল পর্যন্ত ব্লেড দিয়ে ক্ষতচিহ্ন এঁকে গেছেন, এক ন্যানোমিটার জায়গাও আর বাদ নেই সেখানে। এ ক্ষতচিহ্ন গুলো শুধু একজনের জন্যই উৎসর্গীকৃত নয়, বহুজনের জন্য। পৃথিবীতে ভালোবাসার মানুষ এত, কিন্তু হায়! হাত মাত্র দুটোই। ‘দ্যা ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ এ অবশ্য এমন রক্তপাত সংক্রান্ত ব্যাপার নেই, তবে প্রেমের পরীক্ষা আছে! গল্পের নায়ক ১৭ বছর বয়েসী অগাস্টাস ওয়াটার্স, আর নায়িকা ১৬ বছর বয়েসী হেইজেল গ্রেইস। দু'জনই ক্যান্সার আক্রান্ত। অগাস্টাস এর আগে রোগে এক পা হারিয়েছে, প্রস্থেটিক্স লাগিয়ে হাঁটতে হয় তাকে। হেইজেল গ্রেইসের ক্যান্সার ফুসফুসে। ন্যাসাল ক্যানুলা ছাড়া সে শ্বাস গ্রহণ করতে পারেনা। পাঠকের মনের সহানুভূতিশীল অংশটিতে খোঁচা দেয়া শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে! অগাস্টাস ও হেইজেল এর প্রথম দেখাতেই প্রেম (বিচিত্র কি?), এরপরের পাতা গুলো দুই কিশোর কিশোরীর কোন একজনের মৃত্যুর (কার মৃত্যু সেটি বলে দেয়াটা কোন মতেই সমীচীন হবে না নিশ্চয়ই?) আগ পর্যন্ত তাদের অমর প্রেমের আখ্যান। গল্পটি আমার ভালো লাগেনি। চিরাচরিত ছকে বাঁধা পুতুপুতু প্রেমের উপন্যাস। সবচেয়ে বড় কথা,অগাস্টাস ও হেইজেল, চরিত্র দুটিকে আমার ইংরেজীতে যাকে বলে স্পয়েল্ড ব্র্যাট (Spoiled brat), তা-ই মনে হয়েছে। প্রান্তিক রোগের সুযোগ খোঁজে তারা। “ক’দিন পরেই তো মরে যাবো, ইচ্ছেমতো মঊজ-মাস্তি করে নেই”-চরিত্রগুলোর এ প্রবণতা পছন্দ হয়নি। উপন্যাসটি বড় একটি জনগোষ্ঠী কে কাঁদিয়েছে (বিশেষত নারীমহলকে!) যা আমাকে কিছুটা ভাবিয়েছে। কাল্পনিক চরিত্রের মৃত্যুতে কত অল্পেই মানুষ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে, বাস্তব জীবনের সত্যিকার চরিত্রগুলোর প্রতি এই সহানুভূতি থাকলে হয়তো পৃথিবীটা অন্যরকমই হয়ে যেতো। মানুষ বোধহয় এক ফ্যান্টাসির জগতেই অপরের জন্য কষ্ট পেতে ভালোবাসে, আসল জগতে নয়। কে জানে?
উপন্যাসের কিছু অংশ আমার কাছে আরোপিত মনে হয়েছে। মূল চরিত্রগুলোর ওপর এক ধরনের নায়কোচিত আচরণ বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার দুটি অপ্রিয় অংশ উল্লেখ করছিঃ
(ক) অগাস্টাস ওয়াটার্স এর ঠোঁটে প্রায়ই সিগারেট ঝোলে, তবে সে সিগারেট খায় না। সিগারেট মুখে রেখেও সিগারেটকে সে তার ক্যান্সার বাড়াবার সুযোগ দেয় না।
(খ) হেইজেল গ্রেইস নিরামিষাশী, কারণ সে চায় না খুব বেশী সংখ্যক প্রাণীর মৃত্যুর জন্য সে দায়ী থাকুক।
প্রান্তিক রোগ (Terminal disease) হয়ত সত্যিই যে কোন মানুষকে অনেক পরিণত করে তোলে। যে কোন মুহূর্তই শেষ মুহুর্ত হতে পারে এমন ভয় চলে এলে মন হয়ত সত্যিই অনেক উন্নত চিন্তা করতে থাকে, তবে ১৬-১৭ বছরের ছেলে মেয়ের মুখে এসব পাকা কথা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।
ক্যান্সার আক্রান্ত কিশোর-কিশোরী নিয়ে বই জেনে যে আশাবাদ ছিলো, তা পূরণ হয়নি। দিনশেষে এটা স্রেফ একটা প্রেমেরই উপন্যাস। প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান সমাজে কোন কিছু বিখ্যাত হয়ে গেলেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। তার অনুকরণে অগুনতি আরো অসংখ্য কাজ বেরোয়। প্রান্তিক রোগে আক্রান্ত টিন-এইজারদের প্রেম নিয়ে আরো বই-সিনেমার ঢল নামে কিনা তা দেখার অপেক্ষায় আছি আপাতত! show less
টিন-এইজ প্রেম বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই খুব সুখকর কিছু নয় মোটেই! এ বয়েসের ছেলেরা প্রেমে পড়বার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, আর মেয়েরা কোন ছেলেকে ভালো লেগে গেলে ভাবে এর জন্যই বোধহয় তার জন্ম! এ সময়ের প্রেম আকাশ কুসুম কল্পনার ভুলে ভরা। এ সময়ের প্রেম মানে নিজে নিজে ঠিক করে নেয়া হাস্যকর সব ‘প্রেমের পরীক্ষা’য় নামা। আমার টিন-এইজ কালে প্রেমের পরীক্ষার অন্যতম নির্ধারক ছিলো ব্লেড দিয়ে কব্জির আশে পাশে ফালি ফালি করে কাটা। অতি উৎসাহী কেউ কেউ রক্ত বার করে চিঠিও লিখত। বন্ধুদের কারো হাতে ব্লেডের কাটার পরিচিত এই দাগ দেখলে বুঝতাম বন্ধু এখন প্রেমের পরীক্ষার মনোযোগী পরীক্ষার্থী, হয়ত সকলের দোয়াও প্রার্থী। জীবন চলার পথে এমন কারো কারো সাথেও দেখা হয়ে গেছে যাঁরা টিন-এইজ বয়েসের প্রেমের কালে দু হাতেরই কবজি থেকে বাহুমূল পর্যন্ত ব্লেড দিয়ে ক্ষতচিহ্ন এঁকে গেছেন, এক ন্যানোমিটার জায়গাও আর বাদ নেই সেখানে। এ ক্ষতচিহ্ন গুলো শুধু একজনের জন্যই উৎসর্গীকৃত নয়, বহুজনের জন্য। পৃথিবীতে ভালোবাসার মানুষ এত, কিন্তু হায়! হাত মাত্র দুটোই। ‘দ্যা ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ এ অবশ্য এমন রক্তপাত সংক্রান্ত ব্যাপার নেই, তবে প্রেমের পরীক্ষা আছে! গল্পের নায়ক ১৭ বছর বয়েসী অগাস্টাস ওয়াটার্স, আর নায়িকা ১৬ বছর বয়েসী হেইজেল গ্রেইস। দু'জনই ক্যান্সার আক্রান্ত। অগাস্টাস এর আগে রোগে এক পা হারিয়েছে, প্রস্থেটিক্স লাগিয়ে হাঁটতে হয় তাকে। হেইজেল গ্রেইসের ক্যান্সার ফুসফুসে। ন্যাসাল ক্যানুলা ছাড়া সে শ্বাস গ্রহণ করতে পারেনা। পাঠকের মনের সহানুভূতিশীল অংশটিতে খোঁচা দেয়া শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে! অগাস্টাস ও হেইজেল এর প্রথম দেখাতেই প্রেম (বিচিত্র কি?), এরপরের পাতা গুলো দুই কিশোর কিশোরীর কোন একজনের মৃত্যুর (কার মৃত্যু সেটি বলে দেয়াটা কোন মতেই সমীচীন হবে না নিশ্চয়ই?) আগ পর্যন্ত তাদের অমর প্রেমের আখ্যান। গল্পটি আমার ভালো লাগেনি। চিরাচরিত ছকে বাঁধা পুতুপুতু প্রেমের উপন্যাস। সবচেয়ে বড় কথা,অগাস্টাস ও হেইজেল, চরিত্র দুটিকে আমার ইংরেজীতে যাকে বলে স্পয়েল্ড ব্র্যাট (Spoiled brat), তা-ই মনে হয়েছে। প্রান্তিক রোগের সুযোগ খোঁজে তারা। “ক’দিন পরেই তো মরে যাবো, ইচ্ছেমতো মঊজ-মাস্তি করে নেই”-চরিত্রগুলোর এ প্রবণতা পছন্দ হয়নি। উপন্যাসটি বড় একটি জনগোষ্ঠী কে কাঁদিয়েছে (বিশেষত নারীমহলকে!) যা আমাকে কিছুটা ভাবিয়েছে। কাল্পনিক চরিত্রের মৃত্যুতে কত অল্পেই মানুষ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে, বাস্তব জীবনের সত্যিকার চরিত্রগুলোর প্রতি এই সহানুভূতি থাকলে হয়তো পৃথিবীটা অন্যরকমই হয়ে যেতো। মানুষ বোধহয় এক ফ্যান্টাসির জগতেই অপরের জন্য কষ্ট পেতে ভালোবাসে, আসল জগতে নয়। কে জানে?
উপন্যাসের কিছু অংশ আমার কাছে আরোপিত মনে হয়েছে। মূল চরিত্রগুলোর ওপর এক ধরনের নায়কোচিত আচরণ বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার দুটি অপ্রিয় অংশ উল্লেখ করছিঃ
(ক) অগাস্টাস ওয়াটার্স এর ঠোঁটে প্রায়ই সিগারেট ঝোলে, তবে সে সিগারেট খায় না। সিগারেট মুখে রেখেও সিগারেটকে সে তার ক্যান্সার বাড়াবার সুযোগ দেয় না।
(খ) হেইজেল গ্রেইস নিরামিষাশী, কারণ সে চায় না খুব বেশী সংখ্যক প্রাণীর মৃত্যুর জন্য সে দায়ী থাকুক।
প্রান্তিক রোগ (Terminal disease) হয়ত সত্যিই যে কোন মানুষকে অনেক পরিণত করে তোলে। যে কোন মুহূর্তই শেষ মুহুর্ত হতে পারে এমন ভয় চলে এলে মন হয়ত সত্যিই অনেক উন্নত চিন্তা করতে থাকে, তবে ১৬-১৭ বছরের ছেলে মেয়ের মুখে এসব পাকা কথা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।
ক্যান্সার আক্রান্ত কিশোর-কিশোরী নিয়ে বই জেনে যে আশাবাদ ছিলো, তা পূরণ হয়নি। দিনশেষে এটা স্রেফ একটা প্রেমেরই উপন্যাস। প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান সমাজে কোন কিছু বিখ্যাত হয়ে গেলেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। তার অনুকরণে অগুনতি আরো অসংখ্য কাজ বেরোয়। প্রান্তিক রোগে আক্রান্ত টিন-এইজারদের প্রেম নিয়ে আরো বই-সিনেমার ঢল নামে কিনা তা দেখার অপেক্ষায় আছি আপাতত! show less
হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এই উপমহাদেশের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য যা তার দেড়শ বছরের ‘ঐতিহ্যে’র গর্বে গরীয়ান! সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দাঙ্গাটি ঘটে গেছে ৯০ এর দশকে, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ধ্বংস হয় অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। নিহত হয় আড়াই হাজার এর মত মানুষ। এই দাঙ্গার সূত্রপাত ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে, বিহারের ভাগলপুর শহরে। লজ্জাকর এই ‘ধর্মযুদ্ধ’ চলাকালীন সময়ের ক্ষুদ্র একটি অংশের গল্প শুনিয়েছেন নারায়ণ সান্যাল তাঁর ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’ বইয়ের প্রথমার্ধে, ‘সন্তান মোর মার’ উপন্যাসিকাটিতে। দাঙ্গার ইতিহাস পড়াটা খুব সুখকর কিছু নয় মোটেও। এটা নির্বোধ কিছু show more মানুষের অবিশ্বাস্য হিংস্রতার ইতিহাস মাত্র। এটা মানুষের অতলস্পর্শী স্বার্থপরতার উপাখ্যান। ‘কাফের নিধন’ এর নামে মুসলিম হিন্দুর ওপর অবলীলায় তলোয়ার এর কোপ বসিয়েছে, হিন্দু জ্বালিয়ে দিয়েছে ‘ব্লাডি বাস্টার্ড’ মুসলিম এর ঘর। দাঙ্গার ছ’মাস পরেও পাওয়া গেছে অর্ধদগ্ধ মনুষ্যদেহাবশেষের স্তূপ। বর্ণনাগুলো যদি বা হৃদয়ে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়, হতাশায় নির্বাক হয়ে যেতে হয় যখন আবিষ্কৃত হয় এই দাঙ্গার অণুঘটক আসলে রাজনৈতিক ক্ষমতার শিখরে চির আসীন হয়ে থাকতে চাওয়া কিছু মানুষ মাত্র। কেবল শারীরিক সাদৃশ্যের জন্যই মানুষ নামধারী এই প্রাণীগুলো স্রেফ নিজেদের স্বার্থের দায়ে, চিন্তা করতে নারাজ গণমানুষকে খেপিয়ে তুলেছে একের পর এক। পরবর্তী নির্বাচনে এই দাঙ্গাকে ইস্যু করে ভোট আদায় করে নিতে হবে তো! সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলাটা খুব সহজ! কেবল নিজেদের পেটের চিন্তায় যে মানুষগুলোর দিন কাটে, তারা কি বুঝবে রাজনীতির কঠিন মারপ্যাঁচ? তারা তো ক্ষমতার দাবা খেলার বোড়ে মাত্র। এক ঘর এক ঘর করে ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে ‘মন্ত্রী’দের চারপাশে অবাধ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবার জন্যই তো তাদের অস্তিত্ব! গবেষণাধর্মী ফিকশন লেখার ক্ষেত্রটিতে নারায়ণ সান্যাল অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’-এ আপন ক্ষমতার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন বরাবরের মতই। ধর্মের বিশ্বাসের পার্থক্য আজ আমাদের মানুষ পরিচয়কে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে। হিন্দু কি মুসলিম, ক্রিশ্চান, বৌদ্ধ কি জৈন, আস্তিক কি নাস্তিক, সবাই মিলে আমরা একটিই তো জাতি, একই গ্রহেরই তো সন্তান। নিজেদের ভেতর এত 'শ্রেনীবিন্যাস' দেখে লেখক তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিশেষে বলেছেন, “যে মূর্খ নির্যাতিত, নিরন্ন, অবহেলিত আমজনতাকে দেখিয়ে নির্লজ্জের মতো আজও প্রশ্ন করছেঃ ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ তাদের মুখের উপর আজও কি বলার সময় আসেনি যেঃ ‘ডুবিছে মানুষ! সন্তান মোর মা’র!’"
১৯৯০ সালের হিন্দু-মুসলিম সেই দাঙ্গা আজও শেষ হয়ে যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই এখন বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও মন্দির ভাঙ্গা চলছে। টিভিতে দেবী প্রতিমার ভাঙ্গা মাথা মাটিতে গড়াতে দেখাটাও প্রায় রুটিন হয়ে গেছে। সেই ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ রাজ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিন্দু মুসলিম এর মাঝে ধর্মের বিভেদ এর বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিলো এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু আর শুয়োরের মাংস মিশিয়ে। জাত যাবার ভয়ে হিন্দু আর মুসলিম কেউই ব্রিটিশ এর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সে বেলায়। উপমহাদেশে এর আগে তো এই দুই ধর্মের মানুষের বিভেদের কথা শোনা যায়নি। ব্রিটিশ শাসকের কূটবুদ্ধির এমনই বিষ, দেড়শ বছর পরে আজও এই বিষ আমাদের সমান ভাবে দংশিয়ে মারছে।
ইদানিং প্রায়ই শোনা যায় দেশ বিদেশের নানা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ ধর্মের পার্থক্যের ফলে উদ্ভূত দাঙ্গা এড়াবার জন্য ধর্মকেই উঠিয়ে দেবার কথা বলছেন! সমস্যাটা ধর্ম করেনি। ধর্মের অজুহাতে মানুষ করেছে। ৪০ বছর আগেও সাদা আর কালো মানুষ এক টেবিলে বসে খেতে পারতোনা। আজ তা পারে, তার কারণ এটি নয় যে, কালো মানুষ শিরিষ কাগজে ঘষে তার বর্ণ সাদা করে ফেলেছে কিংবা সাদা মানুষ গায়ে আলকাতরা ঢেলে কালো হয়ে গেছে। তার কারণ এটিই যে, মানুষ তার দৃষ্টিভঙ্গির ভুলটা ধরতে পেরেছে। পাকিস্তানীরা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে আমাদের ভাষার ও সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণেই। মানুষ এমন এক প্রাণী, সে তার নিজের দিকের পক্ষ ভারী করে ওদিকের পক্ষকে অবদমিত করে রাখতে চায়। আজ আমার এলাকার সব মানুষ লাল জামা পরা শুরু করলে, কাল বোধহয় নীল জামা পরা মানুষগুলোকে তারা একঘরে করে রাখবে!
যার যা ধর্ম তা-ই থাকবে। যে যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায়ই বলতে থাকবে, পাল্টে যাবেনা গায়ের রংয়ের পরিচয়ও। শুধু বদলাতে হবে মানুষের মনের রং। কেবল এই একটি পরিবর্তনই পারে 'হিন্দু না ওরা মুসলিম?' এই হাস্যকর প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দিতে। show less
১৯৯০ সালের হিন্দু-মুসলিম সেই দাঙ্গা আজও শেষ হয়ে যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই এখন বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও মন্দির ভাঙ্গা চলছে। টিভিতে দেবী প্রতিমার ভাঙ্গা মাথা মাটিতে গড়াতে দেখাটাও প্রায় রুটিন হয়ে গেছে। সেই ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ রাজ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিন্দু মুসলিম এর মাঝে ধর্মের বিভেদ এর বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিলো এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু আর শুয়োরের মাংস মিশিয়ে। জাত যাবার ভয়ে হিন্দু আর মুসলিম কেউই ব্রিটিশ এর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সে বেলায়। উপমহাদেশে এর আগে তো এই দুই ধর্মের মানুষের বিভেদের কথা শোনা যায়নি। ব্রিটিশ শাসকের কূটবুদ্ধির এমনই বিষ, দেড়শ বছর পরে আজও এই বিষ আমাদের সমান ভাবে দংশিয়ে মারছে।
ইদানিং প্রায়ই শোনা যায় দেশ বিদেশের নানা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ ধর্মের পার্থক্যের ফলে উদ্ভূত দাঙ্গা এড়াবার জন্য ধর্মকেই উঠিয়ে দেবার কথা বলছেন! সমস্যাটা ধর্ম করেনি। ধর্মের অজুহাতে মানুষ করেছে। ৪০ বছর আগেও সাদা আর কালো মানুষ এক টেবিলে বসে খেতে পারতোনা। আজ তা পারে, তার কারণ এটি নয় যে, কালো মানুষ শিরিষ কাগজে ঘষে তার বর্ণ সাদা করে ফেলেছে কিংবা সাদা মানুষ গায়ে আলকাতরা ঢেলে কালো হয়ে গেছে। তার কারণ এটিই যে, মানুষ তার দৃষ্টিভঙ্গির ভুলটা ধরতে পেরেছে। পাকিস্তানীরা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে আমাদের ভাষার ও সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণেই। মানুষ এমন এক প্রাণী, সে তার নিজের দিকের পক্ষ ভারী করে ওদিকের পক্ষকে অবদমিত করে রাখতে চায়। আজ আমার এলাকার সব মানুষ লাল জামা পরা শুরু করলে, কাল বোধহয় নীল জামা পরা মানুষগুলোকে তারা একঘরে করে রাখবে!
যার যা ধর্ম তা-ই থাকবে। যে যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায়ই বলতে থাকবে, পাল্টে যাবেনা গায়ের রংয়ের পরিচয়ও। শুধু বদলাতে হবে মানুষের মনের রং। কেবল এই একটি পরিবর্তনই পারে 'হিন্দু না ওরা মুসলিম?' এই হাস্যকর প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দিতে। show less
“সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল অপর দুই বাহুর ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান”-বাংলা মধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থার ছাত্র-ছাত্রীরা বিজ্ঞান, ব্যবসা, মানবিক ইত্যাদি ‘শ্রেণীগত পার্থক্য’ভেদে সকলেই নবম শ্রেণীতে ‘পীথাগোরাসের উপপাদ্য’ নামে পরিচিত উপপাদ্য-২৩ পড়ে এসেছেন।
চিত্রের সমকোণী ত্রিভুজের (অর্থাৎ যে ত্রিভুজের একটি বাহু অপর বাহুর সাথে ৯০ ডিগ্রী কোণে অবস্থিত) অতিভুজ c, লম্ব a এবং ভূমি b। পীথাগোরাসের উপপাদ্য অনুসারে a^2 b^2 = c^2। a, b এবং c এর কিছু মান বসিয়ে সমীকরণের দু পাশ সমান করে ফেলা যায়, সবচেয়ে সহজ একটি উদাহরণ হলো:
৩^২ ৪^২ = show more ৫^২
বা, ৯ ১৬ = ২৫
দু হাজার বছরেরও বেশী পুরনো এই উপপাদ্যটি আজ আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হচ্ছে। এই উপপাদ্য দিয়ে টিভিস্ক্রীন/ কম্পিউটার মনিটর নির্মাতা পর্দার আকার মাপছেন, জ্যোতির্বিদ তারার মাঝের দূরত্ব গুনছেন, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ফেজর কারেন্ট হিসেব করছেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার লোড পরিমাপ করছেন, অর্থনীতিবিদ যোগান আর চাহিদার হিসেব মেলাচ্ছেন......মোট কথা, আমাদের আজকের সভ্যতা যে বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে আছে a^2 b^2 = c^2 জাদুকাঠিসরূপ এই সমীকরণটির অকল্পনীয় অবদান। এই উপপাদ্যটি ছাড়া প্রকৌশলবিদ্যার কোন একটি শাখাও সচল নয়! এ লেখার উদ্দেশ্য পীথাগোরাসের বা তাঁর উপপাদ্যের জয়গান গাওয়া নয় (উপপাদ্যটি আদৌ পীথাগোরাসের নিজস্ব উদ্ভাবিত কিছুও নয়! তাঁর জন্মের বহু আগে থেকেই একাধিক সভ্যতা এই উপপাদ্যটির ব্যবহার করে আসছিলো)। পীথাগোরাসের উপপাদ্য বিভিন্ন প্রকৌশল বিদ্যার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে এমনিই গরীয়ান, কিন্তু আরো একটি বিষয় উপপাদ্যের সমীকরণটিকে অনন্য করে তুলেছে। ৩৭৭ বছর আগে, ১৬৩৭ সালে ফরাসী গণিতবিদ পিয়ে দ্যা ফার্মা একটি উপপাদ্য দাঁড় করালেন। “নিম্নোক্ত সমীকরণটির কোন সমাধান পূর্ন সংখ্যায় কখনোই পাওয়া যাবেনাঃ
a^n b^n = c^n যেখানে a, b, c ও n পূর্ণ সংখ্যা ও n এর মান ২ এর চেয়ে বড় যে কোন সংখ্যা"
অর্থাৎ, a^3 b^3 কখনোই c^3 এর সমান হবেনা, a^4 b^4 কখনোই c^4 এর সমান হবেনা……a^100 b^100 কখনই c^100 এর সমান হবেনা……a^9999999999999…….(অসীম) b^9999999999999…….(অসীম) কখনোই c^9999999999999…….(অসীম) এর সমান হবেনা; n এর মান ২ এর ওপর যে কোন পূর্ণ সংখ্যার জন্যই সমীকরণটির কোন সমাধান নেই। “সংখ্যার সংখ্যা কত” এমনটা কেউ বলতে পারবেনা কখনোই। সবচেয়ে বড় শেষ সংখ্যাটির সাথে এক যোগ করে দিলেই আরেকটি নতুন সংখ্যা তৈরী হয়ে যায়। অসীম সংখ্যক সংখ্যার একটি দিয়েও a^n b^n = c^n সমীকরণটির সমাধান করা যাবেনা? বেশ তো, পরখ করে দেখলেই হয়! a, b, c ও n এর বিভিন্ন মান (অবশ্যই পূর্ন সংখ্যায়) নিয়ে একটার পর একটা হিসেব করেই দেখা যাক। কিছুদূর এগোলেই অবশ্য বোঝা যায় কি ভয়ানক দুঃসাধ্য একটি কাজ এটি! চলক বা ভ্যারিয়েবল গুলোর মান বাড়াবার সাথে সাথে হিসেবটাও ভীষণ বড় ও কঠিন হয়ে পড়ে। আজকের দিনে না হয় কম্পিউটার আছে, সেকেন্ডের মাঝে যা লক্ষ লক্ষ হিসেব করে দেবে, ৩৫০ বছর আগে ফার্মা কিভাবে এমন একটি দাবী জানালেন? ফার্মা কি একের পর এক মান হাতে বসিয়ে হিসেব করে দেখেছেন? সেটি বাস্তব সম্মত কোন উপায় নয়। বাকী থাকলো যুক্তির প্রয়োগে উপপাদ্যটি প্রমাণ করা। ফার্মা অত্যন্ত খেয়ালী একজন গণিতবিদ ছিলেন। তিনি ডায়োফেন্টাস এর অ্যারিথমেটিকা বইটি সবসময় বগলদাবা করে রাখতেন এবং কোন থিওরেম তাঁর মাথায় এলে সেটা এই বইয়ের মার্জিন এ লিখে রাখতেন। ফার্মা প্রায় ৩০০ এর মতো সমস্যা লিখে গেছেন এই মার্জিন এ। আলোচ্য সমস্যাটিকে তাঁর শেষ উপপাদ্য বলা হয়ে থাকে। ফার্মা তাঁর অ্যারিথমেটিকা বইয়ের মার্জিনে সমস্যাটি লিখে নিচে লিখেছিলেন, “এই উপপাদ্যটির একটি দারুণ সমাধান আমার জানা আছে, কিন্তু এই মার্জিনটি তা লেখার জন্য যথেষ্ট চওড়া নয়”!
একটি অঙ্ক করতে সর্বোচ্চ কত সময় লাগতে পারে? ১ ঘন্টা? ১ দিন? ১ বছর? ১ যুগ? ফার্মার শেষ এই উপপাদ্যটি ৩৫৮ বছর ধরে পৃথিবীর বড় বড় গণিতবিদদের মুখ ভেংচিয়ে গেছে। ৩৫৮ বছরেও কেউ উপপাদ্যটি প্রমান করতে পারেননি! মাত্রই ১৯ বছর আগে ১৯৯৫ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু উইলস অবশেষে উপপাদ্যটির সমাধান করলেন, দীর্ঘ ৮ বছর যুদ্ধ করবার পর। যে বিপুল গবেষণা ও পড়ালেখা এই সমাধানটির পেছনে বিনিয়োগ করতে হয়েছে উইলস কে, তাকে যুদ্ধ বলাটাই মানায়। “Fermat's Enigma: The Epic Quest to Solve the World's Greatest Mathematical Problem"-বইয়ে সাইমন সিং বিবৃত করেছেন উইলস এর সেই ৮ বছর ব্যাপী সংগ্রাম এর গল্প। সিং এর লেখায় এই বইটি উইলস এর অসাধারণ ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় এর চমৎকার একটি ডকুমেন্টারি হয়ে থাকলো।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর ‘[b:নিউরনে আবারো অনুরণন|17664068|নিউরনে আবারো অনুরণন|Muhammed Zafar Iqbal|https://d.gr-assets.com/books/1411285054s/17664068.jpg|24656264]’ যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা ফার্মা সংক্রান্ত এ তথ্যগুলো আগেই জানেন। জাফর ইকবাল লিখেছিলেন অ্যান্ড্রু উইলস গণিতের খুব আধুনিক কিছু বিষয়ের ব্যবহার করে ফার্মার উপপাদ্যটি প্রমাণ করেছেন, যা ফার্মার সময়ে উদ্ভাবিতই হয়নি। সাইমন সিং খুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন গণিতের নতুন সেই সংযোজনগুলোর কথা। ১০ বছর বয়েসে অ্যান্ড্রু উইলস প্রথম ফার্মার সমস্যার সাথে পরিচিত হন, তখনি তিনি এটি সমাধান করাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলেন। ৩৯ বছর বয়েসে এসে প্রমাণ সম্পন্ন করতে উইলসকে প্রচুর নতুন বিষয় শিখতে হয়েছে। বিষয়গুলো এত চমৎকার যে কিছু প্রাথমিক ধারণা এখানে জুড়ে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা! উইলস এর প্রমাণটি মূলত দাঁড়িয়ে আছে তানিইয়ামা-শিমুরা ধারণা (কঞ্জেকচার) এর ওপর। তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার বলে সকল এলিপ্টিক্ ইকুয়েশন ই মডিউলার ফর্ম! খুব কঠিন হয়ে গেলো কি?
গণিতে x^3 – x^2 = y^2 y এ ধরণের সমীকরণকে বলা হয় এলিপ্টিক্ ইকুয়েশন। একটি সমীকরণের অসীম সংখ্যক সমাধান থাকতে পারে, প্রত্যেকটি নিয়ে আলাদা ভাবে কাজ করতে যাওয়াটা নিতান্ত বোকামী। সমীকরণের সম্ভাব্য সকল সমাধানকে সসীম একটি ছোট্ট স্পেসে প্রকাশ করতে পারলে কাজটা এক্কেবারেই সহজ হয়ে পড়ে। মানুষ ঘড়ি আবিষ্কার করেছে সময়কে একটা ছকে ফেলে কাজ সহজ করে ফেলবার জন্য। ঘড়ি না থাকলে বিশাল বিস্তৃত সময়ের কোন বিন্দুতে আমরা আছি তা কখনো বুঝতেও পারতাম না (এখনও যে খুব পারি তাও নয়, তবু একটা ধারণা অন্তত করতে পারি)। অমুক কাজটা রাতে করে দেবো বললে তা খুব বিভ্রান্তিকর শোনায়, কারণ রাত অনেকগুলো অন্ধকার সময়ের যোগফল; রাতে কখন কাজটা হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়না। রাত ন’টায় করে দেবো বললে মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যায়। সময়ের এই সঠিক পরিমাপের জন্যই মানুষ ঘড়িতে সময়কে ১২ টা ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। সমীকরণ সমাধানের ক্ষেত্রেও এই বুদ্ধি খাটানো যায়।
চিত্রের ঘড়িটি ফাইভ-ক্লক অ্যারিথমেটিক সিস্টেম। ৪ থেকে ১ ঘর সামনে আগালে আমরা ০ এ পৌঁছাই, অর্থাৎ, সাধারণ গাণিতিক হিসেবে যেখানে ৪ ১ = ৫, ফাইভ-ক্লক অ্যারিথমেটিক সিস্টেমে ৪ ১ = ০। ৪ থেকে ২ ঘর সামনে আগালে পৌঁছাই ১ এ। সাধারণ গাণিতিক হিসেবে ৪ ২ = ৬, ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে ৪ ২ = ১…ইত্যাদি।
ওপরে উল্লেখিত x^3 – x^2 = y^2 y সমীকরণটির সমাধান ৪টিঃ
শেষ সমাধানটি (x = 1, y = 4) সাধারণ গাণিতিক হিসেবে ঠিক গ্রহণযোগ্য না হলেও ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে মাপে মাপে মিলে যায়ঃ
x^3 – x^2 = y^2 y
1^3 -1^2 = 4^2 4
1-1 = 16 4
0 = 20
যেহেতু ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে ৫ = ০, ৫ এর সকল গুণিতকও (৫, ১০, ১৫, ২০……) তাই ০ ই হবে। ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে সংখ্যা ছিলো ৫টি (০,১,২,৩,৪), আর সমাধান ছিলো ৪টি, তাই একে E5 = 4 লেখা হয়। যদি ৭ ঘড়ি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো (অর্থাৎ ঘড়িতে দেয়া সংখ্যাগুলো হতো ০,১,২,৩,৪,৫,৬) তাহলে সমাধান হতো ৯টি। এটাকে এখন একটা সিরিজ আকারে লিখে ফেলা যেতে পারেঃ (E সিরিজ)
ইত্যাদি।
এবার আসা যাক মডিউলার ফর্ম এ।
চিত্রের x ও y অক্ষের মাঝে আটকে পড়া বর্গটির রোটেশনাল ও রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি বিদ্যমান, অর্থাৎ বর্গটিকে একই অবস্থানে রেখে উল্টে দিলেও এটি দেখতে একইরকম লাগবে, কোন পরিবর্তন ধরা পড়বেনা, এটি হল রোটেশনাল সিমেট্রি। যদি x এবং y অক্ষ বরাবর দুটি আয়না রেখে বর্গটিকে উল্টে পাল্টে ঘোরানো হয়, তাহলেও মনে হবে বর্গের প্রথম অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি, এটাই রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি। যদি এখন বর্গটিকে ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে সরিয়ে দেয়া হয়, তা হলে x এবং y অক্ষের সাপেক্ষে বর্গের অবস্থানের পরিবর্তনটি স্পষ্ট ধরা পড়বে চোখে, অর্থাৎ এর ট্রান্সলেশনাল সিমেট্রি নেই।
এই চিত্রে এবার অসীম সংখ্যক বর্গ আঁকা হলো, x ও y অক্ষের সাপেক্ষে। এই বর্গগুলোর রোটেশনাল ও রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি তো আছেই, এদের ট্রান্সলেশনাল সিমেট্রিও বিদ্যমান। কারণ, বর্গগুলো কোনভাবে চলতে শুরু করলে অক্ষদুটির সাপেক্ষে কোন বর্গটি কোথায় গেল বা তাদের অবস্থানের আদৌ কোন পরিবর্তন হলো কিনা তা আর বোঝার উপায় থাকবেনা। সবদিক থেকেই অসীম সংখ্যক বর্গগুলোর সিমেট্রি বা সমতা একইরকম থাকবে। এটিকে ঠিক মডিউলার ফর্ম বলা চলেনা, কারণ মডিউলার ফর্ম পাওয়া যায় চার ডিমেনশন এর স্পেসে, আমরা আমাদের তিন ডিমেনশন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা) এর জগতের অভিজ্ঞতা দিয়ে চার ডিমেনশন এর বস্তুর ধারণা করতে পারবোনা। মডিউলার ফর্মের সাথে সিমেট্রির সম্পর্কের বিষয়টি ইঙ্গিত করবার জন্যই বর্গক্ষেত্র সংক্রান্ত আলোচনা এখানে! চার ডিমেনশন এ বাস করা আশ্চর্য সিমেট্রিক মডিউলার ফর্মেরা নির্দিষ্ট কিছু উপকরণ (ইনগ্রেডিয়েন্টস) দিয়ে গঠিত। প্রত্যেকটি মডিউলার ফর্ম ই একে অন্যের চেয়ে আলাদা এই উপকরণের বেশকমের কারণে। উপকরণের সংখ্যানুসারে সাজালে মডিউলার ফর্মের জন্যও একটি সিরিজ পাওয়া যায়, এলিপ্টিক কার্ভের E সিরিজের মতো, একে বলা হয় M সিরিজ। ১৯৫০ এর দশকে দুই জাপানী গণিতবিদ বন্ধু ইয়ুতাকা তানিইয়ামা ও গোরো শিমুরা লক্ষ্য করেন এলিপ্টিক কার্ভের E সিরিজ আর মডিউলার ফর্মের M সিরিজ একেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে, এ থেকে তাঁরা ধারণা করলেন সকল এলিপ্টিক সমীকরণ ই আসলে মডিউলার ফর্ম। তবে এটির পক্ষে কোন প্রমাণ তাঁরা করে যেতে পারেননি, তানিইয়ামা’র অকস্মাৎ আত্নহত্যার দরুন।
তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার দিয়েই যে ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণিত করা যাবে এ ধারণা দিয়েছিলেন জার্মান গণিতবিদ গেরহার্ড ফ্রে। “মনে করা যাক ফার্মার সমস্যাটির একটি সমাধান আছে”-এই অনুমানের পথে হেঁটে ফ্রে এক নতুন ধরণের এলিপ্টিক কার্ভ আবিষ্কার করলেন যা মডিউলার নয়, তানিইয়ামা-শিমুরার কঞ্জেকচারের সরাসরি বিরোধী। অ্যান্ড্রু উইলস যখন আট বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে উপপাদ্যটি প্রমাণ করলেন, তাঁর প্রমাণটি শুধু ফার্মার সমস্যাটির সমাধানের কাজেই আসেনি, বরং তা গণিত ও নাম্বার থিওরির একাধিক শাখার বিস্তারেও বড় ভূমিকা রেখেছে। তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার এখন আর শুধুই একটি কঞ্জেকচার বা অনুমান নয়, এটি একটি স্থাপিত সত্য। গাণিতিক এই তত্ত্বগুলো পরস্পরের সাথে এত দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত, যে শুধু একটির প্রমাণ-ই বাকিগুলোর প্রমাণের জন্য যথেষ্ট, অনেকটা যেন ডমিনো এফেক্টঃ
অ্যান্ড্রু উইলস বেশ কিছু আধুনিক গাণিতিক হাতিয়ারে নিজেকে সজ্জিত করে ফার্মার উপপাদ্যটি প্রমাণ করেন। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো আইওয়াসাওয়া থিওরী ও কোলিভাগিন-ফ্ল্যাখ মেথড। সদ্য রপ্ত এই বিদ্যাগুলোর প্রয়োগের বেলায় উইলসকে প্রায়ই প্রচন্ড হতাশাজনক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এই টেকনিকগুলো কত কঠিন সে বিষয়ে উইলস বলেছেন সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রাপ্ত একজন পেশাদার গণিতবিদেরও এই বিষয়গুলো আয়ত্তে আনতে অন্তত দু-তিন মাস লাগবেই! ফার্মার সমস্যাটির জটিলতার আরেকটি নির্দেশক এটি।
১৬৩৭ সালে তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচারের অস্তিত্ব ছিলোনা। ছিলোনা কোলিভাগিন-ফ্ল্যাখ মেথড, আইওয়াসাওয়া থিওরী, মডিউলার ফর্ম, মিয়াওকা অসমতা-এসবের কিছুই। মাত্র ১টি গাণিতিক সমস্যার প্রমাণে ১৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে এতগুলো টেকনিকের ব্যবহার ইতিহাস আগে কখনো দেখেনি। উইলস এর এই প্রমাণটি ফার্মার আসল প্রমাণ নয়। ফার্মা কি আদৌ তাঁর সমস্যাটির সমাধান বের করেছিলেন? এক সময় হয়তো এই রহস্যেরও সমাধান হবে, হয়তো আরো অনেক সহজ কোন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হবে, তবু অ্যান্ড্রু উইলস এর ১টিই অঙ্ক কষার পেছনে ৮ বছরের পরিশ্রমের গল্প চির অম্লান থাকবে। গণিতের সাথে মোটেই সম্পৃক্ত নয় এমন অনেকেই ৮ বছর লাগিয়ে একটি অঙ্ক করার হাস্যকর দিকটি বের করে উইলসকে নিয়ে নিয়মিত তামাশা করেছে। যে পরিমাণ পরিশ্রম ও লেখাপড়া উইলসকে করতে হয়েছে তার সম্পর্কে কোন ধারণাই হয়তো এই মানুষগুলোর কখনোই হবেনা। মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের এ আচরণগুলো মেনে নেয়াটা প্রচণ্ড কষ্টকর ও হতাশাদায়ক এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানুষকে সম্মান করার ব্যাপারে মনকে সন্দিহান করে তোলে, সন্দেহ নেই, তবু উইলস এর গল্প শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, মানুষ ই তো পারে! show less
চিত্রের সমকোণী ত্রিভুজের (অর্থাৎ যে ত্রিভুজের একটি বাহু অপর বাহুর সাথে ৯০ ডিগ্রী কোণে অবস্থিত) অতিভুজ c, লম্ব a এবং ভূমি b। পীথাগোরাসের উপপাদ্য অনুসারে a^2 b^2 = c^2। a, b এবং c এর কিছু মান বসিয়ে সমীকরণের দু পাশ সমান করে ফেলা যায়, সবচেয়ে সহজ একটি উদাহরণ হলো:
৩^২ ৪^২ = show more ৫^২
বা, ৯ ১৬ = ২৫
দু হাজার বছরেরও বেশী পুরনো এই উপপাদ্যটি আজ আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হচ্ছে। এই উপপাদ্য দিয়ে টিভিস্ক্রীন/ কম্পিউটার মনিটর নির্মাতা পর্দার আকার মাপছেন, জ্যোতির্বিদ তারার মাঝের দূরত্ব গুনছেন, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ফেজর কারেন্ট হিসেব করছেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার লোড পরিমাপ করছেন, অর্থনীতিবিদ যোগান আর চাহিদার হিসেব মেলাচ্ছেন......মোট কথা, আমাদের আজকের সভ্যতা যে বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে আছে a^2 b^2 = c^2 জাদুকাঠিসরূপ এই সমীকরণটির অকল্পনীয় অবদান। এই উপপাদ্যটি ছাড়া প্রকৌশলবিদ্যার কোন একটি শাখাও সচল নয়! এ লেখার উদ্দেশ্য পীথাগোরাসের বা তাঁর উপপাদ্যের জয়গান গাওয়া নয় (উপপাদ্যটি আদৌ পীথাগোরাসের নিজস্ব উদ্ভাবিত কিছুও নয়! তাঁর জন্মের বহু আগে থেকেই একাধিক সভ্যতা এই উপপাদ্যটির ব্যবহার করে আসছিলো)। পীথাগোরাসের উপপাদ্য বিভিন্ন প্রকৌশল বিদ্যার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে এমনিই গরীয়ান, কিন্তু আরো একটি বিষয় উপপাদ্যের সমীকরণটিকে অনন্য করে তুলেছে। ৩৭৭ বছর আগে, ১৬৩৭ সালে ফরাসী গণিতবিদ পিয়ে দ্যা ফার্মা একটি উপপাদ্য দাঁড় করালেন। “নিম্নোক্ত সমীকরণটির কোন সমাধান পূর্ন সংখ্যায় কখনোই পাওয়া যাবেনাঃ
a^n b^n = c^n যেখানে a, b, c ও n পূর্ণ সংখ্যা ও n এর মান ২ এর চেয়ে বড় যে কোন সংখ্যা"
অর্থাৎ, a^3 b^3 কখনোই c^3 এর সমান হবেনা, a^4 b^4 কখনোই c^4 এর সমান হবেনা……a^100 b^100 কখনই c^100 এর সমান হবেনা……a^9999999999999…….(অসীম) b^9999999999999…….(অসীম) কখনোই c^9999999999999…….(অসীম) এর সমান হবেনা; n এর মান ২ এর ওপর যে কোন পূর্ণ সংখ্যার জন্যই সমীকরণটির কোন সমাধান নেই। “সংখ্যার সংখ্যা কত” এমনটা কেউ বলতে পারবেনা কখনোই। সবচেয়ে বড় শেষ সংখ্যাটির সাথে এক যোগ করে দিলেই আরেকটি নতুন সংখ্যা তৈরী হয়ে যায়। অসীম সংখ্যক সংখ্যার একটি দিয়েও a^n b^n = c^n সমীকরণটির সমাধান করা যাবেনা? বেশ তো, পরখ করে দেখলেই হয়! a, b, c ও n এর বিভিন্ন মান (অবশ্যই পূর্ন সংখ্যায়) নিয়ে একটার পর একটা হিসেব করেই দেখা যাক। কিছুদূর এগোলেই অবশ্য বোঝা যায় কি ভয়ানক দুঃসাধ্য একটি কাজ এটি! চলক বা ভ্যারিয়েবল গুলোর মান বাড়াবার সাথে সাথে হিসেবটাও ভীষণ বড় ও কঠিন হয়ে পড়ে। আজকের দিনে না হয় কম্পিউটার আছে, সেকেন্ডের মাঝে যা লক্ষ লক্ষ হিসেব করে দেবে, ৩৫০ বছর আগে ফার্মা কিভাবে এমন একটি দাবী জানালেন? ফার্মা কি একের পর এক মান হাতে বসিয়ে হিসেব করে দেখেছেন? সেটি বাস্তব সম্মত কোন উপায় নয়। বাকী থাকলো যুক্তির প্রয়োগে উপপাদ্যটি প্রমাণ করা। ফার্মা অত্যন্ত খেয়ালী একজন গণিতবিদ ছিলেন। তিনি ডায়োফেন্টাস এর অ্যারিথমেটিকা বইটি সবসময় বগলদাবা করে রাখতেন এবং কোন থিওরেম তাঁর মাথায় এলে সেটা এই বইয়ের মার্জিন এ লিখে রাখতেন। ফার্মা প্রায় ৩০০ এর মতো সমস্যা লিখে গেছেন এই মার্জিন এ। আলোচ্য সমস্যাটিকে তাঁর শেষ উপপাদ্য বলা হয়ে থাকে। ফার্মা তাঁর অ্যারিথমেটিকা বইয়ের মার্জিনে সমস্যাটি লিখে নিচে লিখেছিলেন, “এই উপপাদ্যটির একটি দারুণ সমাধান আমার জানা আছে, কিন্তু এই মার্জিনটি তা লেখার জন্য যথেষ্ট চওড়া নয়”!
একটি অঙ্ক করতে সর্বোচ্চ কত সময় লাগতে পারে? ১ ঘন্টা? ১ দিন? ১ বছর? ১ যুগ? ফার্মার শেষ এই উপপাদ্যটি ৩৫৮ বছর ধরে পৃথিবীর বড় বড় গণিতবিদদের মুখ ভেংচিয়ে গেছে। ৩৫৮ বছরেও কেউ উপপাদ্যটি প্রমান করতে পারেননি! মাত্রই ১৯ বছর আগে ১৯৯৫ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু উইলস অবশেষে উপপাদ্যটির সমাধান করলেন, দীর্ঘ ৮ বছর যুদ্ধ করবার পর। যে বিপুল গবেষণা ও পড়ালেখা এই সমাধানটির পেছনে বিনিয়োগ করতে হয়েছে উইলস কে, তাকে যুদ্ধ বলাটাই মানায়। “Fermat's Enigma: The Epic Quest to Solve the World's Greatest Mathematical Problem"-বইয়ে সাইমন সিং বিবৃত করেছেন উইলস এর সেই ৮ বছর ব্যাপী সংগ্রাম এর গল্প। সিং এর লেখায় এই বইটি উইলস এর অসাধারণ ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় এর চমৎকার একটি ডকুমেন্টারি হয়ে থাকলো।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর ‘[b:নিউরনে আবারো অনুরণন|17664068|নিউরনে আবারো অনুরণন|Muhammed Zafar Iqbal|https://d.gr-assets.com/books/1411285054s/17664068.jpg|24656264]’ যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা ফার্মা সংক্রান্ত এ তথ্যগুলো আগেই জানেন। জাফর ইকবাল লিখেছিলেন অ্যান্ড্রু উইলস গণিতের খুব আধুনিক কিছু বিষয়ের ব্যবহার করে ফার্মার উপপাদ্যটি প্রমাণ করেছেন, যা ফার্মার সময়ে উদ্ভাবিতই হয়নি। সাইমন সিং খুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন গণিতের নতুন সেই সংযোজনগুলোর কথা। ১০ বছর বয়েসে অ্যান্ড্রু উইলস প্রথম ফার্মার সমস্যার সাথে পরিচিত হন, তখনি তিনি এটি সমাধান করাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলেন। ৩৯ বছর বয়েসে এসে প্রমাণ সম্পন্ন করতে উইলসকে প্রচুর নতুন বিষয় শিখতে হয়েছে। বিষয়গুলো এত চমৎকার যে কিছু প্রাথমিক ধারণা এখানে জুড়ে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা! উইলস এর প্রমাণটি মূলত দাঁড়িয়ে আছে তানিইয়ামা-শিমুরা ধারণা (কঞ্জেকচার) এর ওপর। তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার বলে সকল এলিপ্টিক্ ইকুয়েশন ই মডিউলার ফর্ম! খুব কঠিন হয়ে গেলো কি?
গণিতে x^3 – x^2 = y^2 y এ ধরণের সমীকরণকে বলা হয় এলিপ্টিক্ ইকুয়েশন। একটি সমীকরণের অসীম সংখ্যক সমাধান থাকতে পারে, প্রত্যেকটি নিয়ে আলাদা ভাবে কাজ করতে যাওয়াটা নিতান্ত বোকামী। সমীকরণের সম্ভাব্য সকল সমাধানকে সসীম একটি ছোট্ট স্পেসে প্রকাশ করতে পারলে কাজটা এক্কেবারেই সহজ হয়ে পড়ে। মানুষ ঘড়ি আবিষ্কার করেছে সময়কে একটা ছকে ফেলে কাজ সহজ করে ফেলবার জন্য। ঘড়ি না থাকলে বিশাল বিস্তৃত সময়ের কোন বিন্দুতে আমরা আছি তা কখনো বুঝতেও পারতাম না (এখনও যে খুব পারি তাও নয়, তবু একটা ধারণা অন্তত করতে পারি)। অমুক কাজটা রাতে করে দেবো বললে তা খুব বিভ্রান্তিকর শোনায়, কারণ রাত অনেকগুলো অন্ধকার সময়ের যোগফল; রাতে কখন কাজটা হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়না। রাত ন’টায় করে দেবো বললে মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যায়। সময়ের এই সঠিক পরিমাপের জন্যই মানুষ ঘড়িতে সময়কে ১২ টা ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। সমীকরণ সমাধানের ক্ষেত্রেও এই বুদ্ধি খাটানো যায়।
চিত্রের ঘড়িটি ফাইভ-ক্লক অ্যারিথমেটিক সিস্টেম। ৪ থেকে ১ ঘর সামনে আগালে আমরা ০ এ পৌঁছাই, অর্থাৎ, সাধারণ গাণিতিক হিসেবে যেখানে ৪ ১ = ৫, ফাইভ-ক্লক অ্যারিথমেটিক সিস্টেমে ৪ ১ = ০। ৪ থেকে ২ ঘর সামনে আগালে পৌঁছাই ১ এ। সাধারণ গাণিতিক হিসেবে ৪ ২ = ৬, ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে ৪ ২ = ১…ইত্যাদি।
ওপরে উল্লেখিত x^3 – x^2 = y^2 y সমীকরণটির সমাধান ৪টিঃ
x = 0, y = 0
x = 0, y = 4
x = 1, y = 0
x = 1, y = 4
শেষ সমাধানটি (x = 1, y = 4) সাধারণ গাণিতিক হিসেবে ঠিক গ্রহণযোগ্য না হলেও ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে মাপে মাপে মিলে যায়ঃ
x^3 – x^2 = y^2 y
1^3 -1^2 = 4^2 4
1-1 = 16 4
0 = 20
যেহেতু ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে ৫ = ০, ৫ এর সকল গুণিতকও (৫, ১০, ১৫, ২০……) তাই ০ ই হবে। ৫-ঘড়ি পদ্ধতিতে সংখ্যা ছিলো ৫টি (০,১,২,৩,৪), আর সমাধান ছিলো ৪টি, তাই একে E5 = 4 লেখা হয়। যদি ৭ ঘড়ি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো (অর্থাৎ ঘড়িতে দেয়া সংখ্যাগুলো হতো ০,১,২,৩,৪,৫,৬) তাহলে সমাধান হতো ৯টি। এটাকে এখন একটা সিরিজ আকারে লিখে ফেলা যেতে পারেঃ (E সিরিজ)
ইত্যাদি।
এবার আসা যাক মডিউলার ফর্ম এ।
চিত্রের x ও y অক্ষের মাঝে আটকে পড়া বর্গটির রোটেশনাল ও রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি বিদ্যমান, অর্থাৎ বর্গটিকে একই অবস্থানে রেখে উল্টে দিলেও এটি দেখতে একইরকম লাগবে, কোন পরিবর্তন ধরা পড়বেনা, এটি হল রোটেশনাল সিমেট্রি। যদি x এবং y অক্ষ বরাবর দুটি আয়না রেখে বর্গটিকে উল্টে পাল্টে ঘোরানো হয়, তাহলেও মনে হবে বর্গের প্রথম অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি, এটাই রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি। যদি এখন বর্গটিকে ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে সরিয়ে দেয়া হয়, তা হলে x এবং y অক্ষের সাপেক্ষে বর্গের অবস্থানের পরিবর্তনটি স্পষ্ট ধরা পড়বে চোখে, অর্থাৎ এর ট্রান্সলেশনাল সিমেট্রি নেই।
এই চিত্রে এবার অসীম সংখ্যক বর্গ আঁকা হলো, x ও y অক্ষের সাপেক্ষে। এই বর্গগুলোর রোটেশনাল ও রিফ্লেকশনাল সিমেট্রি তো আছেই, এদের ট্রান্সলেশনাল সিমেট্রিও বিদ্যমান। কারণ, বর্গগুলো কোনভাবে চলতে শুরু করলে অক্ষদুটির সাপেক্ষে কোন বর্গটি কোথায় গেল বা তাদের অবস্থানের আদৌ কোন পরিবর্তন হলো কিনা তা আর বোঝার উপায় থাকবেনা। সবদিক থেকেই অসীম সংখ্যক বর্গগুলোর সিমেট্রি বা সমতা একইরকম থাকবে। এটিকে ঠিক মডিউলার ফর্ম বলা চলেনা, কারণ মডিউলার ফর্ম পাওয়া যায় চার ডিমেনশন এর স্পেসে, আমরা আমাদের তিন ডিমেনশন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা) এর জগতের অভিজ্ঞতা দিয়ে চার ডিমেনশন এর বস্তুর ধারণা করতে পারবোনা। মডিউলার ফর্মের সাথে সিমেট্রির সম্পর্কের বিষয়টি ইঙ্গিত করবার জন্যই বর্গক্ষেত্র সংক্রান্ত আলোচনা এখানে! চার ডিমেনশন এ বাস করা আশ্চর্য সিমেট্রিক মডিউলার ফর্মেরা নির্দিষ্ট কিছু উপকরণ (ইনগ্রেডিয়েন্টস) দিয়ে গঠিত। প্রত্যেকটি মডিউলার ফর্ম ই একে অন্যের চেয়ে আলাদা এই উপকরণের বেশকমের কারণে। উপকরণের সংখ্যানুসারে সাজালে মডিউলার ফর্মের জন্যও একটি সিরিজ পাওয়া যায়, এলিপ্টিক কার্ভের E সিরিজের মতো, একে বলা হয় M সিরিজ। ১৯৫০ এর দশকে দুই জাপানী গণিতবিদ বন্ধু ইয়ুতাকা তানিইয়ামা ও গোরো শিমুরা লক্ষ্য করেন এলিপ্টিক কার্ভের E সিরিজ আর মডিউলার ফর্মের M সিরিজ একেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে, এ থেকে তাঁরা ধারণা করলেন সকল এলিপ্টিক সমীকরণ ই আসলে মডিউলার ফর্ম। তবে এটির পক্ষে কোন প্রমাণ তাঁরা করে যেতে পারেননি, তানিইয়ামা’র অকস্মাৎ আত্নহত্যার দরুন।
তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার দিয়েই যে ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণিত করা যাবে এ ধারণা দিয়েছিলেন জার্মান গণিতবিদ গেরহার্ড ফ্রে। “মনে করা যাক ফার্মার সমস্যাটির একটি সমাধান আছে”-এই অনুমানের পথে হেঁটে ফ্রে এক নতুন ধরণের এলিপ্টিক কার্ভ আবিষ্কার করলেন যা মডিউলার নয়, তানিইয়ামা-শিমুরার কঞ্জেকচারের সরাসরি বিরোধী। অ্যান্ড্রু উইলস যখন আট বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে উপপাদ্যটি প্রমাণ করলেন, তাঁর প্রমাণটি শুধু ফার্মার সমস্যাটির সমাধানের কাজেই আসেনি, বরং তা গণিত ও নাম্বার থিওরির একাধিক শাখার বিস্তারেও বড় ভূমিকা রেখেছে। তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচার এখন আর শুধুই একটি কঞ্জেকচার বা অনুমান নয়, এটি একটি স্থাপিত সত্য। গাণিতিক এই তত্ত্বগুলো পরস্পরের সাথে এত দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত, যে শুধু একটির প্রমাণ-ই বাকিগুলোর প্রমাণের জন্য যথেষ্ট, অনেকটা যেন ডমিনো এফেক্টঃ
অ্যান্ড্রু উইলস বেশ কিছু আধুনিক গাণিতিক হাতিয়ারে নিজেকে সজ্জিত করে ফার্মার উপপাদ্যটি প্রমাণ করেন। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো আইওয়াসাওয়া থিওরী ও কোলিভাগিন-ফ্ল্যাখ মেথড। সদ্য রপ্ত এই বিদ্যাগুলোর প্রয়োগের বেলায় উইলসকে প্রায়ই প্রচন্ড হতাশাজনক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এই টেকনিকগুলো কত কঠিন সে বিষয়ে উইলস বলেছেন সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রাপ্ত একজন পেশাদার গণিতবিদেরও এই বিষয়গুলো আয়ত্তে আনতে অন্তত দু-তিন মাস লাগবেই! ফার্মার সমস্যাটির জটিলতার আরেকটি নির্দেশক এটি।
১৬৩৭ সালে তানিইয়ামা-শিমুরা কঞ্জেকচারের অস্তিত্ব ছিলোনা। ছিলোনা কোলিভাগিন-ফ্ল্যাখ মেথড, আইওয়াসাওয়া থিওরী, মডিউলার ফর্ম, মিয়াওকা অসমতা-এসবের কিছুই। মাত্র ১টি গাণিতিক সমস্যার প্রমাণে ১৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে এতগুলো টেকনিকের ব্যবহার ইতিহাস আগে কখনো দেখেনি। উইলস এর এই প্রমাণটি ফার্মার আসল প্রমাণ নয়। ফার্মা কি আদৌ তাঁর সমস্যাটির সমাধান বের করেছিলেন? এক সময় হয়তো এই রহস্যেরও সমাধান হবে, হয়তো আরো অনেক সহজ কোন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হবে, তবু অ্যান্ড্রু উইলস এর ১টিই অঙ্ক কষার পেছনে ৮ বছরের পরিশ্রমের গল্প চির অম্লান থাকবে। গণিতের সাথে মোটেই সম্পৃক্ত নয় এমন অনেকেই ৮ বছর লাগিয়ে একটি অঙ্ক করার হাস্যকর দিকটি বের করে উইলসকে নিয়ে নিয়মিত তামাশা করেছে। যে পরিমাণ পরিশ্রম ও লেখাপড়া উইলসকে করতে হয়েছে তার সম্পর্কে কোন ধারণাই হয়তো এই মানুষগুলোর কখনোই হবেনা। মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের এ আচরণগুলো মেনে নেয়াটা প্রচণ্ড কষ্টকর ও হতাশাদায়ক এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানুষকে সম্মান করার ব্যাপারে মনকে সন্দিহান করে তোলে, সন্দেহ নেই, তবু উইলস এর গল্প শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, মানুষ ই তো পারে! show less
“Karma is a Bitch!”-they say. But that expression has been in use for some time, and isn’t it a little too cliché for some of us? Also, let’s not forget that this rather silly statement fails horrendously when it comes to illustrate this canine nature of Karma. Upon looking into the greatest answering tool man has ever devised, Google, I happened to find the perfect, self-explanatory and eloquent-if not beautiful-Karma quote. It goes like this:
Virtue’s victory over Vice; probably human kind’s most favorite subject for making stories. From religious texts to fifth grader’s class essay, everywhere Nemesis pays back the Bad Guy. Fairy tales are probably the simplest of the formats to depict Virtue’s victory; the dragon always gets slain, the bad witch melts down, the jealous bad prince becomes a toad…all these lead to one single conclusion: in the end the Good King lived happily ever after. Rather predictive, eh? We know even before watching a film that the villain will eventually succumb to defeat. But that doesn’t restrict us from enjoying the movie, not a bit. Because, it’s not WHAT but HOW that matters. It’s a curious world we live in and there are about infinitely many ways to die (or at least, get punished) and we hold our breath till the last minute to know HOW the antagonist show more gets his butt kicked. Very often, that twist of fate defines the story whether it’s good or Hannah Montana.
‘Poetic Justice’ is a collection of 11 short stories from the Australian writer Helen Murray. They portray the classic battle between Virtue and Vice; in other words, 11 different ways Karma bites the wrong doers with her deadly fangs. These stories showcase Murray’s great skill of storytelling. But that’s not her only mastery. The term Poetic Justice is used in pop-culture to mean how the twist of fate ironically punishes the wrong doers and rewards the righteous ones. Helen Murray maintains that ironic tone very cleverly and in most of the stories, the climax is not reached until the very last sentence. These stories bear the sign of her gifted sense of humor and reflect her knowledge in various subjects ranging from art to history. A must have trait of a writer.
Writing a review of Helen Murray’s stories is one difficult task. One has to make sure that he is not destroying the experience of being surprised by these stories. It is a very uneven path to walk on and I won’t even try it. Instead, I will recount an event from my life that I believe is the perfect allegory for Poetic Justice. This event of my life might just give the readers the very essence of Murray’s stories!
It happened a few years back, when I was having this amazing-almost providential-session with a bunch of pot smokers. I am not the best guitar player around, but for a Cannabis influenced person, I am Ritchie Blackmore! (That explains my presence in the herd. My guitar strokes were supposed to intensify their euphoria). There I met an extraordinary character who stole the show from me. He said he makes money only by talking. “Okay! How so?”-we asked. In reply, he produced his wallet from the depth of his pocket, unfolded it, opened a secret chamber and out came mobile sim cards-at least 20 of them! Indeed, talking was his talent. Now, some of us are probably aware of the fact that Cannabis makes people talk, and often truthful! I can’t tell for sure if it’s the Cannabis Effect or his vanity, his self-confidence that made him talk about his secret life to us. In short, his business was befriending guys on the phone, pretending to be a girl. Initially it was fun, but when those gullible chaps started offering gifts-ranging from mobile hand set to expensive jewelry-he discovered a great way of making a good living. When we implored in the most earnest fashion, he agreed to perform before us and made a call to one of his favorite victims, who sent him (or her!) a diamond necklace just a week back. The necklace costed the poor chap 45,000 Taka in Bangladeshi currency (US$ 580). The best and the most convincing female character played by a male actor I have seen so far is Dustin Hoffman’s Tootsie. Our guy was no Dustin Hoffman, but he was good enough for swindling a lustful half literate floating businessman who has got hots for rich gals. His sudden change in voice, the cadence, the surge of emotion was astounding. On the phone he was not himself anymore. He was totally submerged in the character of a sexually objectified girl.
I was curious how he manages this enterprise. Upon my query, he provided me with the best solution “I never receive calls from unknown numbers. If someone just randomly tries me on the phone, and I don’t receive, how long should he wait? He should be tired in a month and would go for another random number. But if someone keep trying me on the phone for months after months, it’s gotta be one of my victims.” Simple and elegant.
When I contemplated the whole business I couldn’t really find him guilty! Isn't he just taking the advantage of those immoral bastards who get sexually aroused only by talking to an unknown female voice? Isn't he an incarnation of Nemesis herself to inflict retribution on them? Isn't it just? And isn't it poetic enough? I shared this story with many of my friends and many a times I was opposed for my stand in this matter. But come hell or water, it will always remain a Poetic Justice for me. Period. show less
“Karma is like 69: you get what you give”A little sexual innuendo often comes handy. They save you a lot of words, and most importantly, everyone understands them!
Virtue’s victory over Vice; probably human kind’s most favorite subject for making stories. From religious texts to fifth grader’s class essay, everywhere Nemesis pays back the Bad Guy. Fairy tales are probably the simplest of the formats to depict Virtue’s victory; the dragon always gets slain, the bad witch melts down, the jealous bad prince becomes a toad…all these lead to one single conclusion: in the end the Good King lived happily ever after. Rather predictive, eh? We know even before watching a film that the villain will eventually succumb to defeat. But that doesn’t restrict us from enjoying the movie, not a bit. Because, it’s not WHAT but HOW that matters. It’s a curious world we live in and there are about infinitely many ways to die (or at least, get punished) and we hold our breath till the last minute to know HOW the antagonist show more gets his butt kicked. Very often, that twist of fate defines the story whether it’s good or Hannah Montana.
‘Poetic Justice’ is a collection of 11 short stories from the Australian writer Helen Murray. They portray the classic battle between Virtue and Vice; in other words, 11 different ways Karma bites the wrong doers with her deadly fangs. These stories showcase Murray’s great skill of storytelling. But that’s not her only mastery. The term Poetic Justice is used in pop-culture to mean how the twist of fate ironically punishes the wrong doers and rewards the righteous ones. Helen Murray maintains that ironic tone very cleverly and in most of the stories, the climax is not reached until the very last sentence. These stories bear the sign of her gifted sense of humor and reflect her knowledge in various subjects ranging from art to history. A must have trait of a writer.
Writing a review of Helen Murray’s stories is one difficult task. One has to make sure that he is not destroying the experience of being surprised by these stories. It is a very uneven path to walk on and I won’t even try it. Instead, I will recount an event from my life that I believe is the perfect allegory for Poetic Justice. This event of my life might just give the readers the very essence of Murray’s stories!
It happened a few years back, when I was having this amazing-almost providential-session with a bunch of pot smokers. I am not the best guitar player around, but for a Cannabis influenced person, I am Ritchie Blackmore! (That explains my presence in the herd. My guitar strokes were supposed to intensify their euphoria). There I met an extraordinary character who stole the show from me. He said he makes money only by talking. “Okay! How so?”-we asked. In reply, he produced his wallet from the depth of his pocket, unfolded it, opened a secret chamber and out came mobile sim cards-at least 20 of them! Indeed, talking was his talent. Now, some of us are probably aware of the fact that Cannabis makes people talk, and often truthful! I can’t tell for sure if it’s the Cannabis Effect or his vanity, his self-confidence that made him talk about his secret life to us. In short, his business was befriending guys on the phone, pretending to be a girl. Initially it was fun, but when those gullible chaps started offering gifts-ranging from mobile hand set to expensive jewelry-he discovered a great way of making a good living. When we implored in the most earnest fashion, he agreed to perform before us and made a call to one of his favorite victims, who sent him (or her!) a diamond necklace just a week back. The necklace costed the poor chap 45,000 Taka in Bangladeshi currency (US$ 580). The best and the most convincing female character played by a male actor I have seen so far is Dustin Hoffman’s Tootsie. Our guy was no Dustin Hoffman, but he was good enough for swindling a lustful half literate floating businessman who has got hots for rich gals. His sudden change in voice, the cadence, the surge of emotion was astounding. On the phone he was not himself anymore. He was totally submerged in the character of a sexually objectified girl.
I was curious how he manages this enterprise. Upon my query, he provided me with the best solution “I never receive calls from unknown numbers. If someone just randomly tries me on the phone, and I don’t receive, how long should he wait? He should be tired in a month and would go for another random number. But if someone keep trying me on the phone for months after months, it’s gotta be one of my victims.” Simple and elegant.
When I contemplated the whole business I couldn’t really find him guilty! Isn't he just taking the advantage of those immoral bastards who get sexually aroused only by talking to an unknown female voice? Isn't he an incarnation of Nemesis herself to inflict retribution on them? Isn't it just? And isn't it poetic enough? I shared this story with many of my friends and many a times I was opposed for my stand in this matter. But come hell or water, it will always remain a Poetic Justice for me. Period. show less
আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় অনেকগুলো শ্রেণীগত বিভাজন আছে। পরিচয় পত্রে নামের পাশে ‘পেশা’র ফাঁকা জায়গাটায় মানুষ ব্যক্তিভেদে ‘ছাত্র’, ‘রাজনীতিক’, ‘শ্রমিক’, ‘কৃষক’, ‘ব্যবসায়ী’ ইত্যাদি লিখে পূরণ করে। এদের সবার সামাজিক অবস্থা ও মর্যাদা এক নয়, সবার সামাজিক সুবিধাগুলোও সমান নয়। এত সব শ্রেণীবিভাজনের বেড়াজাল থেকেও পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়! মালিক ও শ্রমিক। এক দল মানুষ নতুন নতুন কারখানা বানিয়ে তাতে টাকা খাটিয়ে দ্বিগুণ-চতুর্গুণ টাকা বানিয়ে আনছে, আরেক দল মানুষ এইসব কারখানায় উদয়াস্ত খেটে ন্যুনতম মজুরি পেয়ে হৃৎপিণ্ডের রক্ত সরবরাহের show more প্রক্রিয়াটিকে কোনমতে টিকিয়ে রেখেছে। সমাজের এই দুই শ্রেণীর মানুষের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এই কাজের ধারা শুধু আজকের দিনেরই কোন ঘটনা নয়। কৃষিকাজ ও ক্রীতদাস প্রথার মাধ্যমে মানবসভ্যতায় অর্থনীতির সূচনা। এরপরের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস শুধুই শ্রমিক ও মালিক-এই দুই শ্রেণীর মানুষের পারস্পরিক টানাপোড়েন এর সম্পর্কের ইতিহাস, কেতাবী ভাষায় যাকে বলে ‘বুর্জোয়া (ধনিক শ্রেণী)-প্রলেতারিয়েত (মেহনতি শ্রেণী) শ্রেণী সংগ্রাম’। কারখানার মালিকেরা সব যুগেই শ্রমিকদের সবচেয়ে কম পয়সায় সবচেয়ে বেশী খাটিয়ে দরকারী কাজটুকু আদায় করে নিয়েছে; জমিদারেরা যেমন একইভাবে খাটিয়ে গেছে তাদের জমিতে বর্গা নেয়া কৃষকদের। এক পক্ষীয় নিষ্পেষণ আসলে খুব বেশী দিন চলতে পারেনা। এক সময় শ্রমিক-কৃষকরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হল। অর্থনীতি ও দর্শন শাস্ত্রের নতুন নতুন শাখা উদ্ভাবিত হল। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিড্ররিখ এঙ্গেলস ধারণা দিলেন ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’। এ এক নতুন সমাজ যেখানে মুনাফা ভোগকারী কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবেনা। সমাজের যে কোন অংশের উন্নতি অন্য অংশগুলোকেও উন্নত করে তুলবে, কোন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবেনা, থাকবেনা ব্যক্তিবিশেষের মালিকানাধীন কোন কারখানা। ‘ব্যবসায়ী’, ‘চাকুরে’, ‘ছাত্র’, ‘শ্রমিক’, ‘মেথর’, ‘অর্থনীতিবিদ’-ইত্যাদি পরিচয়গুলোর মাঝের মর্যাদার পার্থক্য বিলীন হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবীর শ্রমিক সমাজে সমাজবাদ অত্যন্ত সাদরে গৃহীত হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই গ্রহের অনেক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশকেই এলোমেলো করে দিয়েছিলো মার্ক্স-এঙ্গেলস এর এই ধারণা। ভ্লাদিমির লেনিনের রাশিয়াতে সমাজবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, হয়েছিলো মাও সে তুং এর চীনেও। দক্ষিণ আমেরিকাতেও আছে সমাজবাদ। বাংলাদেশ-ই বা বাদ থাকবে কেন? বিগত দশকগুলোতে সমাজবাদ প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো বাংলাদেশেও। আমাদের দেশের বহু বুদ্ধিজীবী-লেখক-দার্শনিক সমাজবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন গভীরভাবে। তাঁরা অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন অন্যদেরও। কৃষক শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের মহান উদ্দেশ্যে লেখালেখি করেছেন বিস্তর। বদরুদ্দীন উমর এই ঘরানার-ই একজন। তাঁর ‘[b:মুক্তি কোন পথে|23515487|মুক্তি কোন পথে|Badruddin Umar|https://d.gr-assets.com/books/1415439187s/23515487.jpg|43118625]’ (১৯৯৪) বইটি লেখা হয়েছে স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক-কৃষক ও স্কুল পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে, সমাজবাদের প্রাথমিক পাঠ হিসেবে।
বইটির শুরু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কালীন রাজনৈতিক অবস্থার বিবরণী দিয়ে, যেখানে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলগুলোর খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকার আদায়ে অপারগতা ও অনিচ্ছার কথা এসেছে। বইয়ের প্রথম বাক্যটিই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক-“১৯৭১ সালে আমাদের দেশে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধকে বলা হয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ।” বাংলাদেশের মানুষদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় এমন ভাবে দেয়া যায় কখনো ভাবিনি! যেহেতু বদরুদ্দীন উমর বইটি লিখেছেন একেবারেই স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে, তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন এই শ্রেণীর পাঠকেরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। এ ধরণের সূচনা প্রথমেই মনে একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়-যে স্বল্পশিক্ষিত বাংলাদেশী পাঠককে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা এক বাক্যে শিখিয়ে বই রচনা করতে হয়, সে পাঠককে সমাজবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, শ্রেণী সংগ্রাম, অর্থনৈতিক কাঠামো, প্রলেতারিয়েত শাসন-ইত্যাদি ভারী বিষয়গুলো ৪৮ পাতায় কি ভাবে বোঝানো যায়? কার্যতই বদরুদ্দীন উমর সেটি একেবারেই পারেননি!
বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বইটির দৈর্ঘ্য। বদরুদ্দীন উমর দরিদ্রদের ওপর চালানো ধনিকশ্রেণীর নানা ‘ভাঁওতাবাজি’ ও কূটচালের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন কিন্তু ধনিকশ্রেনী কি করে তাদের পকেট ভারী করার এই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়িত করে তার কোন উল্লেখ তাঁর বইতে নেই, নেই অর্থনৈতিক কাঠামোর কোন আলোচনাও। টাকার হাতবদল কি করে ঘটে, মুদ্রাস্ফীতি কেন হয় সেগুলোরও কোন ব্যখ্যা নেই। “ধনী লোকদের জীবন কেমন”- এই আলোচনায় উমর লিখেছেন, “সমাজের যে শেকলের কথা ওপরে বলা হলো, সে শেকলে যারা বন্দী নয় তারা হলো আমাদের দেশে সবরকম ধন সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক। তাদের আছে অনেক জমি, বড়ো বড়ো ঘরবাড়ী, শিল্প কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা ও শিল্প উৎপাদনের নামে তারা দুর্নীতি ও লুটতরাজ করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়। তারা চাকরী করে বড়ো বেতনের, বেতন ছাড়াও তাদের আছে অনেক সুবিধা।। অল্প ভাড়ায় থাকার বাড়ী, বিনা খরচে গাড়ী, আসবাবপত্র এবং আরও অনেক কিছু। তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা এবং পরিবারের লোকজনদের চিকিৎসার জন্য তারা সহজেই খরচ করে অগাধ টাকা”-এত গৎবাঁধা, প্রাণহীন ও তথ্য অভাবে নগ্ন লেখায় এত অল্পেই যদি পৃথিবীতে চলমান ব্যবসায়িক কূটচাল ও নোংরামিগুলো ব্যখ্যা করে দেয়া যেতো, তাহলে প্রলেতারিয়েত জাগরণ ও মুক্তি বহু আগেই ঘটে যেতো। অর্থনৈতিক কাঠামোর চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া এসব বিষয় শুধু শুষ্ক কথায় বলে গেলে তা কোন অর্থ বহন করে না। ধন সম্পদ ও সম্পত্তির মালিকদের কি করে অনেক জমি হয়, কেমন করে ব্যবসার নামে দুর্নীতি চলে এসবের বিশ্লেষণের ধারে কাছেও উমর যাননি। ধনিক শ্রেণী দরিদ্রদের ক্রমশ মার দিয়ে পকেট ভারী করে যাচ্ছে, এটি সর্বজনবিদিত একটি বিষয়। “প্রতিটি ঐশ্বর্য্যের পেছনে আছে একটি অপরাধ”-[a:অনার দি বালজাক|228089|Honoré de Balzac|https://d.gr-assets.com/authors/1206567834p2/228089.jpg] ১৫০ বছর আগেই বলে গেছেন। দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হওয়া মানুষগুলো দিনশেষে ধনীদেরই গাল পাড়ে। কিন্তু বুর্জোয়া সমাজের যে হাতিয়ারগুলোর ব্যবহারে তাদের পরাজয় ঘটছে তা শিক্ষার ও জ্ঞানের এত স্তরে ঢাকা পড়া থাকে, সেগুলোর ওপর বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোর এত গবেষণা পত্র আছে, পুরোপুরি ব্যাখা করে না বললে কারো পক্ষেই তা বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। ৪৮ পাতার বইতে স্রেফ ‘বড়লোকেরা খারাপ” -এই বিশ্বাস মনে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তা বরং সমাজে অশান্তিই তৈরী করবে। যদি দরিদ্রদের অবস্থার উন্নতি ঘটাবার জন্য বই লেখবার প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেন কেউ, তাহলে তা বিস্তারিত হওয়াই বাঞ্চনীয়। সাদা কথায় স্রেফ সারাংশ বলে গেলে তাতে লেখকের উদ্দেশ্যের সততাই বরং প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করিনা সমাজবাদ দারিদ্র্যের কোন সমাধান হতে পারে। রহিমের উন্নতি করিমও সমানভাবে উপভোগ করবে-এটি আমার কাছে অযৌক্তিক এবং অসম্মানজনক বলে মনে হয়। একটি সমাজকে টিকে থাকতে হলে তাতে শ্রেণীগত পার্থক্যের স্তরবিন্যাস থাকতেই হবে। লেনিনের সমাজবাদ আজ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মাও সে তুং এর সমাজবাদ চীনের অর্থনীতিকে ভয়ানক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলো (মাও এর নির্দেশে সমাজবাদী চীনের সকল শিক্ষক, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদদের চাকরী থেকে ছাড়িয়ে সে জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো অশিক্ষিত কৃষক-শ্রমিকদের। মাও এরপর নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ঘরের পেছনে উনুন বানিয়ে ধাতব সকল পণ্য, চামচ থেকে শুরু করে আলমারি, গলিয়ে ফেলতে, স্টেইনলেস স্টিল বানাবার আশায়! ফলাফলটা হাস্যকর ছিলো, বলা বাহুল্য)। এই বইতে উমর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বাংলাদেশে সামরিক ব্যয় অত্যাশ্চার্যরকম বেশী ও তা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। সমাজবাদীরা ক্ষমতায় এলে এ ধরণের খরচ বন্ধ হয়ে যাবে বলে উমর আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে-“...কাজেই সমাজতন্ত্রীরা এ ধরণের খরচ বন্ধ করবে এবং এই খরচ বন্ধ করে যে বিশাল অর্থ ও সম্পদ সরকারের হাতে আসবে সেই অর্থ তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জনগণের উন্নতির জন্য খরচ করবে। সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন তারা মেটাবে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা রক্ষায় উদ্বুদ্ধ জনগণকে অস্ত্র ব্যবহারে শিক্ষিত করে ও তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে অস্ত্রে সজ্জিত করে।” ইতিহাস ঘাঁটলে মানবজাতির যে চারিত্রিক পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে সমাজবাদী, পুঁজিবাদী, ধর্মবাদী, সাম্রাজ্যবাদী-সকল বাদের মানুষদেরই লোভের প্রকারটা একই রকম দেখি। শুধু বুর্জোয়ারা খারাপ, প্রলেতারিয়েতরাই ভালো-এটি অর্থহীন দাবী। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যার মূল হোতা রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে পকেটে পুরে ফেলা নূর হোসেন প্রথম জীবনে সেই প্রলেতারিয়েত সমাজের প্রতিনিধি-ই (বাস শ্রমিক) ছিলো। সমাজবাদ নামের কোন পরশপাথর রাতারাতি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে এমন কোন সম্ভাবনা সুদূর ভবিষ্যতেও দেখিনা।
সমাজবাদের আদর্শগুলো শুনতে দারুণ শোনায়, সন্দেহ নেই। তবে এটির বাস্তব প্রয়োগ খুব সম্ভাব্য কিছু নয়, অন্তত এখন পর্যন্ত। যদি সত্যিই সমাজের এক অংশের উন্নতি অপর অংশকেও সমান ভাবে উন্নত করে তোলে, তা হবে সভ্যতার চরম শিখরে অবস্থান। পুরো পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের প্রত্যেকে যেদিন অর্থনৈতিক ও জাগতিক সম্পদের ‘তুচ্ছ’ চিন্তাকে ছুঁড়ে ফেলে শুধু জ্ঞান অর্জন করাকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করবে, ৭০০ কোটি মানুষের প্রত্যেকেই যেদিন প্লেটো, ফৌরিয়ার, আইনস্টাইন এঁদের মতো চিন্তা করা শুরু করবে, সেদিন হয়তো সমাজবাদ স্থাপন সম্ভব হবে। সেই দিনটি শুধু আমার জীবদ্দশায় কেন, অন্তত আরো কয়েক শতকের মধ্যে সম্ভবত আসছেনা!
পরিশেষঃ বইটি সংগ্রহ করেছিলাম গুলশান অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি অভিজাত শপিং মলের বইয়ের দোকান হতে। শপিং মলের আশেপাশে লুঙ্গি ও আধময়লা কাপড়ে কাউকে দেখলেই দশাসই গার্ড বাঁশি বাজিয়ে ও তেল পাকানো লাঠি বাগিয়ে এদের ভাগিয়ে দেন। মলের ভেতর এক পাশে বাদ্যযন্ত্রের আর আরেক পাশে শুধুমাত্র দামী ফোনের কেনাবেচা করে এমন আউটলেটের ঠিক মাঝখানে বইয়ের দোকানটি। যে ভোগবাদী বুর্জোয়া সমাজকে উপড়ে ফেলার কথা বারবার বলা হয়েছে এই বইয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে দামী অঞ্চল, বুর্জোয়া সমাজের কেন্দ্রস্থল সেই গুলশানের এয়ার কন্ডিশন্ড ‘বুর্জোয়া’ দোকান থেকেই বইটি খরিদ করা গেলো। আয়রনি বৈকি! show less
বইটির শুরু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কালীন রাজনৈতিক অবস্থার বিবরণী দিয়ে, যেখানে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলগুলোর খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকার আদায়ে অপারগতা ও অনিচ্ছার কথা এসেছে। বইয়ের প্রথম বাক্যটিই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক-“১৯৭১ সালে আমাদের দেশে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধকে বলা হয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ।” বাংলাদেশের মানুষদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় এমন ভাবে দেয়া যায় কখনো ভাবিনি! যেহেতু বদরুদ্দীন উমর বইটি লিখেছেন একেবারেই স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে, তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন এই শ্রেণীর পাঠকেরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। এ ধরণের সূচনা প্রথমেই মনে একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়-যে স্বল্পশিক্ষিত বাংলাদেশী পাঠককে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা এক বাক্যে শিখিয়ে বই রচনা করতে হয়, সে পাঠককে সমাজবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, শ্রেণী সংগ্রাম, অর্থনৈতিক কাঠামো, প্রলেতারিয়েত শাসন-ইত্যাদি ভারী বিষয়গুলো ৪৮ পাতায় কি ভাবে বোঝানো যায়? কার্যতই বদরুদ্দীন উমর সেটি একেবারেই পারেননি!
বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বইটির দৈর্ঘ্য। বদরুদ্দীন উমর দরিদ্রদের ওপর চালানো ধনিকশ্রেণীর নানা ‘ভাঁওতাবাজি’ ও কূটচালের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন কিন্তু ধনিকশ্রেনী কি করে তাদের পকেট ভারী করার এই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়িত করে তার কোন উল্লেখ তাঁর বইতে নেই, নেই অর্থনৈতিক কাঠামোর কোন আলোচনাও। টাকার হাতবদল কি করে ঘটে, মুদ্রাস্ফীতি কেন হয় সেগুলোরও কোন ব্যখ্যা নেই। “ধনী লোকদের জীবন কেমন”- এই আলোচনায় উমর লিখেছেন, “সমাজের যে শেকলের কথা ওপরে বলা হলো, সে শেকলে যারা বন্দী নয় তারা হলো আমাদের দেশে সবরকম ধন সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক। তাদের আছে অনেক জমি, বড়ো বড়ো ঘরবাড়ী, শিল্প কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা ও শিল্প উৎপাদনের নামে তারা দুর্নীতি ও লুটতরাজ করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়। তারা চাকরী করে বড়ো বেতনের, বেতন ছাড়াও তাদের আছে অনেক সুবিধা।। অল্প ভাড়ায় থাকার বাড়ী, বিনা খরচে গাড়ী, আসবাবপত্র এবং আরও অনেক কিছু। তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা এবং পরিবারের লোকজনদের চিকিৎসার জন্য তারা সহজেই খরচ করে অগাধ টাকা”-এত গৎবাঁধা, প্রাণহীন ও তথ্য অভাবে নগ্ন লেখায় এত অল্পেই যদি পৃথিবীতে চলমান ব্যবসায়িক কূটচাল ও নোংরামিগুলো ব্যখ্যা করে দেয়া যেতো, তাহলে প্রলেতারিয়েত জাগরণ ও মুক্তি বহু আগেই ঘটে যেতো। অর্থনৈতিক কাঠামোর চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া এসব বিষয় শুধু শুষ্ক কথায় বলে গেলে তা কোন অর্থ বহন করে না। ধন সম্পদ ও সম্পত্তির মালিকদের কি করে অনেক জমি হয়, কেমন করে ব্যবসার নামে দুর্নীতি চলে এসবের বিশ্লেষণের ধারে কাছেও উমর যাননি। ধনিক শ্রেণী দরিদ্রদের ক্রমশ মার দিয়ে পকেট ভারী করে যাচ্ছে, এটি সর্বজনবিদিত একটি বিষয়। “প্রতিটি ঐশ্বর্য্যের পেছনে আছে একটি অপরাধ”-[a:অনার দি বালজাক|228089|Honoré de Balzac|https://d.gr-assets.com/authors/1206567834p2/228089.jpg] ১৫০ বছর আগেই বলে গেছেন। দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হওয়া মানুষগুলো দিনশেষে ধনীদেরই গাল পাড়ে। কিন্তু বুর্জোয়া সমাজের যে হাতিয়ারগুলোর ব্যবহারে তাদের পরাজয় ঘটছে তা শিক্ষার ও জ্ঞানের এত স্তরে ঢাকা পড়া থাকে, সেগুলোর ওপর বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোর এত গবেষণা পত্র আছে, পুরোপুরি ব্যাখা করে না বললে কারো পক্ষেই তা বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। ৪৮ পাতার বইতে স্রেফ ‘বড়লোকেরা খারাপ” -এই বিশ্বাস মনে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তা বরং সমাজে অশান্তিই তৈরী করবে। যদি দরিদ্রদের অবস্থার উন্নতি ঘটাবার জন্য বই লেখবার প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেন কেউ, তাহলে তা বিস্তারিত হওয়াই বাঞ্চনীয়। সাদা কথায় স্রেফ সারাংশ বলে গেলে তাতে লেখকের উদ্দেশ্যের সততাই বরং প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করিনা সমাজবাদ দারিদ্র্যের কোন সমাধান হতে পারে। রহিমের উন্নতি করিমও সমানভাবে উপভোগ করবে-এটি আমার কাছে অযৌক্তিক এবং অসম্মানজনক বলে মনে হয়। একটি সমাজকে টিকে থাকতে হলে তাতে শ্রেণীগত পার্থক্যের স্তরবিন্যাস থাকতেই হবে। লেনিনের সমাজবাদ আজ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মাও সে তুং এর সমাজবাদ চীনের অর্থনীতিকে ভয়ানক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলো (মাও এর নির্দেশে সমাজবাদী চীনের সকল শিক্ষক, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদদের চাকরী থেকে ছাড়িয়ে সে জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো অশিক্ষিত কৃষক-শ্রমিকদের। মাও এরপর নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ঘরের পেছনে উনুন বানিয়ে ধাতব সকল পণ্য, চামচ থেকে শুরু করে আলমারি, গলিয়ে ফেলতে, স্টেইনলেস স্টিল বানাবার আশায়! ফলাফলটা হাস্যকর ছিলো, বলা বাহুল্য)। এই বইতে উমর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বাংলাদেশে সামরিক ব্যয় অত্যাশ্চার্যরকম বেশী ও তা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। সমাজবাদীরা ক্ষমতায় এলে এ ধরণের খরচ বন্ধ হয়ে যাবে বলে উমর আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে-“...কাজেই সমাজতন্ত্রীরা এ ধরণের খরচ বন্ধ করবে এবং এই খরচ বন্ধ করে যে বিশাল অর্থ ও সম্পদ সরকারের হাতে আসবে সেই অর্থ তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জনগণের উন্নতির জন্য খরচ করবে। সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন তারা মেটাবে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা রক্ষায় উদ্বুদ্ধ জনগণকে অস্ত্র ব্যবহারে শিক্ষিত করে ও তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে অস্ত্রে সজ্জিত করে।” ইতিহাস ঘাঁটলে মানবজাতির যে চারিত্রিক পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে সমাজবাদী, পুঁজিবাদী, ধর্মবাদী, সাম্রাজ্যবাদী-সকল বাদের মানুষদেরই লোভের প্রকারটা একই রকম দেখি। শুধু বুর্জোয়ারা খারাপ, প্রলেতারিয়েতরাই ভালো-এটি অর্থহীন দাবী। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যার মূল হোতা রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে পকেটে পুরে ফেলা নূর হোসেন প্রথম জীবনে সেই প্রলেতারিয়েত সমাজের প্রতিনিধি-ই (বাস শ্রমিক) ছিলো। সমাজবাদ নামের কোন পরশপাথর রাতারাতি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে এমন কোন সম্ভাবনা সুদূর ভবিষ্যতেও দেখিনা।
সমাজবাদের আদর্শগুলো শুনতে দারুণ শোনায়, সন্দেহ নেই। তবে এটির বাস্তব প্রয়োগ খুব সম্ভাব্য কিছু নয়, অন্তত এখন পর্যন্ত। যদি সত্যিই সমাজের এক অংশের উন্নতি অপর অংশকেও সমান ভাবে উন্নত করে তোলে, তা হবে সভ্যতার চরম শিখরে অবস্থান। পুরো পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের প্রত্যেকে যেদিন অর্থনৈতিক ও জাগতিক সম্পদের ‘তুচ্ছ’ চিন্তাকে ছুঁড়ে ফেলে শুধু জ্ঞান অর্জন করাকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করবে, ৭০০ কোটি মানুষের প্রত্যেকেই যেদিন প্লেটো, ফৌরিয়ার, আইনস্টাইন এঁদের মতো চিন্তা করা শুরু করবে, সেদিন হয়তো সমাজবাদ স্থাপন সম্ভব হবে। সেই দিনটি শুধু আমার জীবদ্দশায় কেন, অন্তত আরো কয়েক শতকের মধ্যে সম্ভবত আসছেনা!
পরিশেষঃ বইটি সংগ্রহ করেছিলাম গুলশান অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি অভিজাত শপিং মলের বইয়ের দোকান হতে। শপিং মলের আশেপাশে লুঙ্গি ও আধময়লা কাপড়ে কাউকে দেখলেই দশাসই গার্ড বাঁশি বাজিয়ে ও তেল পাকানো লাঠি বাগিয়ে এদের ভাগিয়ে দেন। মলের ভেতর এক পাশে বাদ্যযন্ত্রের আর আরেক পাশে শুধুমাত্র দামী ফোনের কেনাবেচা করে এমন আউটলেটের ঠিক মাঝখানে বইয়ের দোকানটি। যে ভোগবাদী বুর্জোয়া সমাজকে উপড়ে ফেলার কথা বারবার বলা হয়েছে এই বইয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে দামী অঞ্চল, বুর্জোয়া সমাজের কেন্দ্রস্থল সেই গুলশানের এয়ার কন্ডিশন্ড ‘বুর্জোয়া’ দোকান থেকেই বইটি খরিদ করা গেলো। আয়রনি বৈকি! show less
ইতিহাসের মোটা মোটা বই নয়, প্রতিদিনের খবরের কাগজ ওলটালেই নিজের মানবজন্ম নিয়ে বেশ লজ্জিত হই এখন। পৃথিবীব্যাপী শুধু এক ধর্ষণের সংবাদই এত নিয়মিত হয়ে পড়েছে যে টিভিতে সংবাদ পাঠক যখন অসীমতম বারের মত ঘোষণা করেন “অমুক অঞ্চলে দুজন নারী ধর্ষিত হয়েছেন”, তা “চ্যাম্পিয়ন’স লিগে বায়ার্ন মিউনিখ দু গোল দিয়েছে”র মতই নিয়মিত ও ‘মামুলী’ শোনায়। হায় আদিম রিপু! যে যৌনতায় মানুষের জন্ম, সেই যৌনতায়ই মানবিকতার মৃত্যু। নারীর প্রতি নরের জৈবিক টান, সেতো খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু সেই আদিম কাল থেকে সভ্যতার সব সমাজেই কিছু মানুষ (নাকি বেশীর ভাগ মানুষ?) জৈবিক ক্ষুধার ভীষণ স্বাভাবিক show more অনুভূতিটিকে অনুভব করেছে ভয়ানক অস্বাভাবিকভাবে। ক্ষুধার এই প্রচণ্ডতাকে সামাল দিতে মানুষ উদ্ভাবন করেছে অদ্ভুত এক ব্যবসার, পতিতাবৃত্তি। পৃথিবীর বুকে এমন কোন মত আজ পর্যন্ত গঠিত হয়নি যার পক্ষে সাফাই গাইবার অন্তত একজনও নেই। যুক্তিবিদ্যা বড় অদ্ভুত এক বিদ্যা। সব মতের পক্ষেই এই বিদ্যার ব্যবহার আছে। যিনি জ্ঞানী, তিনি জ্ঞান বিতরন করবেন। যিনি পরিশ্রমী, তিনি শ্রম বেচবেন। অতএব, যুক্তি দিয়ে তর্ক করাই যায়, যিনি শরীরী, তিনি কেন শরীর বিলোবেন না? যুক্তির এ পথে হেঁটেই পতিতাবৃত্তির ‘ন্যায্যতা’ প্রতিপাদিত হয়েছে। বর্তমানে এটিও একটি স্থাপিত পেশা। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অনেক গল্প-উপন্যাস ও নাটকে প্রচ্ছন্নভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ভিক্ষুকেরা মানুষের আসল চেহারা সবচেয়ে ভালো চেনে। খুব সম্ভব পতিতারাও। ‘খদ্দেরদের’ মনের গোপনতম কামনা আর ফ্যান্টাসিগুলোকে যারা প্রতিনিয়ত বাস্তবায়িত করে চলেছে, তাদেরই তো মানুষ চেনার কথা সত্যিকারভাবে। কেমন সমাজ এই পতিতাদের? শরীর বিকিয়ে খাওয়ার এই গ্লানিময় পেশা কী তাদের খুব পছন্দের? কেন তারা চলে যায় না অন্য পেশায়? (কিংবা যেতে পারেনা?)
বাণী বসুর ‘খারাপ ছেলে’ আক্ষরিক অর্থেই খারাপ এক ছেলের গল্প; এপার-ওপার দু’ বাংলারই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রতিদিনের গল্প, যে পরিবারগুলোতে স্বামী সামনের আলমারিতে রাখা শার্টটি হাতে তুলে দিতে স্ত্রীকে পাশের ঘর থেকে ডেকে এনে ‘আদেশ’ করেন। যে পরিবারগুলোতে স্ত্রীরা প্রকারান্তরে ধর্ষিতই হন স্বামীদের হাতে, প্রেমহীন একপক্ষীয় কামনার ফাঁদে। এই উপন্যাসটি লিখে এক নারীই জানান দিয়েছেন বাংলার লক্ষ নারীর প্রতিদিনের ব্যবহৃত হবার দুঃখগাথা, কী নিজ ঘরে কী পতিতাপল্লীতে। ১৩৪ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্রকায় উপন্যাসটির প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি ঘটনাই মনে হয় রীতিমত দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে লেখা। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জিনা। পতিতাপল্লীর মেয়েদের শিক্ষকতা করাবার কাজ-টা যার জীবনকেই পাল্টে দেয়। জিনা'র চোখ দিয়ে দেখে দেখে পাঠকও যেন একসময় হঠাৎ আবিষ্কার করে বসে মানব জীবন কি ভীষণ কদর্যময়! দাতব্য সংস্থানগুলো পতিতাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায় কিন্তু একই সাথে তারা সেই শিক্ষার দৌড় সীমাবদ্ধও করে দিতে চায় একটি নির্দিষ্ট গণ্ডী পর্যন্ত। এর বেশী পড়ালে তারা আর এ ব্যবসায় থাকতে চাইবেনা। আবার, পতিতাদের সংখ্যা কমে গেলে দাতব্য সংস্থাও টাকা দেবে কেন? এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স! (দান-খয়রাতও একটি লাভজনক ব্যবসাই বটে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান এর মত মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে মানুষকে কত সৃষ্টিশীলই না হতে হয়!) পতিতা সমাজে মাসী যারা আছে তারাও চায় না তাদের এ অবস্থা রাতারাতি পাল্টে যাক। বড় ব্যবসায়ীদের হাতে তাদেরও তো টিকি বাঁধা। কোথায় শেষ এই দুষ্ট চক্রের? নিজ ইচ্ছেয় কেউ এসে এ পেশায় জড়ায়নি। বাবা, প্রেমিক, স্বামী এরাই বিক্রি করে দিয়ে গেছে তাদের কন্যা, প্রেমিকা অথবা স্ত্রীদের, চিরশত্রু উদরের আগুন নেভাতে। পতিতাপল্লীর অন্ধকার গলি থেকে যে মেয়েটি পালিয়ে আসতে চায়, ধরা পড়বার পর শাস্তি স্বরূপ তাকে ধর্ষিত হতে হয় সারা রাত, একাধিক পোষা মাস্তানের হাতে। বাধ্যগত হলে 'সোহাগ', আর বেয়াড়া-বিদ্রোহী হলে ধর্ষণ; পুরস্কারের স্বীকৃতি কী তিরস্কারের লাঠি, উভয়েরই মূল্যের প্রকার কী ক্লান্তিকর রকম এক! ১৩৪টি পৃষ্ঠাই মাত্র, এতেই মানুষের যৌনক্ষুধার বিবরণে বড্ড বেশী বিষণ্ণ ও নিশ্চল হয়ে গেছি। মানবজাতির আরেকজন প্রতিনিধি হিসেবেই লজ্জিত ছিলাম ‘জাতভাইদের’ আচরণে। পরিধিটা আরো ছোট হয়ে শুধু পুরুষ জাতিতে এসে ঠেকল কী না কে জানে। show less
বাণী বসুর ‘খারাপ ছেলে’ আক্ষরিক অর্থেই খারাপ এক ছেলের গল্প; এপার-ওপার দু’ বাংলারই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রতিদিনের গল্প, যে পরিবারগুলোতে স্বামী সামনের আলমারিতে রাখা শার্টটি হাতে তুলে দিতে স্ত্রীকে পাশের ঘর থেকে ডেকে এনে ‘আদেশ’ করেন। যে পরিবারগুলোতে স্ত্রীরা প্রকারান্তরে ধর্ষিতই হন স্বামীদের হাতে, প্রেমহীন একপক্ষীয় কামনার ফাঁদে। এই উপন্যাসটি লিখে এক নারীই জানান দিয়েছেন বাংলার লক্ষ নারীর প্রতিদিনের ব্যবহৃত হবার দুঃখগাথা, কী নিজ ঘরে কী পতিতাপল্লীতে। ১৩৪ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্রকায় উপন্যাসটির প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি ঘটনাই মনে হয় রীতিমত দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে লেখা। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জিনা। পতিতাপল্লীর মেয়েদের শিক্ষকতা করাবার কাজ-টা যার জীবনকেই পাল্টে দেয়। জিনা'র চোখ দিয়ে দেখে দেখে পাঠকও যেন একসময় হঠাৎ আবিষ্কার করে বসে মানব জীবন কি ভীষণ কদর্যময়! দাতব্য সংস্থানগুলো পতিতাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায় কিন্তু একই সাথে তারা সেই শিক্ষার দৌড় সীমাবদ্ধও করে দিতে চায় একটি নির্দিষ্ট গণ্ডী পর্যন্ত। এর বেশী পড়ালে তারা আর এ ব্যবসায় থাকতে চাইবেনা। আবার, পতিতাদের সংখ্যা কমে গেলে দাতব্য সংস্থাও টাকা দেবে কেন? এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স! (দান-খয়রাতও একটি লাভজনক ব্যবসাই বটে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান এর মত মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে মানুষকে কত সৃষ্টিশীলই না হতে হয়!) পতিতা সমাজে মাসী যারা আছে তারাও চায় না তাদের এ অবস্থা রাতারাতি পাল্টে যাক। বড় ব্যবসায়ীদের হাতে তাদেরও তো টিকি বাঁধা। কোথায় শেষ এই দুষ্ট চক্রের? নিজ ইচ্ছেয় কেউ এসে এ পেশায় জড়ায়নি। বাবা, প্রেমিক, স্বামী এরাই বিক্রি করে দিয়ে গেছে তাদের কন্যা, প্রেমিকা অথবা স্ত্রীদের, চিরশত্রু উদরের আগুন নেভাতে। পতিতাপল্লীর অন্ধকার গলি থেকে যে মেয়েটি পালিয়ে আসতে চায়, ধরা পড়বার পর শাস্তি স্বরূপ তাকে ধর্ষিত হতে হয় সারা রাত, একাধিক পোষা মাস্তানের হাতে। বাধ্যগত হলে 'সোহাগ', আর বেয়াড়া-বিদ্রোহী হলে ধর্ষণ; পুরস্কারের স্বীকৃতি কী তিরস্কারের লাঠি, উভয়েরই মূল্যের প্রকার কী ক্লান্তিকর রকম এক! ১৩৪টি পৃষ্ঠাই মাত্র, এতেই মানুষের যৌনক্ষুধার বিবরণে বড্ড বেশী বিষণ্ণ ও নিশ্চল হয়ে গেছি। মানবজাতির আরেকজন প্রতিনিধি হিসেবেই লজ্জিত ছিলাম ‘জাতভাইদের’ আচরণে। পরিধিটা আরো ছোট হয়ে শুধু পুরুষ জাতিতে এসে ঠেকল কী না কে জানে। show less
So, what’s the first thing that comes to your mind when you see a book with a title “The Unbearable Lightness of Being”? Well, it does sound ostentatious, doesn't it? You could actually take some pride reading a book bearing such a title! And the “pride” might easily outshine the feeling of “How did the read go?” You can see, I have to be really careful now answering this same question (For I am very likely to be asked. Of course, it’s The title that raises the curiosity). It’s a bit of a tricky question to answer and here I will bring the contrasts between European and South Asian social life for expressing myself (Pretty ostentatious right? But I can’t help much, I am only writing a review of a novel having an “ostentatious” title, sitting at one corner of South Asia!)
The novel starts with an analysis of Friedrich Nietzsche's idea of eternal return that “everything recurs as we once experienced it, and that the recurrence itself recurs ad infinitum!” Kundera stands opposite to this idea of eternal return and tries to establish that every individual experiences a life of his/ her own which will never come back, making the individual’s life ridiculously insignificant. Thus comes the lightness, the unbearable lightness of being. There is a lot lovemaking (sex) and tension between the characters' love life and sex life in the story and standing behind the curtain, Kundera points his finger towards the lightness of love and sex. Indeed, love is show more a fortuitous event and it lands on your shoulders like a fluttering bird, but what's its significance?, it’s unbearably light; that’s what Kundera’s argument. The characters in the novel engage themselves in sexual adventures quite rapidly. Tomas, the protagonist, when asked, very reluctantly (and shyly too) answers that he had made love to 200 women (give or take some more). Tomas is a doctor (a surgeon more precisely) and it’s his profession that inspires him to go for these sexual adventures, not the lust. On the surgery table, Tomas has to dissect human bodies which is his passion and likewise, he loves to dissect women nature while making love to them for each woman has her very own way to take part in the act of copulation; Tomas enjoys the variety and exploring the variation is his need. He often refers to Beethoven’s string quartet no. 16 for explaining himself. In the last movement of the quartet, named Der schwer gefasste Entschluss (The difficult decision) Beethoven asks “Muss es sein?” (Must it be?) and responds to himself saying “Es muss sein!” (It must be!). Each time Tomas enters into a new ‘erotic friendship’ he asks himself “Muss es sein?”, to which, the obvious answer he gives is, “Es muss sein!” In contrast to Tomas’s promiscous behavior, his wife Tereza is very resolute to love her husband (even though every night she gets the smell of other woman’s groin coming from Tomas’s hair). Apparently, it seems that Tomas doesn't love Tereza but to readers, gradually it becomes clear that Tomas had made the greatest sacrifice in his life for Tereza. Hadn't he done so, he would've lived a much fuller and happier life. Is that love really weightless? Well, maybe, it's too subtle an argument to analyze and no precise conclusion can be drawn. Does Tomas really have to make Tereza cry? Oh Yes, Es muss sein!
Though the plot of the novel circumambulates the idea of lightness of love and sex, it is written with a vivid backdrop of Soviet occupation of former Czechoslovakia. In Gorky, Gaidar or Ostrovsky, we see a tortured, battered, poor Russia. A crying Russia. Kundera rather shows an invading Soviet Russia that makes the Czechs cry, leave their country and lose their jobs. While I found the philosophical arguments to be superficial, the description of the occupation really shook me. It’s a grim and depressing novel and it appears that the sun never rises at the venues where this novel takes place. The Soviet occupation chapters made the tone even graver.
Now comes the Europe-South Asia contrasting part. The west is much less conservative about sex, relative to the eastern part of the world. By no means, I am indicating that the westerns are more promiscuous than the Asians. It’s just the cultural difference. One part of the world allows the open relations, while the other part dubs it to be a taboo. Good or bad, it’s a very open question. But, open relationships and sexual promiscuity is something that make The East frown (surely it makes anyone from any part of the world frown, but remember? It’s a taboo here). When it seems that the characters in the unbearable, deep down, regret for their promiscuity, it appears that after all, the eastern view of sexual fidelity prevails! Another point I’d like to pick. In the novel Tomas buys Tereza a female dog with the hope that this dog will back him up in healing Tereza’s depression since he can’t give her much time. While naming the dog, Tomas suggests that they should give it a male name (Karenin). A female dog with a male name will develop a lesbian attraction to her female master, Tomas conjectured. In this relatively "backward" part of the world, such open discussions between lovers and husbands and wives are not very likely to take place. Sex has just been another regular need and the necessity of seeing it from a completely different point of view had never really occurred, well, until now! (I might add that Hinduism and Buddhism, two of the most important religions indigenous to South Asia, remain silent about this "other form" of sex. A religion is a set of rules and no matter religion is Divine or not, a lot of people abide by them. These rules are "created" based on human nature. The silence of the scriptures on this matter raise two possibilities. Either the practice of homosexuality was not introduced here at all, or they didn't bother noticing this behavior. Both ways, attraction between same sexes here, is much less a familiar idea than the west). So, in conclusion, I can only surmise that the cultural and religious differences between Europe and Asia might play a vital role in judging the capability of the novel.
Finally, it would be an injustice if I do not thank Michael Henry Heim, the translator. I do not know Czech but his English rendition is just too brilliant. Applaud for Michael. show less
The novel starts with an analysis of Friedrich Nietzsche's idea of eternal return that “everything recurs as we once experienced it, and that the recurrence itself recurs ad infinitum!” Kundera stands opposite to this idea of eternal return and tries to establish that every individual experiences a life of his/ her own which will never come back, making the individual’s life ridiculously insignificant. Thus comes the lightness, the unbearable lightness of being. There is a lot lovemaking (sex) and tension between the characters' love life and sex life in the story and standing behind the curtain, Kundera points his finger towards the lightness of love and sex. Indeed, love is show more a fortuitous event and it lands on your shoulders like a fluttering bird, but what's its significance?, it’s unbearably light; that’s what Kundera’s argument. The characters in the novel engage themselves in sexual adventures quite rapidly. Tomas, the protagonist, when asked, very reluctantly (and shyly too) answers that he had made love to 200 women (give or take some more). Tomas is a doctor (a surgeon more precisely) and it’s his profession that inspires him to go for these sexual adventures, not the lust. On the surgery table, Tomas has to dissect human bodies which is his passion and likewise, he loves to dissect women nature while making love to them for each woman has her very own way to take part in the act of copulation; Tomas enjoys the variety and exploring the variation is his need. He often refers to Beethoven’s string quartet no. 16 for explaining himself. In the last movement of the quartet, named Der schwer gefasste Entschluss (The difficult decision) Beethoven asks “Muss es sein?” (Must it be?) and responds to himself saying “Es muss sein!” (It must be!). Each time Tomas enters into a new ‘erotic friendship’ he asks himself “Muss es sein?”, to which, the obvious answer he gives is, “Es muss sein!” In contrast to Tomas’s promiscous behavior, his wife Tereza is very resolute to love her husband (even though every night she gets the smell of other woman’s groin coming from Tomas’s hair). Apparently, it seems that Tomas doesn't love Tereza but to readers, gradually it becomes clear that Tomas had made the greatest sacrifice in his life for Tereza. Hadn't he done so, he would've lived a much fuller and happier life. Is that love really weightless? Well, maybe, it's too subtle an argument to analyze and no precise conclusion can be drawn. Does Tomas really have to make Tereza cry? Oh Yes, Es muss sein!
Though the plot of the novel circumambulates the idea of lightness of love and sex, it is written with a vivid backdrop of Soviet occupation of former Czechoslovakia. In Gorky, Gaidar or Ostrovsky, we see a tortured, battered, poor Russia. A crying Russia. Kundera rather shows an invading Soviet Russia that makes the Czechs cry, leave their country and lose their jobs. While I found the philosophical arguments to be superficial, the description of the occupation really shook me. It’s a grim and depressing novel and it appears that the sun never rises at the venues where this novel takes place. The Soviet occupation chapters made the tone even graver.
Now comes the Europe-South Asia contrasting part. The west is much less conservative about sex, relative to the eastern part of the world. By no means, I am indicating that the westerns are more promiscuous than the Asians. It’s just the cultural difference. One part of the world allows the open relations, while the other part dubs it to be a taboo. Good or bad, it’s a very open question. But, open relationships and sexual promiscuity is something that make The East frown (surely it makes anyone from any part of the world frown, but remember? It’s a taboo here). When it seems that the characters in the unbearable, deep down, regret for their promiscuity, it appears that after all, the eastern view of sexual fidelity prevails! Another point I’d like to pick. In the novel Tomas buys Tereza a female dog with the hope that this dog will back him up in healing Tereza’s depression since he can’t give her much time. While naming the dog, Tomas suggests that they should give it a male name (Karenin). A female dog with a male name will develop a lesbian attraction to her female master, Tomas conjectured. In this relatively "backward" part of the world, such open discussions between lovers and husbands and wives are not very likely to take place. Sex has just been another regular need and the necessity of seeing it from a completely different point of view had never really occurred, well, until now! (I might add that Hinduism and Buddhism, two of the most important religions indigenous to South Asia, remain silent about this "other form" of sex. A religion is a set of rules and no matter religion is Divine or not, a lot of people abide by them. These rules are "created" based on human nature. The silence of the scriptures on this matter raise two possibilities. Either the practice of homosexuality was not introduced here at all, or they didn't bother noticing this behavior. Both ways, attraction between same sexes here, is much less a familiar idea than the west). So, in conclusion, I can only surmise that the cultural and religious differences between Europe and Asia might play a vital role in judging the capability of the novel.
Finally, it would be an injustice if I do not thank Michael Henry Heim, the translator. I do not know Czech but his English rendition is just too brilliant. Applaud for Michael. show less
Harvard symbologist Robert Langdon's fourth adventure 'Inferno' turns out to be more of a thriller-action movie script rather than a novel. It's fast, it's kaleidoscopic, it's dramatic. One may find 'Inferno' as a silhouette of 'The da Vinci Code' against the scintillating background of 'typical Dan Brown conspiracy theory'. From the previous experiences, you certainly remember Langdon's terrifically accurate memory and his profound knowledge of art. To make the battle fair, at all, you need a real smart villain who could possibly stand a chance against Langdon. A worthy contender. Thus, the blessedly brilliant yet a maniac scientist Bertrand Zobrist makes his grand entrance. And Robert Langdon simply can't work with normal people! He has quite an eye for picking up the incredibly intelligent heroines. Bingo! There you get Sienna Brooks, a flashing beauty with an IQ of 208. Three of the most smart people on the same boat, what else do you need? A little history of art and an intricate sabotage plot maybe? That's what, in a nutshell, 'Inferno is.
Based on history's one of the greatest poets Dante Alighieri's masterpiece 'The Divine Comedy', 'Inferno' is written. Well, at least, figuratively. In Divine Comedy, Dante made his travel through Hell (Inferno) and Purgatory to reach to the Paradise (Paradiso) finally, making a notion that one has to suffer Hell in order to enjoy Heaven. In the novel, the 'transhumanist' scientist Zobrist wants to raise a hell on Earth by show more 'eliminating' a portion of the overgrown global population with the help of his engineered virus, only to make the Earth a more habitable place; a true Paradise. Now it's entirely up to Robert Langdon. Can he save the world? In this mission Langdon had to run from USA to the historic cities of Italy and Turkey. He had to experience amnesia for which his memory for one whole day gets lost, an unbelievable event considering his eidetic memory. Car chase, gunfire, deception, nameless 'master of puppets' and what not; you've got a complete Hollywood package. I might add that the philosophy of demolishing today's millions for saving tomorrow's billions is indeed intriguing and may give you some food for thinking.
Myriad of information and references made the book a little boring at times. There were over dramatizations and there were pieces that don't fit together but, nevertheless, Dan Brown is a good storyteller and he manages to keep you glued to the book anyway. The plot probably suits best for a giant screen cineplex than paper books and I'm eagerly waiting to see Tom Hanks, again, in the 2015 movie adaptation.
P.S: I want to thank Dan Brown specially for one particular dialogue by Sienna Brooks and here it goes like this, "....but unfortunately, I've learned to expect the worst from people who hold power." Dude, you just read my mind! show less
Based on history's one of the greatest poets Dante Alighieri's masterpiece 'The Divine Comedy', 'Inferno' is written. Well, at least, figuratively. In Divine Comedy, Dante made his travel through Hell (Inferno) and Purgatory to reach to the Paradise (Paradiso) finally, making a notion that one has to suffer Hell in order to enjoy Heaven. In the novel, the 'transhumanist' scientist Zobrist wants to raise a hell on Earth by show more 'eliminating' a portion of the overgrown global population with the help of his engineered virus, only to make the Earth a more habitable place; a true Paradise. Now it's entirely up to Robert Langdon. Can he save the world? In this mission Langdon had to run from USA to the historic cities of Italy and Turkey. He had to experience amnesia for which his memory for one whole day gets lost, an unbelievable event considering his eidetic memory. Car chase, gunfire, deception, nameless 'master of puppets' and what not; you've got a complete Hollywood package. I might add that the philosophy of demolishing today's millions for saving tomorrow's billions is indeed intriguing and may give you some food for thinking.
Myriad of information and references made the book a little boring at times. There were over dramatizations and there were pieces that don't fit together but, nevertheless, Dan Brown is a good storyteller and he manages to keep you glued to the book anyway. The plot probably suits best for a giant screen cineplex than paper books and I'm eagerly waiting to see Tom Hanks, again, in the 2015 movie adaptation.
P.S: I want to thank Dan Brown specially for one particular dialogue by Sienna Brooks and here it goes like this, "....but unfortunately, I've learned to expect the worst from people who hold power." Dude, you just read my mind! show less
শেল সিলভারস্টাইনের ‘দ্যা গিভিং ট্রি’ শিশুসাহিত্যের জগতে অত্যন্ত বিতর্কিত এক নাম। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হবার পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৮৫ লক্ষ কপি বিক্রি হওয়া বইটির পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে বিস্তর মতভেদ। এই মতভেদের কেন্দ্রে রয়েছে গল্পের দুই চরিত্র-এক বালক আর এক আপেল গাছ-এর মধ্যবর্তী সম্পর্ক। সংক্ষেপে গল্পটি এমনঃ
show more
গল্পের গাছ আর বালকের যার যার আচরণকে ঘিরেই বিতর্ক। যাঁরা গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হন, তাঁদের মুগ্ধতা আপেল গাছটির নিঃস্বার্থ দানে। গল্পটি যাঁদের বিরক্তির উদ্রেক করেছে, তাঁদের বিরক্তি বালকের স্বার্থপরতায়। অনেকেই গল্পটিকে রুপক অর্থে দেখতে ভালোবাসেন, সে জন্যই গল্পটির অনেকগুলো ব্যাখ্যা আছে। কারো ধারণা গল্পের আপেল গাছটি আসলে ক্ষমাপ্রিয় ঈশ্বর; কারো মতে প্রকৃতি-মাতা, কারো মতে গল্পটি সন্তান ও পিতামাতার সম্পর্ককে বোঝায়। কেউ কেউ গাছ ও বালকের সম্পর্কটিকে বন্ধুত্ব বলে অভিহিত করতে বেশী স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এমনও মানুষ আছেন যাঁদের ধারণা গল্পটি আসলে একটি স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ। শেল সিলভারস্টাইন এই গল্প দিয়ে চিরাচরিত মানব-চরিত্রকে মুখ ভেংচি কেটেছেন। যদি সত্যি-ই এটি তাই হয়ে থাকে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত উন্নত শ্রেণীর স্যাটায়ার। তবে এ গল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো সন্তানের জন্য পিতা-মাতার কিংবা বন্ধুর জন্য বন্ধুর নিঃস্বার্থ দান। আপাতদৃষ্টিতে ‘মহৎ’ এই নিঃস্বার্থ দানের বিষয়টিকে আমি অত্যন্ত বিপদজনক হিসেবে দেখি এবং এখানেই গল্পটি যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের সাথে আমার মতের পার্থক্য।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে স্বার্থপর একটি প্রানী হিসেবে দেখতে শিখেছি। বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বার্থ বিষয়টি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রানীটি মানুষ, সুতরাং তার স্বার্থ আকাশছোঁয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। ‘দ্যা গিভিং ট্রি’ গল্পের বালকের স্বার্থপরতা আমাকে অবাক করেনা, বরং আপেল গাছের নিঃস্বার্থ ভাবে নিজেকে বিকিয়ে দেয়াটাই আমার কাছে অবিমৃষ্যকারীতা মনে হয়; এবং তা সন্তান ও পিতা-মাতার ক্ষেত্রেও তাই। অপরের জন্য-সেটি যদি বন্ধু কিংবা সন্তানও হয়-অন্ধভাবে চিন্তা ব্যতিরেকেই নিজেকে উজাড় করে দেয়ার যে শিক্ষার জন্য গল্পটিকে মহৎ করা হয়, সে শিক্ষা আমি কোন শিশুকে দিতে নারাজ। এ ধরণের মহত্ত্বের মাঝে আমি একধরণের ন্যাকামী’র গন্ধ পাই।
হাতে ছোঁয়া যায়না, জীবনের এমন দেনা পাওনা গুলোরও একটা জাবেদা খাতা আছে, সেখানেও ডেবিট-ক্রেডিট এর অদৃশ্য একটা হিসেব আছে। দিনশেষে ডেবিট-ক্রেডিট সমান না হলে জাবেদা খাতার সেই পাতাটা কেটেই দিতে হয়। ভালোবাসা ও তার প্রতিদানের বিষয়টিও এর চেয়ে খুব আলাদা কিছু কি? show less
“এক দেশে এক আপেল গাছ ছিলো। সেই গাছটির নিচে এসে খেলা করতো এক বালক। গাছ এবং বালক উভয়-ই উভয়কে খুব ভালোবাসতো। বালক আপেল গাছের পাতা কুড়িয়ে মুকুট বানিয়ে মাথায় পরতো, গাছের ডালে ঝুলে খেলা করতো, খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে গেলে গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে ঘুমিয়েও
পড়তো। খুব সুখেই দিন কাটছিলো তাদের। কিন্তু একসময় বালক বড় হয়ে গেলো আর তার গাছের সাথে খেলার আগ্রহও কমে গেলো। এমনি একদিন যখন সে গাছের কাছে এলো, গাছ খুব খুশী হয়ে উঠলো। বালককে আগের মতো খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। বালকের বয়েস বাড়ছে, তার খেলার প্রতি আগ্রহ নেই আর। তার এখন চাই টাকা। গাছ তাকে নিজের আপেল বিক্রি করে টাকা উপায় করার বুদ্ধি বাতলে দিলো। বালক তাই করলো। ত্যাগের সুখে গাছ সুখী। অনেকদিন পর আবার সেই বালক গাছের কাছে এলো, এখন তার সহায় সম্পত্তি আছে। তার প্রয়োজন একটি ঘর। আপেল গাছ এবার তার ডালগুলো বাড়িয়ে দিলো ঘর বানাবার তরে। তারও অনেকদিন পর বালক(এখন প্রায় প্রৌঢ়)আবার এলো গাছের কাছে। তার জগত সংসার ভালো লাগছেনা, দূরে কোথাও চলে যাওয়া প্রয়োজন। গাছ বালক কে নিজের কাণ্ড কেটে নৌকা বানাতে দিলো। বালক নৌকা বানালো আপেল গাছের কাণ্ড কেটে। এক কালের বিশাল আপেল গাছের বাকি রইলো শুধু ছোট্ট একটু কাটা কাণ্ড। গাছ তবু সুখী বালকের উপকারে আসতে পেরে। শেষ বয়েসে একদিন সেই বালক আবার এলো সেই কাটা কাণ্ডের কাছে। গাছ তাকে আজ কিছুই দিতে পারছেনা। বালক বললো জীবনের ভারে সে ক্লান্ত, এখন তার চাই শুধু একটু বিশ্রাম। গাছ তাকে তার সেই কাটা কাণ্ডটুকুই পেতে দিলো বসবার জন্য। অতএব বালক বসে রইলো। আপেল গাছ আজও সুখী”।
গল্পের গাছ আর বালকের যার যার আচরণকে ঘিরেই বিতর্ক। যাঁরা গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হন, তাঁদের মুগ্ধতা আপেল গাছটির নিঃস্বার্থ দানে। গল্পটি যাঁদের বিরক্তির উদ্রেক করেছে, তাঁদের বিরক্তি বালকের স্বার্থপরতায়। অনেকেই গল্পটিকে রুপক অর্থে দেখতে ভালোবাসেন, সে জন্যই গল্পটির অনেকগুলো ব্যাখ্যা আছে। কারো ধারণা গল্পের আপেল গাছটি আসলে ক্ষমাপ্রিয় ঈশ্বর; কারো মতে প্রকৃতি-মাতা, কারো মতে গল্পটি সন্তান ও পিতামাতার সম্পর্ককে বোঝায়। কেউ কেউ গাছ ও বালকের সম্পর্কটিকে বন্ধুত্ব বলে অভিহিত করতে বেশী স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এমনও মানুষ আছেন যাঁদের ধারণা গল্পটি আসলে একটি স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ। শেল সিলভারস্টাইন এই গল্প দিয়ে চিরাচরিত মানব-চরিত্রকে মুখ ভেংচি কেটেছেন। যদি সত্যি-ই এটি তাই হয়ে থাকে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত উন্নত শ্রেণীর স্যাটায়ার। তবে এ গল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো সন্তানের জন্য পিতা-মাতার কিংবা বন্ধুর জন্য বন্ধুর নিঃস্বার্থ দান। আপাতদৃষ্টিতে ‘মহৎ’ এই নিঃস্বার্থ দানের বিষয়টিকে আমি অত্যন্ত বিপদজনক হিসেবে দেখি এবং এখানেই গল্পটি যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের সাথে আমার মতের পার্থক্য।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে স্বার্থপর একটি প্রানী হিসেবে দেখতে শিখেছি। বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বার্থ বিষয়টি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রানীটি মানুষ, সুতরাং তার স্বার্থ আকাশছোঁয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। ‘দ্যা গিভিং ট্রি’ গল্পের বালকের স্বার্থপরতা আমাকে অবাক করেনা, বরং আপেল গাছের নিঃস্বার্থ ভাবে নিজেকে বিকিয়ে দেয়াটাই আমার কাছে অবিমৃষ্যকারীতা মনে হয়; এবং তা সন্তান ও পিতা-মাতার ক্ষেত্রেও তাই। অপরের জন্য-সেটি যদি বন্ধু কিংবা সন্তানও হয়-অন্ধভাবে চিন্তা ব্যতিরেকেই নিজেকে উজাড় করে দেয়ার যে শিক্ষার জন্য গল্পটিকে মহৎ করা হয়, সে শিক্ষা আমি কোন শিশুকে দিতে নারাজ। এ ধরণের মহত্ত্বের মাঝে আমি একধরণের ন্যাকামী’র গন্ধ পাই।
হাতে ছোঁয়া যায়না, জীবনের এমন দেনা পাওনা গুলোরও একটা জাবেদা খাতা আছে, সেখানেও ডেবিট-ক্রেডিট এর অদৃশ্য একটা হিসেব আছে। দিনশেষে ডেবিট-ক্রেডিট সমান না হলে জাবেদা খাতার সেই পাতাটা কেটেই দিতে হয়। ভালোবাসা ও তার প্রতিদানের বিষয়টিও এর চেয়ে খুব আলাদা কিছু কি? show less
আমার বিশেষণের অভিধান খুব সমৃদ্ধ নয়। 'অসাধারণ', 'দুর্দান্ত', 'চমৎকার' ইত্যাদি ক'টা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেই মোটামুটি! সম্বল এই কয়খানা মাত্র, তাই বহু ব্যবহারে তারা জীর্ণও বটে। প্রায়ই দেখা যায় দ্রব্যের গুণাবলীর সঠিক পরিমাপ এই বিশেষণেরা দিতে পারছেনা। দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে মাপলে দুদিকের পাল্লা সমান সমান ইদানীং আর হয়না (অভিযোগ আছে আমার বিরুদ্ধে, আমি নাকি কারচুপি করে আমার বিশেষণ এর 'বাটখারা' গুলোর ওজন কমিয়ে দেই, বিশেষত হুমায়ূন আহমেদের বই এর ক্ষেত্রে!) দীর্ঘ ব্যবহারে ক্ষয়ে ক্ষয়ে হোক আর 'সূক্ষ্ম কারচুপি'র কারণেই হোক, এক শব্দের বাটখারা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। অতএব একটু ঘোরালো show more করে বলা যাক, আধুনিক সময়ে বাংলাদেশী তো বটেই, বাংলা সাহিত্যেই 'নিহত নক্ষত্র' বইয়ে সংকলিত ছোটগল্পগুলোর কাছাকাছি মানের গল্প বেশ দুর্লভ! বাটখারার ওজন নিয়ে এখন যাঁর সন্দেহ হবে তিনিই কষ্ট করে সব পড়ে দেখুন, আমার কি!
স্রেফ কাহিনী বলে যাওয়াটাই সাহিত্য নয় নিশ্চয়ই। সাহিত্য মানুষকে উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় চোখে দূরবীন লাগিয়ে অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে নিচের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করবার অনুভূতিটা কেমন তার একটা ছোট্ট ধারণা দেয়, তাকে চিন্তা করতে শেখায়। চিন্তার উদ্রেককারী পর্যবেক্ষণের এই উপাদানগুলো এই বইয়ে বেশ ভালোভাবেই আছে। বইয়ে সংকলিত ৯টি গল্পের অন্তত ৬ টি গল্পে এ ব্যাপারটি খুব দৃঢ় ভাবে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণ্ডামী, খুনী এক ডাকাতের বিপন্ন এক মুহূর্তের ভাবনা, ধর্মের নামে ভণ্ডামী, অকালে সন্তানহারানো মায়ের ক্ষোভ, চামড়ার নিচে সুপ্ত কামনা ইত্যাদি বিষয়গুলোই গল্পগুলোর উপজীব্য। এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে 'ক্লিশে' হয়ে গেছে, এই ঘটনাগুলোর নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে চোখও আমাদের পেকে গেছে হয়ত, তবু ভেতরের একটা গল্প থাকেই। বাংলা ১৩৭১-১৩৭৫ সালের মাঝে লেখা এই গল্পগুলো, আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে। তখন যেমন ছফা সদর্পে লিখে গেছেন "মুসলমান সমাজ এখনও চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে রামমোহনের স্তর অতিক্রম করেনি। যাঁদের ভয়ঙ্কর প্রগতিশীল মনে করে সভা করে গলায় মালা দুলিয়ে দেই, তারাও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ভালো করে টিপে দেখুন, দেখবেন, মানুষ-পঁচা গন্ধ বেরোয়। ভেতরে নোংরা, ওপরের চটকদার চেহারাটুকুই চোখে পড়ছে। রাজনীতিবিদেরা যুবকদের সমাজ পরিবর্তনের কাজে না লাগিয়ে, তোষামোদে কাজে লাগিয়েছে। তাতে করে যুবশক্তির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।" আজকের বাংলাদেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক দুরাবস্থা কিংবা মসজিদ থেকে চাঁদে সাঈদীর চেহারা দেখতে পাবার ঘোষণা এই কথাগুলোকেই প্রতিফলিত করে। ঘটনাগুলো ক্লিশে কিন্তু কী চিরন্তন! ছফা কোন নির্দিষ্ট ধর্মে সরাসরি বিশ্বাসী হয়ত ছিলেননা কিন্তু তাঁর লেখায় ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা কখনো আসেনি, এসেছে ধর্মকে বদলে দেয়া সুবিধাবাদী মানুষগুলোকে মুখ ভ্যাংচানী। ছফা ভয়ানক সাহসী ছিলেন, কোন লুকোছাপাই ছিলোনা তাঁর মাঝে। মানুষকে কথার হুল যেমন ফোটাতে পারতেন, সম্মানও তেমনই করতেন। আজকের 'প্রগতিশীল' লেখক-বুদ্ধিজীবী মহল কি শিক্ষা নেবেন এখান থেকে?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পটি পড়ার অনুভূতি অনেকখানিই ফিরিয়ে দিলো 'গন্তব্য' গল্পটি। ভীষণ ভালো লেগেছে 'পদাঘাতের পটভূমি' (সংলাপ গুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়), 'নিহত নক্ষত্র', 'আস্বাদ', 'প্রতিপক্ষ', 'কবি' আর শেষে অবশ্যই ছফার বিটকেলে সেন্স অফ হিউমার এর সামান্য পরিচয়বাহক গল্প 'কাজলী'।
আহমদ ছফা গত হয়েছেন বেশ আগে কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তাঁকে নক্ষত্র বানিয়ে রেখেছে। খুব বড় নক্ষত্র যখন 'মারা যায়' তা পর্যায়ক্রমে প্রচণ্ড উজ্জ্বল মহাজাগতিক বিস্ফোরণ 'সুপারনোভা' তে পরিণত হয়। আমাদের মার খেতে অভ্যস্ত, নিঃস্পৃহ, নিরুদ্যম সমাজেও এমন একটি বিস্ফোরণ এখন খুব দরকার। সময়ের জন্য কিছুই থেমে থাকেনা। একসময় নিশ্চয়ই এমন একটি সুপারনোভীয় বিস্ফোরণ হবে। ততদিন পর্যন্ত ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' কিংবা 'একজন আলী কেনানের উত্থান পতন' কিংবা 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা' ইত্যাদি রচনাগুলোর মধ্যে দিয়ে বিস্ফোরণের বারুদ জমতে থাকুক। show less
স্রেফ কাহিনী বলে যাওয়াটাই সাহিত্য নয় নিশ্চয়ই। সাহিত্য মানুষকে উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় চোখে দূরবীন লাগিয়ে অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে নিচের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করবার অনুভূতিটা কেমন তার একটা ছোট্ট ধারণা দেয়, তাকে চিন্তা করতে শেখায়। চিন্তার উদ্রেককারী পর্যবেক্ষণের এই উপাদানগুলো এই বইয়ে বেশ ভালোভাবেই আছে। বইয়ে সংকলিত ৯টি গল্পের অন্তত ৬ টি গল্পে এ ব্যাপারটি খুব দৃঢ় ভাবে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণ্ডামী, খুনী এক ডাকাতের বিপন্ন এক মুহূর্তের ভাবনা, ধর্মের নামে ভণ্ডামী, অকালে সন্তানহারানো মায়ের ক্ষোভ, চামড়ার নিচে সুপ্ত কামনা ইত্যাদি বিষয়গুলোই গল্পগুলোর উপজীব্য। এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে 'ক্লিশে' হয়ে গেছে, এই ঘটনাগুলোর নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে চোখও আমাদের পেকে গেছে হয়ত, তবু ভেতরের একটা গল্প থাকেই। বাংলা ১৩৭১-১৩৭৫ সালের মাঝে লেখা এই গল্পগুলো, আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে। তখন যেমন ছফা সদর্পে লিখে গেছেন "মুসলমান সমাজ এখনও চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে রামমোহনের স্তর অতিক্রম করেনি। যাঁদের ভয়ঙ্কর প্রগতিশীল মনে করে সভা করে গলায় মালা দুলিয়ে দেই, তারাও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ভালো করে টিপে দেখুন, দেখবেন, মানুষ-পঁচা গন্ধ বেরোয়। ভেতরে নোংরা, ওপরের চটকদার চেহারাটুকুই চোখে পড়ছে। রাজনীতিবিদেরা যুবকদের সমাজ পরিবর্তনের কাজে না লাগিয়ে, তোষামোদে কাজে লাগিয়েছে। তাতে করে যুবশক্তির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।" আজকের বাংলাদেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক দুরাবস্থা কিংবা মসজিদ থেকে চাঁদে সাঈদীর চেহারা দেখতে পাবার ঘোষণা এই কথাগুলোকেই প্রতিফলিত করে। ঘটনাগুলো ক্লিশে কিন্তু কী চিরন্তন! ছফা কোন নির্দিষ্ট ধর্মে সরাসরি বিশ্বাসী হয়ত ছিলেননা কিন্তু তাঁর লেখায় ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা কখনো আসেনি, এসেছে ধর্মকে বদলে দেয়া সুবিধাবাদী মানুষগুলোকে মুখ ভ্যাংচানী। ছফা ভয়ানক সাহসী ছিলেন, কোন লুকোছাপাই ছিলোনা তাঁর মাঝে। মানুষকে কথার হুল যেমন ফোটাতে পারতেন, সম্মানও তেমনই করতেন। আজকের 'প্রগতিশীল' লেখক-বুদ্ধিজীবী মহল কি শিক্ষা নেবেন এখান থেকে?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পটি পড়ার অনুভূতি অনেকখানিই ফিরিয়ে দিলো 'গন্তব্য' গল্পটি। ভীষণ ভালো লেগেছে 'পদাঘাতের পটভূমি' (সংলাপ গুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়), 'নিহত নক্ষত্র', 'আস্বাদ', 'প্রতিপক্ষ', 'কবি' আর শেষে অবশ্যই ছফার বিটকেলে সেন্স অফ হিউমার এর সামান্য পরিচয়বাহক গল্প 'কাজলী'।
আহমদ ছফা গত হয়েছেন বেশ আগে কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তাঁকে নক্ষত্র বানিয়ে রেখেছে। খুব বড় নক্ষত্র যখন 'মারা যায়' তা পর্যায়ক্রমে প্রচণ্ড উজ্জ্বল মহাজাগতিক বিস্ফোরণ 'সুপারনোভা' তে পরিণত হয়। আমাদের মার খেতে অভ্যস্ত, নিঃস্পৃহ, নিরুদ্যম সমাজেও এমন একটি বিস্ফোরণ এখন খুব দরকার। সময়ের জন্য কিছুই থেমে থাকেনা। একসময় নিশ্চয়ই এমন একটি সুপারনোভীয় বিস্ফোরণ হবে। ততদিন পর্যন্ত ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' কিংবা 'একজন আলী কেনানের উত্থান পতন' কিংবা 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা' ইত্যাদি রচনাগুলোর মধ্যে দিয়ে বিস্ফোরণের বারুদ জমতে থাকুক। show less
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষদের জীবন যাপনের ধরন, গতি প্রকৃতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবার জন্য সমরেশ বসু সময়ে সময়ে 'কালকূট' হয়েছেন, মিশেছেন নানা ধরনের মানুষের সাথে আর সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও ভ্রমণবৃত্তান্ত নিয়ে এই নামেই লিখেছেন আত্নচরিতমূলক বেশ কিছু গ্রন্থ। 'অমৃত বিষের পাত্রে' ও তেমনি আরেকটি সফরনামা। অকুস্থল এবার ভারতরাজধানী দিল্লী। বইটির শুরু হয়েছে লেখকের কলকাতার প্রচণ্ড খ্যাতির ক্লান্তিকর জীবন থেকে ক্ষণিক নির্বাসন নিয়ে হিন্দিভাষী দিল্লীতে কালকূট ছদ্মনামী হয়ে থাকার প্রয়াস দিয়ে; যেখানে ভক্তরা কেউ লেখককে চিনে ফেলে show more জ্বালাতন করবে এই ভয় থাকবেনা। এর আগে কালকূটের 'কোথায় পাবো তারে' পড়া ছিলো। মূলত 'কোথায় পাবো তারে'র মুগ্ধতাই এই বইটি হাতে নেবার জন্য দায়ী কিন্তু 'কোথায় পাবো তারে'র সেই ভালো লাগাটা এখানে একেবারেই আসেনি। কেন আসেনি সেটি ব্যাখা করতে গেলে আগে 'কোথায় পাবো তারে' কে নিয়ে বেশ কিছু কথা বলতে হয়।
'কোথায় পাবো তারে'ও ঠিক এভাবেই কালকূটের অনির্দিষ্ট গন্তব্যের অভিমুখে যাত্রা দিয়ে শুরু হয়। তারপরে তাঁর সাথে দেখা হয়ে যায় ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী ঝিনির। ঝিনি কালকূটের ভক্ত বললে কম বলা হবে, লেখক হিসেবে তাঁকে রীতিমত দেবতা জ্ঞান করে। শুধু ঝিনিই নয়, তার গোটা পরিবারই দেখা যায় কালকূটের নিষ্ঠাবান পূজারী। ঝিনির মা মোটামুটি স্থূল ভাবে আশা করেই নেন কালকূটের সাথে ঝিনির প্রেম/ পরিণয় হয়েই যাচ্ছে। তবে কালকূটকে ধরা যায়না। কালকূট মানে প্রবল বিষ। সেই বিষে ঝিনিকে একরকম দংশিয়ে কালকূট তার আপন পথে ফিরে যায় নায়কের বেশে। উপন্যাসে মুগ্ধতার অন্যান্য এতগুলো উপকরণ ছিলো যে ঝিনির আবেগের বাহুল্যময় (আমার মতে) এই অংশগুলো খুব একটা গায়ে মাখিনি। এবার 'অমৃত বিষের পাত্রে' পড়তে গিয়ে সেই গা করাটা কিছুটা করতেই হল, কালকূটের ওপর তাঁর নারী ভক্তদের অসহনীয় 'অত্যাচার' এর লম্বা বিবরণী জেনে!
'অমৃত বিষের পাত্রে'র কাহিনী গড়ে উঠেছে লেখকের দিল্লীতে ইচ্ছেকৃত নির্বাসন কালীন সময়ে নারী ভক্তদের ভালোবাসায় সেই নির্বাসন পণ্ড হয়ে যাওয়া নিয়ে! এখানে ভক্ত দুজন। একজন সাহিত্যের ছাত্রী, আরেকজন উঁচু পর্যায়ের কল গার্ল। ভক্ত বলেছি বটে, কার্যত এঁরাও লেখকের পূজারীই। ইংরেজী সাহিত্যে পড়ুয়া কবি হেনার 'দেবতা' কালকূট। আবার প্রকাশ্য দিবালোকে অন্তর্বাস পুড়িয়ে বিদ্রোহ করা প্রচণ্ড দারুপ্রেমী 'স্বৈরিণী' রঞ্জিতা রিজভীর পাপবোধ মুছে দেবার পরশপাথরও সেই কালকূটই। রঞ্জিতা হিন্দু ঘরের মেয়ে হয়ে মুসলমান অধ্যাপককে বিয়ে করে রঞ্জিতা রিজভী হয়, রঞ্জিতা রিজভী রাম খায়, রঞ্জিতা রিজভী দশজনের বিচারে বেশরম, বাজে মেয়েলোক। রঞ্জিতা রিজভীর কাপড় বেসামাল, শরীর যেন আগুনের কুন্ড (তা হোক। কালকূটের ওসবে রুচি নেই, চোখ যায়না),রঞ্জিতা রিজভীর পরিবার পতিতাবৃত্তির সাথে জড়িত। রঞ্জিতা রিজভী কবিতা লেখে, সাহিত্য সমালোচনা করে। রঞ্জিতা রিজভীর কালকূটের চোখে চোখ পড়লে সব পাপবোধ ধুয়ে মুছে যায়। রঞ্জিতা রিজভী শুধুই কালকূটকে জ্বালাতন করে মারে। রঞ্জিতা রিজভী কৌশলে কালকূটের হোটেল রুম নাম্বার, ফোন নাম্বার জেনে নিয়ে যায়। গভীর রাতের দিল্লীতে মাতাল রঞ্জিতাকে নিয়ে টাঙ্গায় চড়ে কালকূট দিল্লীর রাতের রুপ অবলোকন করে। কালকূট জানে, রঞ্জিতা আসলে অমৃত। কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছে বিষ। কালকূটও কঠিন বিষ। অতএব, বিষে বিষক্ষয় ঘটিয়ে সবটুকু বিষ নিজে ধারন করে রঞ্জিতা রিজভীকে শুধুই 'অমৃত' করে দিয়ে কালকূট আবার শুরু করে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা। ভালো লাগলো কী খুব?
কালকূট সম্পর্কে পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা না থাকলে 'অমৃত বিষের পাত্রে' কেমন লাগতো বলা মুশকিল। আগের বইয়ের স্মৃতি এই বইটির গুণ বিচারে দ্বিধাগ্রস্ত করে বইকি! ভালো লেগেছে বইয়ের ছোট ছোট হিউমারগুলো। সেদিক দিয়ে ভালোই চলছিলো, রঞ্জিতা রিজভী এসে আমার সব গোলমাল করে দিল!
পুনশ্চঃ মেয়ে ভক্তের মাথা কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে যাবার বেলায় তাকে ফিলোসফির পাঠ দেয়ার ক্ষেত্রে হিমু চরিত্রটিই সর্বোৎকৃষ্ট! show less
'কোথায় পাবো তারে'ও ঠিক এভাবেই কালকূটের অনির্দিষ্ট গন্তব্যের অভিমুখে যাত্রা দিয়ে শুরু হয়। তারপরে তাঁর সাথে দেখা হয়ে যায় ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী ঝিনির। ঝিনি কালকূটের ভক্ত বললে কম বলা হবে, লেখক হিসেবে তাঁকে রীতিমত দেবতা জ্ঞান করে। শুধু ঝিনিই নয়, তার গোটা পরিবারই দেখা যায় কালকূটের নিষ্ঠাবান পূজারী। ঝিনির মা মোটামুটি স্থূল ভাবে আশা করেই নেন কালকূটের সাথে ঝিনির প্রেম/ পরিণয় হয়েই যাচ্ছে। তবে কালকূটকে ধরা যায়না। কালকূট মানে প্রবল বিষ। সেই বিষে ঝিনিকে একরকম দংশিয়ে কালকূট তার আপন পথে ফিরে যায় নায়কের বেশে। উপন্যাসে মুগ্ধতার অন্যান্য এতগুলো উপকরণ ছিলো যে ঝিনির আবেগের বাহুল্যময় (আমার মতে) এই অংশগুলো খুব একটা গায়ে মাখিনি। এবার 'অমৃত বিষের পাত্রে' পড়তে গিয়ে সেই গা করাটা কিছুটা করতেই হল, কালকূটের ওপর তাঁর নারী ভক্তদের অসহনীয় 'অত্যাচার' এর লম্বা বিবরণী জেনে!
'অমৃত বিষের পাত্রে'র কাহিনী গড়ে উঠেছে লেখকের দিল্লীতে ইচ্ছেকৃত নির্বাসন কালীন সময়ে নারী ভক্তদের ভালোবাসায় সেই নির্বাসন পণ্ড হয়ে যাওয়া নিয়ে! এখানে ভক্ত দুজন। একজন সাহিত্যের ছাত্রী, আরেকজন উঁচু পর্যায়ের কল গার্ল। ভক্ত বলেছি বটে, কার্যত এঁরাও লেখকের পূজারীই। ইংরেজী সাহিত্যে পড়ুয়া কবি হেনার 'দেবতা' কালকূট। আবার প্রকাশ্য দিবালোকে অন্তর্বাস পুড়িয়ে বিদ্রোহ করা প্রচণ্ড দারুপ্রেমী 'স্বৈরিণী' রঞ্জিতা রিজভীর পাপবোধ মুছে দেবার পরশপাথরও সেই কালকূটই। রঞ্জিতা হিন্দু ঘরের মেয়ে হয়ে মুসলমান অধ্যাপককে বিয়ে করে রঞ্জিতা রিজভী হয়, রঞ্জিতা রিজভী রাম খায়, রঞ্জিতা রিজভী দশজনের বিচারে বেশরম, বাজে মেয়েলোক। রঞ্জিতা রিজভীর কাপড় বেসামাল, শরীর যেন আগুনের কুন্ড (তা হোক। কালকূটের ওসবে রুচি নেই, চোখ যায়না),রঞ্জিতা রিজভীর পরিবার পতিতাবৃত্তির সাথে জড়িত। রঞ্জিতা রিজভী কবিতা লেখে, সাহিত্য সমালোচনা করে। রঞ্জিতা রিজভীর কালকূটের চোখে চোখ পড়লে সব পাপবোধ ধুয়ে মুছে যায়। রঞ্জিতা রিজভী শুধুই কালকূটকে জ্বালাতন করে মারে। রঞ্জিতা রিজভী কৌশলে কালকূটের হোটেল রুম নাম্বার, ফোন নাম্বার জেনে নিয়ে যায়। গভীর রাতের দিল্লীতে মাতাল রঞ্জিতাকে নিয়ে টাঙ্গায় চড়ে কালকূট দিল্লীর রাতের রুপ অবলোকন করে। কালকূট জানে, রঞ্জিতা আসলে অমৃত। কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছে বিষ। কালকূটও কঠিন বিষ। অতএব, বিষে বিষক্ষয় ঘটিয়ে সবটুকু বিষ নিজে ধারন করে রঞ্জিতা রিজভীকে শুধুই 'অমৃত' করে দিয়ে কালকূট আবার শুরু করে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা। ভালো লাগলো কী খুব?
কালকূট সম্পর্কে পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা না থাকলে 'অমৃত বিষের পাত্রে' কেমন লাগতো বলা মুশকিল। আগের বইয়ের স্মৃতি এই বইটির গুণ বিচারে দ্বিধাগ্রস্ত করে বইকি! ভালো লেগেছে বইয়ের ছোট ছোট হিউমারগুলো। সেদিক দিয়ে ভালোই চলছিলো, রঞ্জিতা রিজভী এসে আমার সব গোলমাল করে দিল!
পুনশ্চঃ মেয়ে ভক্তের মাথা কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে যাবার বেলায় তাকে ফিলোসফির পাঠ দেয়ার ক্ষেত্রে হিমু চরিত্রটিই সর্বোৎকৃষ্ট! show less
After two rather disappointing issues, Asterix and Obelix's third adventure 'Asterix and the Goths' turned out to be a brilliant work. This issue's storyline is a bit complex. The druid Getafix wins the title 'Druid of the year' and became the target of the Goths from Germania, the very neighbouring state of the Roman occupied Gaul. The barbarian Goths kidnapped the druid and kept him captive. They want him to make them the magic potion that can give them superhuman strength. In order to conquer the Gaul and Germania, Goths need that superhuman strength. It's now totally up to Asterix and Obelix to rescue the druid and get him back to the village. In the rescue mission, they get involved in so many complex happenings; one incident leads them to another. This issue is a very funny one. Subtle jokes are cracked very often. Another important thing is the naming of the characters. Naming a Brit Valuaddetax (Value Added Tax), a German Electric or Euphoric is a very clever idea and these names also almost suggest the attributes of the respective characters. Very intellectual and very enjoying storyline. I particularly loved the ending of the story where our protagonists broke the unity of their enemies by engaging them in fighting one another using their greed for power and made it certain that they will not be disturbed in many years by the Goths.
A true classic comic book. Books like this can make the lives of children more enjoyable and let's not forget about the historical show more references as well. At times they can be quite didactic as well. Great work by René Goscinny and Albert Uderzo. show less
A true classic comic book. Books like this can make the lives of children more enjoyable and let's not forget about the historical show more references as well. At times they can be quite didactic as well. Great work by René Goscinny and Albert Uderzo. show less
'নষ্ট নীড়' উপন্যাসিকাটির গল্প বেশ নাটকীয়, হয়তো কতকটা ধনী-গরীব নির্বিশেষে আমাদের দেশের পরিবারগুলোর প্রাপ্তবয়স্কা নারীদের মাথা খেয়ে ফেলা ১০০০ পর্ব ধরে বউ-শাশুড়ীর দ্বন্দ্ব দেখানো সিরিয়ালগুলোর মতই (ভক্তদের মার বোধহয় একটাও মাটিতে পড়বেনা! রবীন্দ্রনাথকে রীতিমত মেলোড্রামাটিক বলে ফেলছি! সিরিয়াল ভক্ত সম্মানীয়া নারীদের মারের ভয়ই বা এড়াই কি করে?!) 'নষ্ট নীড়' অনেকাংশেই নারী মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ। নবীন লেখক অমল নেহাত খেলাচ্ছলে কোন উচ্চাশা ব্যতিরেকেই তার বউঠানের কাছে নিজের লেখা প্রকাশ করে। বউঠানের উৎসাহে ক্রমশ অমল একদিন বড় লেখকও হয়ে ওঠে। একদিন পুরো জগত সংসারে যে অমল এর show more লেখার একমাত্র পাঠক ছিল তার বউঠান চারুলতা, পরবর্তীতে সেই অমলেরই দেশব্যাপী হাজার হাজার পাঠক-পাঠিকা হয়ে দাঁড়ায়। দেবরের এই প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা হয়তো সাময়িক ভাবে চারুকে আনন্দিত করে, কিন্তু বেশীদিন তা স্থায়ী হয়না। অমল আর শুধু চারুর জন্য লিখছেনা, বরং লিখছে অসংখ্য মানুষের জন্য। প্রিয় মানুষটিকে এভাবে ভাগাভাগি করে পেতে কোন নারী চাইবেন? কোন মানুষটি আসলে চাইবে? (তবে নারীরা বোধহয় এ ব্যাপারে একটু বেশীই রক্ষণাত্নক!) অমলের জনপ্রিয়তা চারুর মনে যে অস্ফুট কষ্টের জন্ম দেয় সেটিকে হয়ত নাটকীয়ই মনে হবে, তবে এটিই তো জীবন! এভাবেই তো মানুষ অনুভব করে। ঈর্ষা মহৎ কোন গুণ নয় কিন্তু তবু ঈর্ষা করবার এই ভুলটাই মনে করিয়ে দেয় প্রাণীটি মানুষ। যন্ত্র কিংবা স্বল্পবুদ্ধির অন্য কোন প্রাণী নয়। 'নষ্ট নীড়' রবীন্দ্রনাথের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার স্বল্প পরিচয়বাহকও বটে, সময়ে সময়ে হঠাৎ যেন তাঁর ঠাট্টা মেশানো গম্ভীর কন্ঠস্বর উঁকি দেয়! সর্বোপরি মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালীন সময়ে চারপাশের মানুষগুলোকে খুব ভালো পড়তে পারতেন। 'নষ্ট নীড়' তাই কোন মেলোড্রামার গল্প নয়, সমাজকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে দেখার গল্প।
পূর্বেই সিরিয়াল ভক্ত নারীদের হাতে 'নিগৃহীত' হবার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছি, তবুও একটি কথা না বললেই নয়। রবীন্দ্রনাথ ও আজকের ডেইলী সোপ নামক সাবানের মত তিতকুটে সিরিয়ালগুলোর নির্মাতারা কার্যত একই কাজ করেছেন! দুটোতেই মানবচরিত্রের সরু সরু গলিপথ আর সম্পর্কগুলোর যথেচ্ছ ওঠানামার চিত্র এসেছে। দু ধরনের দুটো কাজেই ফলাফলটা এক। পার্থক্য হল একজন শ'খানেক বছর আগে বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করে উপলব্ধির বেদনাটা বলতে চেয়েছিলেন। আর বাকিরা সেই শত বছর আগের দর্শন করাটাকেই পুঁজি করে 'পরের পর্বটায় কি হতে যাচ্ছে' এই মূলা ঝুলিয়ে মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছেন। show less
পূর্বেই সিরিয়াল ভক্ত নারীদের হাতে 'নিগৃহীত' হবার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছি, তবুও একটি কথা না বললেই নয়। রবীন্দ্রনাথ ও আজকের ডেইলী সোপ নামক সাবানের মত তিতকুটে সিরিয়ালগুলোর নির্মাতারা কার্যত একই কাজ করেছেন! দুটোতেই মানবচরিত্রের সরু সরু গলিপথ আর সম্পর্কগুলোর যথেচ্ছ ওঠানামার চিত্র এসেছে। দু ধরনের দুটো কাজেই ফলাফলটা এক। পার্থক্য হল একজন শ'খানেক বছর আগে বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করে উপলব্ধির বেদনাটা বলতে চেয়েছিলেন। আর বাকিরা সেই শত বছর আগের দর্শন করাটাকেই পুঁজি করে 'পরের পর্বটায় কি হতে যাচ্ছে' এই মূলা ঝুলিয়ে মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছেন। show less
উপহাস যিনি করেন, প্রচলিত সমাজের নিয়ম অনুসারে ধরেই নেয়া হয়, তিনি, যাকে উপহাস করলেন, তার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধি ধরেন। বুদ্ধিমত্তার এই পার্থক্যই উপহাসকারীর ভেতরে উপহাসিত ব্যক্তির ওপর এক ধরনের অধিকারবোধের জন্ম দেয়; নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হবার অধিকার। মানব চরিত্রে যুগ যুগ ধরে এটিই আচরিত হয়ে আসছে। এ কারণেই কাউকে মুখ ভেংচি কাটলে মানুষ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, কিছুটা বিপন্ন অনুভব করে, আর মনে মনে হয়ত ভেংচি কেটে দেয়া ব্যক্তির সাথে নিজের বুদ্ধিমত্তার কোথাও বেশকম হয়ে গেলো কী না তা হিসেব করতে থাকে। ভেংচি খাওয়ার দলে কেউ আসলে থাকতে চায় না। সবাই মুখ ভ্যাংচাতেই চায়। আবার, show more সমাজে এমন এক শ্রেনীর মানুষও আছেন যারা তাদের সকল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, উপহাস ও মুখ ভ্যাংচানিকে একটি বিন্দুতেই কেবল কেন্দ্রীভূত করেন। সেই বিন্দুটি হল যৌনতা। পৃথিবীর যে কোন ভাষায়ই কাউকে অপমানের চূড়ান্ত করতে হলে যৌনতাকেই টেনে আনতে হয়। সবচেয়ে খারাপ খারাপ গালিগুলো যৌনতা কেন্দ্রিক। সবচেয়ে মুখরোচক নিন্দা যৌনতা কেন্দ্রিক। অপমান করবার সংক্ষিপ্ততম রাস্তা, সেও যৌনতা কেন্দ্রিক-ই। খালি গায়ে শর্টস পরে ক্লাসরুমে যাওয়াটাকে সমাজ যেমন নিন্দনীয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তিরস্কারের অস্ত্র হিসেবে যৌনতার ভাষাও ঠিক একইভাবে অরুচিকর বলেই নির্ধারিত হয়েছে। যৌনতা সংক্রান্ত শব্দের প্রয়োগে বিদ্রুপ করাটায় খুব একটা মেধার প্রয়োজন আসলে পড়েনা। মানব শরীরের তিন-চারটি প্রত্যঙ্গের নাম ও তাদের সমার্থক কয়েকটি শব্দ জানলেই চলে। বাকিটা কেবল বিদ্রুপের লক্ষ্য ব্যক্তির পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের সাথে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কারো সাথে কাল্পনিক যৌনক্রিয়া ঘটিয়ে সেই শব্দগুলোর যথার্থ প্রয়োগ মাত্র। যৌনতার বুদ্ধি সকল প্রাণীরই সহজাত বুদ্ধি। বিনা আয়াসেই এ বুদ্ধির উদ্ভব ঘটানো সম্ভব। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ যদি মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হয়, ব্যঙ্গের সকল উপকরণকে যৌনতায় কেন্দ্রীভূত করাটা চিন্তার সীমাবদ্ধতার পরিচায়ক।
‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’ হুমায়ূন আজাদের ‘প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ’ উপন্যাস। হাসির উদ্রেককারী একটি বাক্যও এখানে নেই। আছে শুধুই নিরেট কাঠখোট্টা ব্যঙ্গে মানব চরিত্রের যৌনকাতর সত্ত্বাটির বিশ্লেষণ। উত্তম পুরুষে বর্ণিত গল্পের নায়ক মাহবুব একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ব্রিজ বানানো যার পেশা। সেতু বলার চেয়ে ব্রিজ বলাটাই তার কাছে শ্রেয়তর। নদীর ওপর ব্রিজ বানাতে বানাতে মাহবুব একসময় মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রিজ দেখতে পায়। প্রতিটি সম্পর্কই আসলে এক একটি ব্রিজ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানবিক বোধগুলো। কিন্তু মানুষ যখন প্রবল ভাবে যৌনতৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে, সম্পর্কের ব্রিজ গুলোকে সব একে একে ভেঙ্গে পড়তে দেখে মাহবুব, ভেঙ্গে যায় তার মানবিক বোধগুলো। এই ভেঙ্গে পড়ার গল্পটিকে ফোটাতে হুমায়ূন আজাদ ব্যবহার করেছেন তাঁর একান্ত নিজস্ব ঘরানার গদ্যের। মাহবুবের যৌনকাতরতার ভেতর দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন সমাজের চিত্রটা, যেখানে কমবেশী সবাইই একইরকম তৃষ্ণার্ত। হুমায়ূন আজাদের ব্যঙ্গের ধরণটা তাঁর নিজের মতই। সরাসরি কথার আধিক্য বেশী, তবে খুব শ্রতিমধুর কিছু নয়। শিল্পিত কিছু তো নয়ই। প্রচুর অপ্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবালুতা আছে উপন্যাসে, একটা সময়ে যা বিরক্তির উদ্রেক করে। বাড়ীর কাজের মেয়ে কদবানুর “বুকের দুটি পেঁপে” কিংবা মাহবুবের হস্তমৈথুন কে “মধুর চাক ভেঙ্গে মধু বের করা” নাম দিয়ে তার হাস্যকর বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসকে দীর্ঘায়িত করেছেন। এ ধরনের ভাষার প্রয়োগ খুব বেশী নেই মূলধারার প্রচলিত সাহিত্যে, সেটিরই সুযোগ লেখক নিতে চেয়েছিলেন কী না কে জানে! প্রায়ই মনে হয়েছে স্রেফ এই শব্দগুলোর প্রয়োগের উছিলাতেই ১৪৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস তিনি লিখেছেন!
হুমায়ূন আজাদের পর্যবেক্ষণ বেশ তীক্ষ্ণ, এটি তিনি নিজেও খুব ভালো উপলব্ধি করতে পারতেন এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে তাঁকে প্রায়শয়ই বেশ উদগ্রীব ঠেকেছে। এ কারণেই উপন্যাসের বিভিন্ন অংশ কেবল তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রদর্শনী-ই, সাহিত্য সেখানে কমই ছিলো।
প্রিটেনশন, ভাবালুতা, পর্যবেক্ষণ, মানব চরিত্রের বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে ভালো মন্দ দুই-ই ছিলো ‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’-তে, তবে আমার বিচারে মন্দ দিকই বেশী লেগেছে। লেবু বেশী কচলালে তিতা হয়, অনর্থক যৌনতা উপন্যাসটিকে নোংরাই করেছে কেবল।
বিশেষ সতর্কীকরণঃ ১৮ বছরের নিচে কিশোর কিশোরীদের এই বইটি নিজ দায়িত্বে পড়তে হবে। বাবা-মা টের পেলে তাদেরই পিঠের ওপর সব কিছু ভেঙ্গে পড়তে পারে! show less
‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’ হুমায়ূন আজাদের ‘প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ’ উপন্যাস। হাসির উদ্রেককারী একটি বাক্যও এখানে নেই। আছে শুধুই নিরেট কাঠখোট্টা ব্যঙ্গে মানব চরিত্রের যৌনকাতর সত্ত্বাটির বিশ্লেষণ। উত্তম পুরুষে বর্ণিত গল্পের নায়ক মাহবুব একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ব্রিজ বানানো যার পেশা। সেতু বলার চেয়ে ব্রিজ বলাটাই তার কাছে শ্রেয়তর। নদীর ওপর ব্রিজ বানাতে বানাতে মাহবুব একসময় মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রিজ দেখতে পায়। প্রতিটি সম্পর্কই আসলে এক একটি ব্রিজ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানবিক বোধগুলো। কিন্তু মানুষ যখন প্রবল ভাবে যৌনতৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে, সম্পর্কের ব্রিজ গুলোকে সব একে একে ভেঙ্গে পড়তে দেখে মাহবুব, ভেঙ্গে যায় তার মানবিক বোধগুলো। এই ভেঙ্গে পড়ার গল্পটিকে ফোটাতে হুমায়ূন আজাদ ব্যবহার করেছেন তাঁর একান্ত নিজস্ব ঘরানার গদ্যের। মাহবুবের যৌনকাতরতার ভেতর দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন সমাজের চিত্রটা, যেখানে কমবেশী সবাইই একইরকম তৃষ্ণার্ত। হুমায়ূন আজাদের ব্যঙ্গের ধরণটা তাঁর নিজের মতই। সরাসরি কথার আধিক্য বেশী, তবে খুব শ্রতিমধুর কিছু নয়। শিল্পিত কিছু তো নয়ই। প্রচুর অপ্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবালুতা আছে উপন্যাসে, একটা সময়ে যা বিরক্তির উদ্রেক করে। বাড়ীর কাজের মেয়ে কদবানুর “বুকের দুটি পেঁপে” কিংবা মাহবুবের হস্তমৈথুন কে “মধুর চাক ভেঙ্গে মধু বের করা” নাম দিয়ে তার হাস্যকর বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসকে দীর্ঘায়িত করেছেন। এ ধরনের ভাষার প্রয়োগ খুব বেশী নেই মূলধারার প্রচলিত সাহিত্যে, সেটিরই সুযোগ লেখক নিতে চেয়েছিলেন কী না কে জানে! প্রায়ই মনে হয়েছে স্রেফ এই শব্দগুলোর প্রয়োগের উছিলাতেই ১৪৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস তিনি লিখেছেন!
হুমায়ূন আজাদের পর্যবেক্ষণ বেশ তীক্ষ্ণ, এটি তিনি নিজেও খুব ভালো উপলব্ধি করতে পারতেন এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে তাঁকে প্রায়শয়ই বেশ উদগ্রীব ঠেকেছে। এ কারণেই উপন্যাসের বিভিন্ন অংশ কেবল তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রদর্শনী-ই, সাহিত্য সেখানে কমই ছিলো।
প্রিটেনশন, ভাবালুতা, পর্যবেক্ষণ, মানব চরিত্রের বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে ভালো মন্দ দুই-ই ছিলো ‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’-তে, তবে আমার বিচারে মন্দ দিকই বেশী লেগেছে। লেবু বেশী কচলালে তিতা হয়, অনর্থক যৌনতা উপন্যাসটিকে নোংরাই করেছে কেবল।
বিশেষ সতর্কীকরণঃ ১৮ বছরের নিচে কিশোর কিশোরীদের এই বইটি নিজ দায়িত্বে পড়তে হবে। বাবা-মা টের পেলে তাদেরই পিঠের ওপর সব কিছু ভেঙ্গে পড়তে পারে! show less
Boring, repetitive. Not funny, not entertaining at all. In this second adventure, Asterix and Obelix go out to find their village druid Getafix (Get A Fix) a new golden sickle as the druid breaks his old one and without the golden sickle the druid can't make the magic potion that gives Asterix superhuman strength. During the adventure, Asterix and Obelix kept coming across the same Roman legionaries who arrested them again and again to bring them before the Roman prefect. The prefect is too liberal and kind. Every time the protagonists are brought before him, he releases them as each time they showed great bravery by demolishing his own Roman soldiers with their bare hands. The gluttony of Obelix and his craving for wild boars every now and then are meant to be funny but they couldn't bring in much humour. Like the first issue, the villains here are very honest. They confess their sins once they are asked and after confessing, their drive to go to the jail is 'exemplary'. It's really amazing to have such friendly enemies!
Bad storyline with great illustrations. I found it 'it was okay' and hence, according to the Goodreads rating system, two stars.
Bad storyline with great illustrations. I found it 'it was okay' and hence, according to the Goodreads rating system, two stars.
So far, it is the worst book I have read this year. The story itself starts very disgustingly. A journalist, on his 90th birthday, wants to have sex with a virgin. He calls the local madam, Rosa Cabarcas and she arranges a 15 year old girl for him. The journalist, in his 90 long years, never found love. All he wants is just to please himself physically and to test his 'performance' at this age. When the journalist meets the arranged girl, he discovered he fell in love for the first time in his life. The plot is somewhat eccentric and ambitious but the execution is not up to the mark. The whole plot is destroyed due to pretension. The repetitive description of the girl's naked body is also very disturbing. One has to be the old journalist of the novel while reading for enjoying the book. I tried really hard, but couldn't see myself in his place.
For books like this, I think I am going to make another bookshelf. And I shall name it 'Total waste of time'.
For books like this, I think I am going to make another bookshelf. And I shall name it 'Total waste of time'.
The Invisible Man is the sad story of an unfortunate scientist Griffin, whose desire for power and fame led him to madness and ultimately to his saddening demise. The environment of the book is also somewhat depressing. From the opening page to the last one, some dark feeling grasped me while reading this little book. Being the invisible man, Griffin is no more trusted by anyone and for his survival he got himself involved in several unfortunate events. All these led him to his insanity and turned him into an evil creature, a monster.I could almost feel the fear when Griffin was terrorizing the village using his invisible self. I also felt the pain and agony The Invisible Man was suffering from. There were times I became sympathetic to Griffin and there were times I wanted to slay him as well.
The short book takes very little time to read. The events are fast. One incident gives rise to another and then another and it goes on. The dark narrative style is brilliantly executed by Wells. It keeps the pressure on your chest when you're into this book. I kinda bought the scientific explanation how Griffin found a way to be invisible. He changed his body's refractive index to that of air so that it can absorb all the light and reflect none and thus, becomes invisible. Other than this, there is very little science in the book and it's mostly a fantasy. But what the heck, it's a great story. I loved the climax specially. It was very logical and inevitable. I loved the 'duality' show more of the central character as well. You don't come across those books everyday where the same person plays both the roles of protagonist and antagonist. A very good read indeed. show less
The short book takes very little time to read. The events are fast. One incident gives rise to another and then another and it goes on. The dark narrative style is brilliantly executed by Wells. It keeps the pressure on your chest when you're into this book. I kinda bought the scientific explanation how Griffin found a way to be invisible. He changed his body's refractive index to that of air so that it can absorb all the light and reflect none and thus, becomes invisible. Other than this, there is very little science in the book and it's mostly a fantasy. But what the heck, it's a great story. I loved the climax specially. It was very logical and inevitable. I loved the 'duality' show more of the central character as well. You don't come across those books everyday where the same person plays both the roles of protagonist and antagonist. A very good read indeed. show less
Okay, I'm not sure if I'm 'too grown up' for enjoying Asterix series but I didn't like the humours much. The plot was very linear and the storyline lacks complexity. All the villains are made too naive and downgraded in terms of their intelligence. The protagonists can subdue them very easily with their 'superior' intellect. At times things became too trivial. It basically occurred to me as an alternate world created from a hardcore French (or more accurately Gaulish) nationalist view where the Romans are bashed and belittled every now and then. Almost all the activities of the protagonists are meant to instil the 'belief' into reader's mind that 'Romans are mentally retarded and Gauls are the big brains'. This is a classic series and everyone talks about it. I am feeling kind of guilty rather that I failed to enjoy Asterix the Gaul but then again, this is only the first instalment of a 33 issue long Asterix series. I intend to read all the adventures of Asterix and Obelix so, I'm hopeful.
I liked the time frame (during the reign of Julius Caesar) where the characters belong to. The drawing is absolutely splendid, and perhaps too good for such a storyline. All the 3 stars for the illustrations!
I liked the time frame (during the reign of Julius Caesar) where the characters belong to. The drawing is absolutely splendid, and perhaps too good for such a storyline. All the 3 stars for the illustrations!
‘যশোহা বৃক্ষের দেশে’ হুমায়ূন আহমেদের আমেরিকা ভ্রমণ লগ। নর্থ ডাকোটাতে পিএইচডি’র ছাত্র থাকাকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে এর আগে তিনি লিখেছেন ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ আর ‘মে ফ্লাওয়ার’। এই বইটির রচনাকাল ১৯৯৪ সাল, যখন তিনি ‘আগুণের পরশমণি’ চলচ্চিত্রের কাজ করছেন। যখন হুমায়ূন আহমেদ ‘হুমায়ূন আহমেদ’ হয়ে উঠেছেন। আমাদের চোখে বিষম অদ্ভুত আমেরিকান জাতির বিচিত্র জীবন পদ্ধতি তাঁর অনেক লেখাতেই ঘুরে ফিরে এসেছে। এ বইটি আমেরিকা সংক্রান্ত তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার একরকম বর্ধিত অংশ বলা চলে। ছোট ছোট অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন সপরিবারে আমেরিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, যে আমেরিকা তাঁর ছাত্রাবস্থার আমেরিকা show more থেকে অনেকটাই পাল্টে গেছে এক যুগের ব্যবধানে। নব্বই এর দশকের হুমায়ূন আহমেদ, অতএব, বইটির মান নিয়ে প্রশ্নই উঠতে পারেনা!
যৌনতা নিয়ে আমাদের ও আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে একটি সুস্পষ্ট, সুবৃহৎ ও আপাতত টপকানোর অতীত পার্থ্যকের দেয়াল আছে। বিশ্বায়নের যুগে এ দেয়ালের উচ্চতা অবশ্য ইদানিং ধীরে ধীরে কমে আসছে, ইন্টারনেট ও আমেরিকান চলচ্চিত্রের সহজলভ্যতার কারণে। আমাদের দৈনন্দিন অনেক আচরণই এখন বেশ আমেরিকানাইজড হয়ে পড়ছে। তবে কিছু ব্যাপার এখানে এখনও অলঙ্ঘ্যনীয় ও অচিন্তনীয়। আমেরিকার অনেক অঞ্চলে ‘টপলেস’ রেস্টুরেন্ট আছে, যেখানে নারী ওয়েটারদের ঊর্ধাঙ্গ থাকে উন্মুক্ত। ‘হোটেল গ্রেভার ইন’-এ এই ধরণের রেস্টুরেন্ট এর উল্লেখ ছিলো। এবার ‘যশোহা বৃক্ষের দেশে’ পড়ে জানলাম ‘পাপের নগরী’ লাস ভেগাসে বটমলেস রেস্টুরেন্টও চালু হয়ে গেছে, অর্থাৎ এসব জায়গায় নারী ওয়েটাররা কোমরের নিচে কোন কিছু না পরেই টেবিলে খাবার সরবরাহ করেন। এটাও ২০ বছর আগের চিত্র। এখন তাহলে কি হয় এ রেস্টুরেন্ট গুলোতে? জানতে হলে বোধহয় নিজেকেই গিয়ে অভিজ্ঞতা ‘অর্জন’ করে আসতে হবে। কারণ ভেগাস যাত্রা করতে হলে যে কথাটি প্রত্যেককে মাথায় রাখতে হয় তা হল “What happens in Vegas, stays in Vegas”। পাপের নগরীর (সিন সিটি) অভিজ্ঞতা কে আর আমাকে নিজমুখে শোনাতে চাইবেন! সুসভ্য দেশ আমেরিকাতে যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি খোলাখুলি ভাবেই হয়। আমাদের দেশের মত এত হাশ হাশ-লুকোছাপা নেই। টপলেস/ বটমলেস রেস্টুরেন্টগুলোর মত সেখানের পতিতাবৃত্তির ব্যবসাও যথেষ্ট শক্তিশালী। ঢাকার ফার্মগেট, বনানীর ব্যস্ত ফুটপাথে খুব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে যদি এক মুহূর্তের জন্য আপনার গতি হ্রাস পায়, যদি ঢিলে হয়ে যাওয়া জুতোর ফিতে শক্ত করতে থেমে পড়েন, যদি ফুটপাথের ওপর ভাসমান হকারদের সাজিয়ে রাখা পণ্যের ওপর একবার চোখ বোলাতে দাঁড়িয়ে পড়েন, কানের কাছে খুব নিচু স্বরে কেউ আন্তরিকভাবে এসে জিজ্ঞেস করবে “স্যার, লাগবে?”, আমেরিকাতে ওসবের বালাই নেই। সেখানে নাকি হাতে বিজ্ঞাপনের কার্ড দিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা শুনিয়েছেন, “তুমি যদি ফোনে তোমার রুম নাম্বার আমাকে জানিয়ে দাও, আমি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে তোমার দরজায় গিয়ে হাজির হব। আমাকে পছন্দ হলে আমরা একসাথে অনেক মজা করতে পারি। এর জন্য তোমাকে খরচ করতে হবে মাত্র ১০০ ডলার। তুমি যদি আনন্দ আরো বাড়াতে চাও, আমি আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে আসতে পারি। এর জন্য তোমাকে আর মাত্র ১৫০ ডলার খরচ করতে হবে।”
বইটিতে প্রবাসী বাঙালীদের জীবন যাপনের ছোট্ট কিছু চিত্র এসেছে। যাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, আমেরিকাতে পড়াশোনা করে বড় বড় ডিগ্রী অর্জন করেছেন, তাঁদের বেশীর ভাগই সেখানেই থেকে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁরা। অনেকেই আছেন অবৈধ অভিবাসী। এনারা খেটে খান এবং কিভাবে বেঁচে যান, তা এক রহস্য। এঁরাই নাকি দেশকে সবচেয়ে বেশী অনুভব করেন, উচ্চশিক্ষিত বড় পদে চাকুরীরত বাংলাদেশীদের চেয়ে। ১৯৯৪ সালেই হুমায়ূন আহমেদ ধারণা করেছিলেন একদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত করবে অন্য কেউ নয়, এই খেটে খাওয়া অর্ধ/ অল্প শিক্ষিত বাংলাদেশীরাই, তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স এর মাধ্যমে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বাংলাদেশীদের এই বিপরীতমুখী চিত্র দেখে হুমায়ূন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন বারবার। আমেরিকাতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের একটি আচরণের কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছিনা, যা এই বইটি থেকে জেনেছি। প্রায় বেশীরভাগ বাংলাদেশীরাই প্রতি বছর তাদের মা’দের দেশ থেকে নিয়ে আসেন নিজেদের কাছে, কয়েক মাস রেখে আবার দেশে পাঠিয়ে দেন। এই মা’দের আমেরিকাতে কিচ্ছু করবার নেই। তাঁরা ইংরেজী বোঝেননা, তাঁদের নাতি-নাতনীরা বাংলা বোঝেনা। তাঁরা আমেরিকার চুলায় রান্না চড়াতে পারেননা, টিভিতে তাঁদের বোধগম্য কোন অনুষ্ঠানও নেই দেখবার মত। ছেলে এবং ছেলের বউ সারাদিন অফিসে থাকে, কথা বলার লোকও তাই বিশেষ পান না। এত কষ্ট সহ্য করেও এই মা’রা প্রতি বছর আমেরিকা এসে কয়েকমাস থেকে যাচ্ছেন সন্তানের সাথে এটি হুমায়ূনকে খুব মুগ্ধ করে, আমাকেও। কিন্তু আসল চিত্রটা একটু অন্যরকম যা হুমায়ূন কে তাঁর অনুজ ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বুঝিয়ে বলেন। এই সন্তানেরা আসলে গ্রীন কার্ডের সন্ধানে আছেন, যা আমেরিকায় তাঁদের চিরস্থায়ী নাগরিকত্ব নিশ্চিত করবে। প্রথমে মা’র গ্রীন কার্ড নিশ্চিত হলে ধীরে ধীরে সন্তান ও পরিবারের অন্যান্যদেরটাও নিশ্চিত হতে থাকে। প্রতি বছর আমেরিকা এসে কয়েক মাস করে থেকে হাজিরা না দিয়ে গেলে সন্তানদের গ্রীন কার্ড আর পাওয়া হবেনা। জীবনের ক্ষেত্রগুলোতে মুহূর্তে মুহূর্তে এত বাঁক, এত মোড়, এত রঙের পরিবর্তন, ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা অনেকদিন হলো ভুলতে বসেছি। টিকে থাকার জন্য সম্ভাব্য যা কিছু করতে হয়, হয়ত সেটাই ন্যায়। অন্যায় বলে হয়ত কিছুই নেই, কে জানে?
জাপানী চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া’র পৃথিবী বিখ্যাত ছবি ‘রশোমন’ (১৯৫০)। ছবিতে একটি খুন ও ধর্ষণের বিবরণী চারজন চারভাবে দেয়। কোনটির সাথেই কোনটির মিল নেই। ছবির অন্যতম চরিত্র এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। ঈশ্বরের আরাধনায় সারাজীবন উৎসর্গ করা এই ভিক্ষু মানুষের হিংস্রতা, মিথ্যাবাদিতা ও স্বার্থপরতার পরিচয় পেয়ে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে থাকেন। তাঁর বিশ্বাস আরো নড়ে যায় যখন তিনি একটি নবজাতক শিশুকে কুড়িয়ে পান, যার বাবা-মা তাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। শতচ্ছিন্ন বেশের এক হতদরিদ্র কাঠুরে, যার ঘরে ইতোমধ্যে ছয়টি সন্তান আছে, সে ভিক্ষুর কাছে এই নবজাতকের দায়িত্ব নেবার আগ্রহের কথা জানায়। একেবারে অচেনা, হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া এক শিশুর দায়িত্ব নেয়ায় দরিদ্র কাঠুরেকে ভিক্ষু ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে তিনি অবশেষে মানুষের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
আমি হতাশাবাদী নই। তবুও কেন যেন ওই ভিক্ষুর মত এত সহজেই মানব চরিত্রকে বিশ্বাস করে ফেলতে পারিনা। মনে পড়ে যায় পৃথিবীতে টপলেস-বটমলেস রেস্টুরেন্ট এর অস্তিত্ব আছে। যুদ্ধ, ধর্ষণ আছে। আর আছে মা’কে ব্যবহার করার ইতিহাস। show less
যৌনতা নিয়ে আমাদের ও আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে একটি সুস্পষ্ট, সুবৃহৎ ও আপাতত টপকানোর অতীত পার্থ্যকের দেয়াল আছে। বিশ্বায়নের যুগে এ দেয়ালের উচ্চতা অবশ্য ইদানিং ধীরে ধীরে কমে আসছে, ইন্টারনেট ও আমেরিকান চলচ্চিত্রের সহজলভ্যতার কারণে। আমাদের দৈনন্দিন অনেক আচরণই এখন বেশ আমেরিকানাইজড হয়ে পড়ছে। তবে কিছু ব্যাপার এখানে এখনও অলঙ্ঘ্যনীয় ও অচিন্তনীয়। আমেরিকার অনেক অঞ্চলে ‘টপলেস’ রেস্টুরেন্ট আছে, যেখানে নারী ওয়েটারদের ঊর্ধাঙ্গ থাকে উন্মুক্ত। ‘হোটেল গ্রেভার ইন’-এ এই ধরণের রেস্টুরেন্ট এর উল্লেখ ছিলো। এবার ‘যশোহা বৃক্ষের দেশে’ পড়ে জানলাম ‘পাপের নগরী’ লাস ভেগাসে বটমলেস রেস্টুরেন্টও চালু হয়ে গেছে, অর্থাৎ এসব জায়গায় নারী ওয়েটাররা কোমরের নিচে কোন কিছু না পরেই টেবিলে খাবার সরবরাহ করেন। এটাও ২০ বছর আগের চিত্র। এখন তাহলে কি হয় এ রেস্টুরেন্ট গুলোতে? জানতে হলে বোধহয় নিজেকেই গিয়ে অভিজ্ঞতা ‘অর্জন’ করে আসতে হবে। কারণ ভেগাস যাত্রা করতে হলে যে কথাটি প্রত্যেককে মাথায় রাখতে হয় তা হল “What happens in Vegas, stays in Vegas”। পাপের নগরীর (সিন সিটি) অভিজ্ঞতা কে আর আমাকে নিজমুখে শোনাতে চাইবেন! সুসভ্য দেশ আমেরিকাতে যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি খোলাখুলি ভাবেই হয়। আমাদের দেশের মত এত হাশ হাশ-লুকোছাপা নেই। টপলেস/ বটমলেস রেস্টুরেন্টগুলোর মত সেখানের পতিতাবৃত্তির ব্যবসাও যথেষ্ট শক্তিশালী। ঢাকার ফার্মগেট, বনানীর ব্যস্ত ফুটপাথে খুব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে যদি এক মুহূর্তের জন্য আপনার গতি হ্রাস পায়, যদি ঢিলে হয়ে যাওয়া জুতোর ফিতে শক্ত করতে থেমে পড়েন, যদি ফুটপাথের ওপর ভাসমান হকারদের সাজিয়ে রাখা পণ্যের ওপর একবার চোখ বোলাতে দাঁড়িয়ে পড়েন, কানের কাছে খুব নিচু স্বরে কেউ আন্তরিকভাবে এসে জিজ্ঞেস করবে “স্যার, লাগবে?”, আমেরিকাতে ওসবের বালাই নেই। সেখানে নাকি হাতে বিজ্ঞাপনের কার্ড দিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা শুনিয়েছেন, “তুমি যদি ফোনে তোমার রুম নাম্বার আমাকে জানিয়ে দাও, আমি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে তোমার দরজায় গিয়ে হাজির হব। আমাকে পছন্দ হলে আমরা একসাথে অনেক মজা করতে পারি। এর জন্য তোমাকে খরচ করতে হবে মাত্র ১০০ ডলার। তুমি যদি আনন্দ আরো বাড়াতে চাও, আমি আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে আসতে পারি। এর জন্য তোমাকে আর মাত্র ১৫০ ডলার খরচ করতে হবে।”
বইটিতে প্রবাসী বাঙালীদের জীবন যাপনের ছোট্ট কিছু চিত্র এসেছে। যাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, আমেরিকাতে পড়াশোনা করে বড় বড় ডিগ্রী অর্জন করেছেন, তাঁদের বেশীর ভাগই সেখানেই থেকে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁরা। অনেকেই আছেন অবৈধ অভিবাসী। এনারা খেটে খান এবং কিভাবে বেঁচে যান, তা এক রহস্য। এঁরাই নাকি দেশকে সবচেয়ে বেশী অনুভব করেন, উচ্চশিক্ষিত বড় পদে চাকুরীরত বাংলাদেশীদের চেয়ে। ১৯৯৪ সালেই হুমায়ূন আহমেদ ধারণা করেছিলেন একদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত করবে অন্য কেউ নয়, এই খেটে খাওয়া অর্ধ/ অল্প শিক্ষিত বাংলাদেশীরাই, তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স এর মাধ্যমে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বাংলাদেশীদের এই বিপরীতমুখী চিত্র দেখে হুমায়ূন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন বারবার। আমেরিকাতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের একটি আচরণের কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছিনা, যা এই বইটি থেকে জেনেছি। প্রায় বেশীরভাগ বাংলাদেশীরাই প্রতি বছর তাদের মা’দের দেশ থেকে নিয়ে আসেন নিজেদের কাছে, কয়েক মাস রেখে আবার দেশে পাঠিয়ে দেন। এই মা’দের আমেরিকাতে কিচ্ছু করবার নেই। তাঁরা ইংরেজী বোঝেননা, তাঁদের নাতি-নাতনীরা বাংলা বোঝেনা। তাঁরা আমেরিকার চুলায় রান্না চড়াতে পারেননা, টিভিতে তাঁদের বোধগম্য কোন অনুষ্ঠানও নেই দেখবার মত। ছেলে এবং ছেলের বউ সারাদিন অফিসে থাকে, কথা বলার লোকও তাই বিশেষ পান না। এত কষ্ট সহ্য করেও এই মা’রা প্রতি বছর আমেরিকা এসে কয়েকমাস থেকে যাচ্ছেন সন্তানের সাথে এটি হুমায়ূনকে খুব মুগ্ধ করে, আমাকেও। কিন্তু আসল চিত্রটা একটু অন্যরকম যা হুমায়ূন কে তাঁর অনুজ ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বুঝিয়ে বলেন। এই সন্তানেরা আসলে গ্রীন কার্ডের সন্ধানে আছেন, যা আমেরিকায় তাঁদের চিরস্থায়ী নাগরিকত্ব নিশ্চিত করবে। প্রথমে মা’র গ্রীন কার্ড নিশ্চিত হলে ধীরে ধীরে সন্তান ও পরিবারের অন্যান্যদেরটাও নিশ্চিত হতে থাকে। প্রতি বছর আমেরিকা এসে কয়েক মাস করে থেকে হাজিরা না দিয়ে গেলে সন্তানদের গ্রীন কার্ড আর পাওয়া হবেনা। জীবনের ক্ষেত্রগুলোতে মুহূর্তে মুহূর্তে এত বাঁক, এত মোড়, এত রঙের পরিবর্তন, ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা অনেকদিন হলো ভুলতে বসেছি। টিকে থাকার জন্য সম্ভাব্য যা কিছু করতে হয়, হয়ত সেটাই ন্যায়। অন্যায় বলে হয়ত কিছুই নেই, কে জানে?
জাপানী চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া’র পৃথিবী বিখ্যাত ছবি ‘রশোমন’ (১৯৫০)। ছবিতে একটি খুন ও ধর্ষণের বিবরণী চারজন চারভাবে দেয়। কোনটির সাথেই কোনটির মিল নেই। ছবির অন্যতম চরিত্র এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। ঈশ্বরের আরাধনায় সারাজীবন উৎসর্গ করা এই ভিক্ষু মানুষের হিংস্রতা, মিথ্যাবাদিতা ও স্বার্থপরতার পরিচয় পেয়ে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে থাকেন। তাঁর বিশ্বাস আরো নড়ে যায় যখন তিনি একটি নবজাতক শিশুকে কুড়িয়ে পান, যার বাবা-মা তাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। শতচ্ছিন্ন বেশের এক হতদরিদ্র কাঠুরে, যার ঘরে ইতোমধ্যে ছয়টি সন্তান আছে, সে ভিক্ষুর কাছে এই নবজাতকের দায়িত্ব নেবার আগ্রহের কথা জানায়। একেবারে অচেনা, হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া এক শিশুর দায়িত্ব নেয়ায় দরিদ্র কাঠুরেকে ভিক্ষু ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে তিনি অবশেষে মানুষের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
আমি হতাশাবাদী নই। তবুও কেন যেন ওই ভিক্ষুর মত এত সহজেই মানব চরিত্রকে বিশ্বাস করে ফেলতে পারিনা। মনে পড়ে যায় পৃথিবীতে টপলেস-বটমলেস রেস্টুরেন্ট এর অস্তিত্ব আছে। যুদ্ধ, ধর্ষণ আছে। আর আছে মা’কে ব্যবহার করার ইতিহাস। show less
Okay, I am not a male chauvinist and I do not intend to hurt the 'feminine' feelings but I am somewhat compelled to say this book is written in a very schoolgirlish manner! The tiresome description of the protagonist's passionate true love towards her husband Maximillian de Winter wore me off, literally. She is always insecure and brittle as a plastic toy. She has the purest of hearts. It's amazing how the good guys are good in an angelic way and the bad guys are infernally BAD. They are always lurking in darkness to catch you off guard. When the good guys do something bad, they do it for the sake of goodness in the long run and the bad guys in an inexplicable way, keep doing the bad things to make themselves even 'badder'! The so called Gothic tale appeared to me as a cheesy love story and I surmised that 'Rebecca' could be one of the 'foremothers' of modern days' chick lit.
I started reading this book with great expectation (specially after seeing a rating of 4.16 out of 5 on goodreads) but it disappointed me greatly. It's famous for the psychological challenges the central character faces but these challenges occurred due to the ever insecure nature of that character. Often, the twists were given away, the plot became predictable and I felt like the places of suspense were rather imposed. What I liked about this novel was its dark tone. Daphne du Maurier maintained this tone throughout the novel nicely and created another world of 'Manderley'. A rather good book for show more travelling with when there's nothing much to enjoy outside the window of your vessel. show less
I started reading this book with great expectation (specially after seeing a rating of 4.16 out of 5 on goodreads) but it disappointed me greatly. It's famous for the psychological challenges the central character faces but these challenges occurred due to the ever insecure nature of that character. Often, the twists were given away, the plot became predictable and I felt like the places of suspense were rather imposed. What I liked about this novel was its dark tone. Daphne du Maurier maintained this tone throughout the novel nicely and created another world of 'Manderley'. A rather good book for show more travelling with when there's nothing much to enjoy outside the window of your vessel. show less


























